টুনু তার ছায়ার দিকে তাকায়। রোগা লম্বাটে একটা ছেলের ছায়া। ছায়াটা জলের ভিতরে। একটু ডুবুরির মতো জলের মধ্যে থেকে ছায়াটা তাকে দেখছে। মায়ের কথা ভাবল সে, পরাণ মাঝির কথাও। আজ সন্ধেবেলা কিংবা অন্য কোনওদিন যখন বাবা টের পাবে তখন মাকে বাবা মারবে। হয়তো এবার মেরেই ফেলবে। কেন না, দুলটা সোনার আর সোনা বলতে তাদের ঘরে ওইদুলজোড়াই।
নীচু হয়ে জলটা দেখতে লাগল টুনু। ইচ্ছে হল একবার পরাণ মাঝির মতো ডুবুরি হয়ে খুঁজে দেখে দুলটাকে। কিন্তু সে সাঁতার জানে না। সাঁতার জানলে পাথর নুড়ি, শ্যাওলা আর গাছের পচা পাতার মধ্যে গিয়ে সবুজ জলে ডুবুরির মতো সে দুলটাকে একবার খুঁজে দেখত।
একটা পা বাড়িয়ে নিয়ে সিঁড়িতে রাখে সে। ঠান্ডা জলটা সুড়সুড়ি দেয় পায়ে। টুনু আর এক ধাপ নামে। আর-এক দাপ। হাঁটুর ওপর জল এবার। টুনু নীচু হয়।
ঘোলা জলটা এবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন সেই ঘন সবুজ রং। জলের নীচে অনেকটা দেখা যাচ্ছে। টুনু চোখটা বড়-বড় করে তাকায়। চোখটা সরিয়ে আনে সিঁড়িগুলোর দিকে। একটা, দুটো, তিনটে সিঁড়ি স্পষ্ট এবং তারপর আরগুলো ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে। সিঁড়িগুলো গুনতে শুরু করে টুনু—তারপর—
চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজের মুখে হাতচাপা দেয় টুনু। স্পষ্ট পরিষ্কার জলের নীচে চতুর্থ সিঁড়িটার ঠিক শেষে বাঁকা আর সুপুরি গাছের দড়ির বাঁধনটার কাছে সোনার দুলটার ছোট হুকটা চিকচিক করছে। কী আশ্চর্য! কেউ দেখতে পায়নি। টুনু মস্ত বড়-বড় চোখে চেয়ে থাকে। বুকটা ঢিপঢিপ করে তার।
টুনু ঝপ করে আর এক ধাপ নামল। কোমরের কাছে জল এবার। প্যান্টটা ভিজে গেল। ঠিক এই ধাপে দাঁড়িয়েই রোজ স্নান করে সে। এর বেশি নামতে সে ভয় পায়। সিঁড়িগুলো উঁচু উঁচু। আর এক ধাপ নামলেই গলা জল।
কিন্তু দুলটা সে নিজেই তুলবে। চারদিকে তাকায় টুনু। কেউ নেই। আরও দু-ধাপ নামলে দুলটা।
টুনু পা বাড়ায়। গলা জল।
টুনু নিশ্বাস টানে। পচা শ্যাওলা আর পানাপুকুর আর মাটির গন্ধ। টুনু পা বাড়ায়।
ঝপ করে পরের সিঁড়িটায় পা রাখতে না রাখতেই টুনু ডুব দেয়।
দুলটা! হাতের কাছেই।
কিন্তু নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে টুনুর।
সে মাথা তোলে।
পায়ের নীচেই সিঁড়িটা। ওপরের ধাপ। গলা জলে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস টানে টুনু। বুক ভরে বাতাস নেয়। দুলটা তাকেই তুলতে হবে। টুনু তাকায়। জলে ঢেউ। জল ছলছল করছে গলার কাছে। সেই ঢেউ আর সবুজ শ্যাওলার ভিতর দিয়ে দুলটা চিকচিক করছে।
টুনু নীচু না হলে হাতে পাবে না।
ডুব দেয় সে। জলের ভিতরে অন্ধকার। জলের ভিতরে সবুজ রঙের অন্ধকার। পায়ের তলা দিয়ে একটা কী–যেন সরাৎ করে সরে গেল। বোধহয় মাছ! চমকে উঠে সে।
হাত বাড়ায় সে। আরও এক ধাপ।
মুখ থেকে বুদবুদ বেরিয়ে গাল ঘেঁষে জলের ওপর উঠে যাচ্ছে।
পরের ধাপে পা দেয় টুনু। নীচু, আরও নীচু হয়।
আর মাত্র এক বিঘত দূরে দুলটা! দম পায় না টুনু। বুকটা ফেটে যেতে চাইছে।
কোমরের নীচের দিকটা হালকা হয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। তার মাথাটা নীচে। পরাণ মাঝির মতো হাত দুটো দু-দিকে দোলায় টুনু। খুব তাড়াতাড়ি।
দুলের কাছেই হাতটা এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। শেষবারের মতো দাঁতে দাঁত চাপে টুনু।
দুলটা! কাছেই।
দু-আঙুলে মধ্যে হুক-টা!
