ভারী হতাশ হল লালু। বলল , তা এখন আমি করব কী?
পটা বলল –তোর জখমটা ভালো নয়। মাথার চোট সারাজীবন জ্বালায়। নিজের হাতে তৈরি করেছি তোকে, এখন ভালো মন্দ কিছু হলে বুকে লাগবে বড়। তার চেয়ে তুই লাইন ছেড়ে দে।
লালুর মাথা আবার অন্ধকার হয়ে গেল এই কথা শুনে।
বুড়োবয়সে লালুর বাবা–মায়ের একটি মেয়ে হয়েছিল। তার তখন পাঁচ বছর বয়স। লালু তার এই রোগা টিঙটিঙে বোনটিকে ভালো করে লক্ষও করেনি কোনওদিন। হাসপাতালে থেকে ফিরে যখন কিছুদিন ঘরেই শুয়ে বসে থাকতে হল তাকে, ছোট বোনটি তার কাছে ঘুরঘুর করত। তার বিছানার কাছে বসে গুটি খেলত, পুতুলের সংসার বসত খুলে। কখনও বা রান্নাবাটি খেলায় লালুকে নেমন্তন্ন করত। এইভাবেই মায়া জন্মায়। লালু ঘরবন্দি বলেই আরও বেশি মায়াটা জন্মায়। তখনও মাঝে-মাঝে মাথা অন্ধকার হয়ে যায়, একটা দিক ফাঁকা ফাঁকা লাগে সব সময়ে। শরীরটা কাঁপে, নিজের জন্য ভারী একটা দুঃখ হয় তার। তখন সব ভুলবার জন্য বোনের সঙ্গে রাজ্যের খেলনা নিয়ে বসে লালু। আস্তে-আস্তে নিজের কথা ভুলে যায়। নিজেকে শিশুর মতোই লাগে তার।
.
তার দলটা দাঁড়িয়েই গেল। ওয়াগান–ভাঙার এমন ওস্তাদ দল বড় একটা আসেনি। দলের ছেলেরা এসে লালুর হিস্যার অংশ বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায়, কিন্তু তারাও বুঝতে পারে, লালু শেষ হয়ে গেছে। বোনের সঙ্গে সারাদিন খেলে-খেলে তার মুখ-চোখেও একটা শিশুর মতো হাবভাব। তারা বুঝতে পারে, লালু আর লাইনে নামতে পারবে না।
সেটা লালুও বোঝে। বুঝে একদিন সে তার হিস্যার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলল –আমি বসে গেছি রে। ও টাকা ছুঁতে আমার লজ্জা করে। তোরা ভাগজোখ করে নে।
তারা খুব একটা আপত্তি করল না। টাকা ফেরত নিল।
লালু একটা শ্বাস ফেলে বোনের সঙ্গে খেলায় ডুবে গেল আবার। সে এখন এক পায়ে লাফিয়ে এক্কাদোক্কা খেলতে পারে। হাত চিৎ–উপুড় করে গুটি খেলতে পারে, পুতুলকে পরাতে পারে কাপড়।
।কিন্তু সেইসঙ্গে রোজগারও বন্ধ। সরকারি অফিসের টাকায় বাবা সংসার চালিয়ে নিচ্ছিল কোনওরকম। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের সময় এসে গেল। লালুকে এখন আর তেমন ভয় করে না কেউ, বাবাও না। একদিন বাবা ডেকে বলল –লালু, তোমার মতিগতি ভালো হয়েছে, খুব সুখের ব্যাপার। কিন্তু রোজগারপাতির বুদ্ধি কই! শুধু ভালোমানুষিতে চলবে না।
লালু বুঝল। কিন্তু সে লেখাপড়া শেখেনি। পটা ওস্তাদের কাছে যা সে শিখেছে তা আর কাজে লাগাবার মতো ক্ষমতা তার নেই। তবু সে বোনের সঙ্গে খেলা ছেড়ে একটু-আধটু বেরোতে লাগল।
প্রথমেই গেল স্টেশনের গায়ে তাদের চায়ের দোকানটায়। দলের ছেলেরা এখানেই বসে।
সন্ধেবেলা। কয়েকজন বসে আছে। তাদের মধ্যে দুজন নীলু আর শানু লালুর চেনা-বাকি ক’জন নতুন। নীলু আর শানু খাতির করে তাকে বসাল। নতুনরা তাকে গ্রাহ্য করল না। এক দুইবার দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল।
লালু নীলুকে বলল –আমার কিছু টাকার দরকার নীলু, দোকান করব।
নীলু মন দিয়ে শুনে ভেবে বলল –ধার না হিস্যা?
