ননী মরে গেলে সে একদিন লাইন পেরিয়ে পাড়ায় ঢুকল।
লালুর আত্মবিশ্বাস এখন অনেক বেড়ে গেছে। তার শরীরটা হোঁৎকা হলেও যে কাজের তা সে বুঝতে পারে আজকাল। মারপিট হুজ্জোত লাগলে সে সবার আগে যায়! লোকে তাকে রাস্তা ছেড়ে দেয়।
মোড়ের মাথায় পটা ধরল লালুকে।
–শোন।
লালু একটা চোখ কুঁচকে পটাকে দেখে। খুব একটা আমল দিতে চায় না। কিন্তু পটার রক্তবর্ণ পোশাক, উড়োউড়ো চুলদাড়ি, রোগা শুকনো চেহারার মধ্যে এখনও একটা কিছু আছে যাকে ঠিক উপেক্ষা করা চলে না। তাই লালু পটাকে আমল দেবে না করেও কাছে গিয়ে বলল –কিছু বলছ পটাদা?
–বলছি। গায়ে অত মাংস কেন তোর? ভারী শরীর নিয়ে কিছু করা যায় না-বুঝলি?
ব্যঙ্গের হাসি হাসে লালু, বলে–করা যায় না কী করে বুঝেছ?
পটা আধখোলা চোখে একটু চেয়ে থেকে বলে–ননীকে সাফ করেছিস বলে বলছিস। ননী তৈরি থাকলে তোর মতো চারজনকে জমি নেওয়াতো। আলপটকা মেরেছিস। তা সব সময়ে কি সেরকম হবে?
বলে রোগা হাতখানা বাড়িয়ে পটা বলল –এই হাতখানা ধরে দেখ, বুঝতে পারবি।
লালু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার প্রকাণ্ড হাতখানা বাড়াল। পটা তার রোগা আঙুল দিয়ে লালুর পাঞ্জাটা ধরে আলতো চাপে মোচড় দিল একটু। ব্যথায় থরথর করে কেঁপে উঠল লালু। হাতখানা বুঝি কবজি থেকে ভেঙেই যায়।
–আহা, ছাড়ো ছাড়ো—
পটা মৃদু হাসে। ছেড়ে দিয়ে বলে–তাই বলছিলাম কি গায়ের মাংস আর একটু ঝরিয়ে দে। কারণ, নিজের মাংস নিজের শত্রু। লাইনের ওপারে মায়ের মন্দির আছে আমার জানিস তো! সেখানে বিকেল-বিকেল চলে আসবি। তোকে তৈরি করে দেব।
প্রচণ্ড বিস্ময়ে রোগা শুকনো চেহারার পটাকে কয়েক পলক দ্যাখে লালু। সে দেবী দত্তর আখড়ায় বিস্তর মাটি মেখেছে। যন্ত্রপাতি নেড়ে তৈরি রেখেছে শরীর, তবু এই রোগা দুর্বল পটার হাতের ক্ষমতার কাছে সে ছেলেমানুষ। ওস্তাদ একেই বলে!
পটা হাসল, আবার লালুর মুখ দেখে বলল –ননী চিরকালের গোঁয়ার, তার ওপর পয়সার লালচ। ওসব লালচ থাকলে মানুষ অন্ধ। নইলে তোর মতো আনাড়ির হাতে যায়?
লালু বুঝল যে সে এখনও আনাড়ি। মাস্তানির বিষয়টি এখনও বিস্তর শিখবার আছে। তাই সে বিকেল-বিকেল লাইন পেরিয়ে পটার মায়ের মন্দিরে যেতে লাগল।
প্রথম-প্রথম কয়েকদিন পটা কেবল নিজের ডানহাতটা মুঠো করে বাড়িয়ে দিয়ে বলত–মুঠো খোল।
পটার হাতে সেই মুঠো খুলতে সারা বিকেল প্রাণপণ চেষ্টা করে ঘেমে যেত লালু। পারত না। বলত কী দিয়ে তৈরি গো তোমার হাত পটাদা?