একটা হ্যাঁচকা টানের সঙ্গে-সঙ্গে দুলটা তার হাতের মুঠো এসে যায়।
যেন অনেক ভার বুকে। টুনু মুঠোকরা হাতটা বুকের কাছে চেপে ধরে। হাতের আঙুল আর চামড়া কেটে দুলটা যেন তার হাতের মধ্যেই বসে যাবে।
সিঁড়িটায় পায়ের চাপ দিয়ে টুনু সরে যায়। কোনদিকে যে সরছে, তা বুঝবার আগেই চোখে সূর্যের আলো লাগে।
বাতাস। আঃ!
হাঁ করে বুক ভরে নিশ্বাস টানে। হাত-পায়ের সমস্ত গ্রন্থিগুলো শিথিল।
কিন্তু তারপরেই আবার টুনু ডুবতে থাকে। এক পলকের জন্য সে দেখতে পায় হাত দশেক দূরে ঘাট। ঘাটে কেউ নেই। সে অনেকখানি সরে এসেছে। হাতের মুঠোয় দুলটা।
প্রাণপণে হাত আর পা দিয়ে জলে আঘাত করে সে। তারপর ডুবে যেতে থাকে। হাতের মুঠোটা শিথিল হয়ে আসছে।
আবার মাথা তোলে। ঘাট এখন হাত–কয়েকের মধ্যেই। কিন্তু টুনুর মনে হল, পুকুরটা যেন বহুবিস্তৃত সমুদ্রের মতো বড় হয়ে গেছে। যেন কূল–কিনারা কিছু নেই পুকুরটার। থই নেই পায়ের নীচে। হাতের মুঠোয় দুলটাকে প্রাণপণে চেপে রাখবার চেষ্টা করে।
গাঁটে গাঁটে অসংখ্য ফোঁড়ার যন্ত্রণা। সমস্ত শরীরটা শিথিল। হাত-পা নাড়তে পারছে না সে। চোখের সামনে সূর্যের আলোটা নিভে গিয়েই জ্বলে উঠছে। কানে শুধু কলকল ছলছল জলের শব্দ।
না, আর জোর নেই শরীরে। আর কিছু নেই। হাতের পেশিগুলো সঙ্কুচিত হচ্ছে না। মুঠোটা আলগা হয়ে আসছে। প্রাণপণে আঙুলগুলোকে বাঁকিয়ে রাখতে চাইছে সে। পারছে না।
প্রাণপণে চিৎকার করতে গেল টুনু। মুখে জল ঢুকল। টুনু ঢোঁক গেলে।
জল তাকে ঘিরে যেন ঘুরছে। তাকে টেনে নিচ্ছে পাতালের দিকে। কত নীচে যে তলিয়ে যাচ্ছে সে! বেঁকানো আঙুলগুলো জট ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। বুক থেকে সমস্ত নিশ্বাস শুষে নিচ্ছে জল। দম নেওয়ার জন্যে সে হাঁ করে। জল ঢোকে মুখে।
মাথাটা ডুবে যাওয়ার আগে হাত চারেক দূরে ঘাট দেখতে পায় সে। দেখতে পায় একপাঁজা বাসন হাতে বিন্দুপিসি আসছে ঘাটের কাছে।
