খুব জ্যোৎস্না সেদিন। সেই জ্যোৎস্নায় চাতালে এনে লালুকে দাঁড় করিয়ে ননী ঠান্ডা গলায় বলল –যদি বিশ্বাস থাকে তো ভগবানের নাম নে শুয়োরের বাচ্চা।
এতক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। ননী বেড়াল ইঁদুরের খেলাটা ঠিকই খেলতে পারত। ভয়ে নেংটি ইঁদুরের মতোই কাঁপছিল লালু। কিন্তু ননী ভুল করল গালটা দিয়ে।
লালুর বাপ নিরীহ মানুষ ছিলেন। কাজ করতেন সরকারি অফিসে। কেরানি। ছোটখাটো মানুষ। ছেলে-বউয়ের ওপর কোনও কর্তৃত্ব ছিল না। লালু যখন বড় হতে-হতে বিশাল চেহারা বিশিষ্ট হয়ে উঠল, ছেলের বাড় দেখে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর ছেলে এরকম বিরাট আকৃতির হয় কী করে তা তিনি খুব ভাবতেন। মাঝেমধ্যে স্ত্রীকে তাঁর সন্দেহ হত। তিনি বলতেন, এ-ছেলে আমার না নিশ্চয়ই।
লালুর মা ভারী অবাক হয়ে বলতেন–’তবে কার?’
আমতা-আমতা করে লালুর বাবা বলতেন–হাসপাতালে অদল-বদল হয়নি তো। মনে হয়। আমার বাচ্চা নিয়ে অন্য কেউ তার বিকট ছেলেটা পাচার করে গেছে।
এরকম অলক্ষুণে কথা শুনে লালুর মা ভীষণ চেঁচামেচি শুরু করতেন। পাড়ায় জানাজানি হত। লোকে হাসত। পাড়ার বউ–ঝিরা তাদের দুপুরের কূটকচালির আসরে লালুর মায়ের চরিত্র বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করত–ওটুকু মানুষের ওরকম দানবের মতো ছেলে হয় কখনও?
সেসব কথা লালুরও কানে আসত। সে স্পষ্টই বুঝতে পারত যে তার বাপ তাকে একটুও পছন্দ করে না। উপরন্তু তার জন্ম এবং পিতৃপরিচয় বিষয়ে নানা লোকের নানা সন্দেহ। কিন্তু কেন যেন নিজের বাপ এবং মার প্রতি লালুর একটা পাগলাটে ভালোবাসা ছিল। সে তার রোগা খিটখিটে সন্দেহপ্রবণ বাপকে ভালোবাসত খুব। মাঝেমধ্যে বাবা অফিস থেকে ফিরলে সে গিয়ে সন্ধেবেলা তার দানবীয় হাতে বাপের গা হাত-পা টিপে দিতে-দিতে বলত…আমি তোমার ছেলে, না বাবা?
বাপ সতর্ক হয়ে ক্ষীণ গলায় বলত–আরও ভালো হ লালু। তোকে দেখে যে ভয় লাগে আমার।
–ভয় কী বাবা। আমি ঠিক আছি।
লালুর বাবা ক্ষীণ গলায় বলতেন–অত জোরে দাবাস না-লাগে। চরিত্রটা একটু ঠিক রাখিস। বেড়ে উঠলেই হল না, বাড়ের সঙ্গে আবার সংযম চাই।
লালু সেসব বুঝত না। তার শরীর সব সময়ে ছটফট করে–সে করবে কী? কাজেই সে বাবার কথায় আমল দিত না, কিন্তু লোকটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত।
কাজেই জ্যোৎস্না রাতে বাজারের পিছনের নির্জন চাতালে যখন তকে মারবার আগে। ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলে গাল দিল ননী তখনই একটা মারাত্মক ভুল করল। ওই গালাগালে হঠাৎ নিজের নিরীহ ছোটখাটো বাবার চেহারাটা লালুর মনে পড়ল। পলকে গরম হয়ে গেল গা। সরে গেল সমস্ত জড়তা। সে ঘুরে তার হোঁকা হাতে বুলেটের মতো একখানা ঘুষি ঝাড়ল ননীর মুখে।
তৈরি থাকলে এসব ঘুষি ননী সহজেই এড়াতে পারে। কিন্তু লালু সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। হোঁৎকাটা ভয়ে কাঁপছে দেখে নিশ্চিন্ত মনে ননী একতরফা মারের জন্য তৈরি হচ্ছিল। আচমকা ঘুষিটা লাগল সেই সময়ে। একটা কোলবালিশের মতো চাতালে পড়ে গেল ননী।
‘বাপ তুলে গালাগাল! অ্যাঁ! বাপ তুলে?’ বিড়বিড় করে বলতে-বলতে লালু ননীর লাশ টেনে তুলল এক হাতে, অন্য হাত মোটরগাড়ির পিস্টনের মতো চালাতে লাগল। কোঁক-কোঁক করে কয়েকটা শব্দ করল ননী, তারপর চুপ হয়ে গেল। কিন্তু লালুর রাগ তখনও শেষ হয়নি। সে দু হাতে ননীর গলা টিপে ধরে বলছে তখনও-’আর বলবি? আর বলবি কখনও?’
