–আসুন, প্রিয়নাথকে একবার দেখবেন না?
দাদু খড়মের শব্দ তুলে ভিতর বাড়িতে এলেন। তার মুখখানা একটু ভার দেখাচ্ছিল, আর কিছু নয়। ছোটকাকা তখন বড়-বড় চোখে চারিদিকে তাকাচ্ছেন। কাকে যেন খুঁজছেন। কী যেন খুঁজে পাচ্ছেন না। বারবার বলছেন–তোমরা সব চুপ করে আছ কেন? কিছু বলল , আমাকে কিছু বলো।
জ্যাঠামশাই নীচু হয়ে বললেন–কী শুনতে চাও প্রিয়নাথ?
ছোটকাকা ক্লান্ত, বিরক্ত হয়ে বললেন–আমি কী জানি। একটা ভালো কথা, একটা সুন্দর কথা কিছু আমাকে বলল , আমার কষ্ট ভুলিয়ে দাও। আমি কেন এই বয়সে সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছি –আমার মেয়ে রইল, বউ রইল–আমার এই কষ্টের সময় কেউ কোনও সুখের কথা বলতে পারো না!
বড় কঠিন সেই পরীক্ষা। কেউ কিছু বলতে পারে না। সবাই কেবল মরণোন্মুখ মানুষটার মুখের দিকে চেয়ে থাকে, কথা খুঁজে পায় না। কিন্তু প্রত্যেকেরই ঠোঁট কাঁপে।
একজন অতি কষ্টে বলল –তুমি ভালো হয়ে যাবে প্রিয়নাথ।
শুনে ছোটকাকা ধমকে বললেন–যাও যাও-।
আর একজন বলল তোমার মেয়ে বউকে আমরা দেখব, ভয় নেই।
শুনে ছোটকাকা মুখ বিকৃত করে বললেন–আঃ, তা তো জানিই, অন্যকিছু বলো।
কেউ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না।
সেই সময়ে দাদু ঘরে এলেন। স্বাভাবিক ধীর পায়ে এসে বসলেন ছোটকাকার বিছানার। পাশে। ছোটকাকা মুখ ফিরিয়ে তাঁকে দেখে বললেন বাবা, সারাজীবন আপনি কোনও ভালো কথা বলেননি, কেবল শাসন করেছেন। এবার বলুন।
সবাই নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতায় একটা পাহাড়প্রমাণ ঢেউ অদৃশ্য থেকে এগিয়ে আসছে। ছোটকাকাকে জীবনের তীরভূমি থেকে অথই অন্ধকারের এক সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাবে বলে ঢেউটা আসছে, আসছে। আর সময় নেই। ছোটকাকার জিভটা এলিয়ে পড়েছে, বারবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, মুখ প্রবল ব্যথায় বিকৃত!
দাদু একটু ঝুঁকে শান্তস্বরে বললেন–প্রিয়নাথ, আবার দেখা হবে।
কী ছিল সেই কথায়! কিছুই না। অতিথি অভ্যাগত বিদায় দেওয়ার সময় মানুষ যেমন বলে, তেমনি সাধারণভাবে বলা। তবু সেই কথা শুনে মৃত্যুপথযাত্রী ছোটকাকার মুখ হঠাৎ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল। তিনি শান্তভাবে চোখ বুজলেন। ঘুমিয়ে পড়লেন।
এসব অনেকদিন আগের কথা। নকশিকাঁথার মতো বিচিত্র সুন্দর শৈশবের পৃথিবী কোথায় হারিয়ে গেছে। সেই সুন্দর গন্ধগুলো আর পাই না, তেমন ভোর আর আসে না। মায়ের গায়ের