পটা হাসে, বলে–আজ যা, কাল আবার আসিস।
লালু সেলাম করে ফিরত। কিন্তু যাতায়াত বজায় রাখল সে। পটা শেখাত। বলত–এসব কাউকে শেখাইনি বড় একটা। এখন বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, আমার সঙ্গেই সব চলে যাবে, তাই ভাবছি, তোকে দিয়ে যাই। কিন্তু দেখিস বাপু, লালচ বেশি করবি না, কখনও কোনও মেয়েমানুষের কেস নিবি না, গুরুকে মনে রাখবি।
লালু মাথা নাড়ে।
তারপর একদিন লালু মায়ের বাড়িতে পুজো দিয়ে বেরিয়ে এল। ভারী খুশি সে।
বিশাল শরীর এবং যথেষ্ট হিংস্রতা নিয়ে লালু ঘুরে বেড়াতে লাগল। শরীরের মাংস অনেকটা ঝরে গিয়ে, শরীরটা হালকা লাগে এখন। চলন্ত মালগাড়ির গা বাইতে পারে, টপকাতে পারে উঁচু দেওয়াল। সবচেয়ে বড় কথা আর টপ করে ভয় পায় না আগের মতো। পটা তাকে শিখিয়েছে, যখন হাঁটবি চলবি তখন চোখের মণি নড়বে ঠিক যেন দেওয়াল ঘড়ির পেণ্ডুলাম। হাঁ করে এক দিকে চেয়ে হাঁটবি না। চারদিকে নজরে রাখবি। তাই রাখে লালু। দু-খানা চোখ টকটক করে ডাইনে বাঁয়ে নড়ে তার, সবদিক নজর রাখে। এখন তার জীবন বিপজ্জনক।
ওয়াগন–ভাঙা হিসেবে লালু বেশ নাম করল। হাইওয়েতে মাঝে-মাঝে লরি বা মোটরগাড়িও থামায় সে। পাড়ার বেশিরভাগ দোকানদার তাকে খাজনা দেয়। রোজগারপাতি মন্দ না।
কিন্তু বিপদও আছে। ওয়াগন-ভাঙাদের পুরোনো দলটার সঙ্গে বিস্তর বোমাবাজি চলল কিছুদিন। পুরোনো দলটা ভেঙে যাচ্ছিল, লালুর দলটা তৈরি হচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল, দিনকালে লালুর দলটাই দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু বিনা হুজ্জতে নয়।
ঠিক দুপুরবেলা লালু পেটোপাড়ার ভিতর দিয়ে আসছিল। সেই সময়ে হঠাৎ সে দেখল কে যেন সুইচ টিপে সূর্যটা নিবিয়ে দিল। এমনকী সুইচ টেপার ফুটুস একটু আওয়াজ শুনতে পেল সে। অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়ল রাস্তায়। তার গলায় সোনার চেনে বাঁধা বাঘনখ বেয়ে রক্ত পড়ছিল টপটপ।
হাসপাতালে তাকে দেখতে এল পটা। মাথায় বিরাট ব্যান্ডেজ নিয়ে পড়ে আছে লালু। গুলিটা বের করেছে ডাক্তারেরা, কিন্তু তবু মাঝে-মাঝেই মাথাটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। সেই আলো আঁধারির ভিতরে সে পটাকে দেখে ক্ষীণ গলায় প্রশ্ন করল–পটাদা আমি মাইরি শেষ হয়ে গেলুম।
পটা গম্ভীর মুখে বলে–তোর একটা জিনিস নেই লালু। ওস্তাদ হতে গেলে সে জিনিসটা চাই
–কী সেটা।
–আর একটা ইন্দ্রিয়। আমি আগেই জানতাম, তোর সেটা নেই।
–সেটা কীরকম জিনিস?
পটা একটু ভেবে উত্তর দিলকীরকম যেন ঠিক বোঝানো যায় না। চোখ কান ছাড়া আর একটা জিনিস। আমার মাথায় ঠিক রুমালের মতো একটা জিনিস আছে। সেটা সব সময়ে এদিক-ওদিক ঝাঁপটা মারছে। আমার চোখের আড়ালে কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে তা ঝাঁপটা মেরে জানিয়ে দিচ্ছে আমাকে। কোন রাস্তা ঠান্ডা কোন রাস্তা গরম তা রাস্তা দেখেই আমি ধরতে পারি। মানুষের চোখের দিকে চেয়েই বুঝতে পারি যে কোন লাইনের লোক। তোর মুশকিল হচ্ছে তুই তা পারিস না। তোর শরীর আছে, কায়দাও জানিস, কিন্তু ও জিনিস তোর নেই।