লালু তখনও জানত না, তার হাতের চাপে ননীর গলার মেরুদণ্ডের দুটো হাড় ভেঙে গেছে, জিভ বেরিয়ে ঝুলছে, এবং অনেকক্ষণ ননী শ্বাস নিচ্ছে না।
বাজারের বন্ধ দোকানঘরের আড়াল আবডাল থেকে দৃশ্যটা দেখে হীরেন আর তার দলবল এসে জ্যান্ত লালু আর ননীকে আলাদা করল। হীরেনরা খুব খুশি। কিন্তু লালুর বিপদ বুঝে বলল –তুই পালা। বাড়িতে গিয়ে শুয়ে থাক, কোথাও বেরোসনি। আবডাল দিয়ে বাড়িতে ঢুকবি, পাড়ার লোকে যেন দেখতে না পায়।
লালুর ভয় ঢুকল আবার। নেংটি ইঁদুরের মতো পালাল সে। ঘরে শুয়ে শুনল, পুলিশভ্যান আসছে যাচ্ছে। একটু রাতে বাজারের দিকটায় ননীর দলবল হুজ্জত শুরু করল। ঘরে শুয়ে কাঁপতে লাগল লালু।
কিন্তু ননী মরেই গেছে। কোনও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে আর ফিরবে না। তার দলবলও খুব একটা ছিল না। দু-চারদিন হামলা হল, খোঁজাখুঁজিও হল, কিন্তু লালুর গায়ে হাত পড়ল না। বাজারের হীরেন আর তার দলবল লালুকে আড়াল দিল কিছুটা। জুয়ার বোর্ডটা নিরাপদ করেছে লালু, কাজেই তার জন্য কিছু করতেই হয়।
লালু আবার রাস্তায় বেরোয়, হীরেনের আড্ডায় গিয়ে বসে, চোলাই খায়। তখন তার বিশ বছর বয়স।
পটাকে দেখে এখন আর বুঝবার উপায়ও নেই যে সে এক সময়ে কে বা কী ছিল। কিন্তু লোকে তখনও বলে–পটা মাস্তানের মতো অমন ওস্তাদ আর হয় না। কিন্তু কোন এক লীলাময়ীর কাছে ঘা খেয়ে পটা সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যায় কিছুদিন। লাইনের ওপারে ছোট্ট কালী মন্দির বানিয়ে রক্তবর্ণ পোশাক পরে পটা কিছুদিন খুব সাধনভজন করে। সামাজিক দুষ্কর্ম সবই ছেড়ে দেয়। পটার দাপটে যারা ম্লান হয়েছিল এতদিন–এই ফাঁকে তারা উন্নতি করে ফেলল। পটা কালী সাধনা করতে-করতে আড়চোখে দেখল সবই। কালীর মুখের ওপর লীলারানির মুখটা মাঝে-মাঝে ফুটে ওঠে। পটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপ করে থাকে। মনটা খুব ছটফট করলে মাঠ থেকে যার তার পাঁঠা ধরে এনে বলি দেয়। এইরকমভাবেই জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছিল পটা। এখন বয়স হয়ে গেছে। কালীমন্দিরটা নিয়েই পড়ে আছে সে। তবু একটা চোখ তার সব সময়েই খোলা, পাড়ার দিকে নজর রাখে। কোন মাস্তান উঠছে, কেই বা পড়তির দিকে। এটা তার অভ্যাস, ছাড়তে পারে না।