লালু মাথা নাড়ে–ওসব না। কাজে নামব।
নীলু আবার ভাবে। অনেক ভেবে বলে–দল ঠিক আগের মতো নেই লালুদা। পুলিশেরও হুজ্জত খুব। নতুন ছেলেরা এসেছে–তারা কাউকে বিশ্বাস করে না। তুমি নামতে চাও ভালো, আমি সবাইর সঙ্গে একটু কথা বলে নিই। কাল একবার এসো।
লালু গেল পরদিনও। নতুন ছেলেরা তার হোঁতকা শরীরটা চেয়ে দেখল মাত্র। নীলু গম্ভীরমুখে আড়ালে ডেকে বলল তোমাকে নেবো। কথা হয়েছে। কিন্তু এখন দল বেড়ে গেছে অনেক, আমাদের হিস্যা বেশি থাকে না। পুলিসকে কত দিতে হয় তা তো তুমি জানোই। আর-একটা কথা, এখান থেকে ক্যাপিট্যাল বাগিয়ে সরে পড়বে তা হবে না। এলে থাকতে হবে। ভেবেচিন্তে এসো।
কথাটা লালু ভাবল অনেক। ওয়াগন–ভাঙা কিছু শক্ত কাজ না। গাড়ি জায়গা মতো দাঁড়ায়, পুলিশও বন্দোবস্ত মতো তফাতে থাকে। কেবল বন্ধ ওয়াগন খুলে মাল বের করা। কিন্তু ওই যে দল ওই দলটাই সাংঘাতিক। বহুকাল সে আর দল করেনি, এখন বুঝে চলা কী সম্ভব! একটু এদিক-ওদিক হলে লাশ পড়ে যাবে। পটাটা কী একটা ইন্দ্রিয়র কথা বলত, যেটা তার নেই। সেটা নেই ঠিকই। তাই একটু-আধটু ভয় করে লালুর! গলায় সোনার চেনে বাঁধা বাঘনখটা মুখে। পুরে, সে ভ্রূ কুঁচকে ভাবে। ভাবলেও কিছু সমাধান পায় না। মাথার ভিতরটায় একধারে এখনও জমাট অন্ধকার। সব সমস্যা গিয়ে সেইখানে সেঁধোয়। ভারি অস্থির লাগে তার।
তবু নামে লালু। দু-দিন তাকে কোনও কাজ দেওয়া হল না। দলের সঙ্গে থাকল কেবল। তিন চারদিন পর গাড়ি থামতে দরজা খুলে অভ্যাস মতো উঠে গেল লালু। পা দিল গমের বস্তায়। হাতে হাতলওয়ালা সরু হুক। তার পিছনে উঠল তিনচারজন নতুন ছেলে।
ওয়াগানের ভিতর অন্ধকার। যার হাতে টর্চ সে কেন যেন টর্চটা জ্বালল না। অন্ধকারেই বিপুল একটা বস্তা টেনে তুলল লালু। পাকসাট মেরে দরজার কাছে ফেলল। নীচে থেকে কারও বস্তাটা ধরার কথা। লালু বস্তাটা ঝুলিয়ে ধরে রইল, নীচে থেকে কেউ তা ধরল না। কিছু বুঝবার আগেই ওয়াগানের ভিতরের অন্ধকার থেকে হুক-এর সরু অংশটা কে যেন সজোরে বসাল তার কাঁধে। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল সে, হাতের বস্তাটা পড়ল প্রথমে, তার ওপর পড়ল সে, পিছন থেকে একটা লাথি খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে। ভারী শরীর তার, উঁচু ওয়াগন থেকে পড়ে বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে সে কাঁধ চেপে বোকার মতো চেয়ে রইল কেবল। টলটলে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল তার হাত। ওয়াগনের ভিতর থেকে একটা তীব্র টর্চের আলো এসে পড়ল তার মুখে। একটা গলার স্বর বলল –আমরা নতুন লোক পছন্দ করি না লালু। কেটে পড়ো।