সুঘ্রাণের জন্য প্রাণ আনচান করে! পৃথিবী বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমে! বুড়ো গাছের মতো শুকিয়ে যাচ্ছে আমার ডালপালা। খসে যাচ্ছে পাতা। মহাকালের অন্তঃস্থলে তৈরি হচ্ছে একটি ঢেউ। একদিন সে এই পৃথিবীর তীরভূমি থেকে আমাকে নিয়ে যাবে। বুকের মধ্যে শৈশবের একটি কথা তীরের মতো বিঁধে থরথর করে কাঁপছে আজও। সেই অমোঘ ঢেউটিকে যখনই প্রত্যক্ষ করি, মনে-মনে তখনই ওই কথাটি বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে। শৈশবের সব ঘ্রাণ, শব্দ ও স্পর্শ ফিরিয়ে আনে। মায়ের গায়ের ঘ্রাণ পেয়ে যেমন ছেলেবেলায় পাশ ফিরতাম তেমনি আবার পৃথিবীর দিকে পাশ ফিরে শুই। মনে হয়, দেখা হবে। আবার আমাদের দেখা হবে।
দৈত্যের বাগানে শিশু
যৌবনকালটা লালুর কেটেছে মামদোবাজিতে। মামদোভূতের ধড় আছে, মুড়ো নেই। লালুরও ছিল না। ধড় ছিল। সেটা দশাসই। ছেলেবেলা থেকেই তার চেহারাখানা বিশাল, দু-খানা বিপুল কাঁধের মধ্যে তার মুণ্ডুটা নিতান্তই ছোট দেখতে। মুখখানা ভালো নয়, কিন্তু সেই মুখে খুব সরলতা ছিল। ছিল নিষ্ঠুরতাও। মাথায় বুদ্ধি ছিল না। পনেরো–ষোলো বছর বয়সেও ক্লাস এইট-এর ছাত্র সে, তখন মদ খেতে শিখেছিল, খেলত জুয়া। পাড়ার লোক সেই বয়সের লালুকে অল্প–সল্প ভয় করতে শুরু করেছিল।
বাজারের মধ্যে স্টোভ সারাইয়ের দোকান করত হীরেন। রাতে দোকানের ঝাঁপ ফেলে ভিতরে জুয়ার বোর্ড বসাত। লালু ছিল সেই বোর্ডের মেম্বার। পাড়ার এবং এলাকার বিখ্যাত গুন্ডা ছিল ননী। ননীর মাকে ছিল দেখার মতো। সে ট্যাক্সিওয়ালাদের লুঠ করত, পার্ক স্ট্রিট, এসপ্লানেডের বিখ্যাত বার থেকে মাতালদের ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে যেত ময়দানে–পরনের অন্তর্বাস ছাড়া সব কেড়ে নিত, পকেটমারদের কাছ থেকে নিত কমিশন। ননী জীবনে টাকাটা খুব চিনেছিল। মাঝেমধ্যে সে হীরেনের দোকানের জুয়ার বোর্ডটা লুঠ করত। খুব টাকার দরকার হলেই এটা করত সে। হীরেনরা বরাবর ননীগুন্ডাকে দেখলেই বোর্ড ছেড়ে দিত।
একদিন লালু থাকতে না পেরে বলল –রোজ-রোজ বোর্ডটা ভেঙে দিয়ে যাও ননীদা, আমরা ঝুটঝামেলা কিছু করি না-কিন্তু কাজটা কি পুরুষের মতো হচ্ছে?
ননী একপলক তাকে দেখে বলল –শরীর বানিয়েছিস, না রে শালা? কিন্তু তুই খারাপ হয়ে যাবি লালু।
লালু ভয় খেয়ে বলল –কিন্তু আমরা তো তোমাকে কিছু বলি না কখনও। খেলাটা ভেঙে গেলে রোজ-রোজ ভালো লাগে না, তাই
ননী কেবল ঠান্ডা গলায় আবার বলল –তুই খারাপ হয়ে যাবি লালু। বিলা হয়ে যাবি—
টাকাপয়সা তুলে নিয়ে নদী হাত বাড়িয়ে লালুর কাঁধের জামাটা ধরে বলল –আয়।
ননী ডাকলে বেশিরভাগ লোকই প্রতিরোধের কথা ভুলে সম্মোহিতের মতো তার সঙ্গে যায়। অতবড় শরীর নিয়ে লালুও তার অর্ধেক মাপের ননীর সঙ্গে উঠল।
বাজারের পিছন দিকে একটা চাতাল, মফসসলের মেয়ে আর শিশুরা এখানে আনাজ নিয়ে বসে। রাতে জায়গাটা ভারী নির্জন, শুনশান। অদূরে একটা পশ্চিমাদের ঝোঁপড়া আছে, তাতে ঝাঁকামুটে মজুরদের বাস। কিন্তু তারাও নির্জনতারই অংশবিশেষ। ননীকে দেখলে তারা পাথর হয়ে যায়।
