পরাণ মাঝিকে কুশলী ডুবুরির মতো লাগে টুনুর। সে সব ডুবুরি (সে বইতে পড়েছে) একটুও ভয় না করে সমুদ্রের জলে ডুব দিয়ে ঝিনুক তুলে আনে। সেই ঝিনুকের ভিতরে মুক্তো। মুক্তো দেখেনি টুনু, ডুবুরিও না। পরাণ মাঝিকে দেখে শুধু ডুবুরির কথা মনে হয়।
পরাণ মাঝির মাথাটা এবার প্রায় মাঝ–পুকুরে ভেসে ওঠে। হাতের মুঠো থেকে খানিকটা কাঁদা ছুঁড়ে ফেলে পরাণ মাঝি আবার ডুব দেয়। সেই ছুঁড়ে দেওয়া কাদার মধ্যে কয়েকটা শামুক।
এবার পাড়ের কাছে মুখ তোলে মাঝি। ভীষণভাবে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলে–’না কর্তা, ঠিক কুনখানে পড়ছে হেইরে না জানলে হইব না।’
টুনু মনে-মনে ভয় পায়। ব্যস্ত হয়ে বলে–’এইখানেই পড়ছে। তুমি আর একটু খুইজ্যা দ্যাখো। ছানের সময় বেশি দূরে যায় নাই মা।’
পরাণ মাঝি হতাশভাবে জলের দিকে একবার তাকায়। ঘাটের সিঁড়িতে ভর দিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলে–’দেখি আর অ্যাকবার! হালার দমে কুলায় না, না হইলে হালার পুর্ণীরে–’ কথাটা শেষ করেই পিচ্ছিল গতিতে সাপের মতো জলে নামে মাঝি।
এবার পরাণ মাঝিকে স্পষ্ট দেখতে পায় টুনু। ঘাটের খাড়া পাড়ের কাছে জলটা গভীর। পরাণ মাঝি প্রকাণ্ড দুটো হাত মাছের পাখনার মতো নাড়তে-নাড়তে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু গতিটা এবার আর সহজ নয়। খুব আস্তে-আস্তে নামছে মাঝি। সবুজ জলের ভিতরে তার পায়ের সাদা তলাটা নড়ছে। পা দুটো ওপর দিকে আর মাথাটা নীচের দিকে মাঝির।
অনেকটা নেমে প্রায় পুকুরের তলায় মাঝি থেমেছে। টুনু দেখতে পায়, মাঝি খুব সন্তর্পণে মাটিটা দেখছে। একটু পরেই জলটা আস্তে-আস্তে ঘোলা হয়ে গেল। কাদা কাদা হয়ে গেল ওপরটা। মাঝিকে আর দেখতে পেল না টুনু।
অনেকখানি জল ছিটিয়ে মাঝি ভেসে উঠল আবার। এবার পাড়ের খুব কাছে। মুখ তুলে দম নেয় মাঝি। বলে–’আর একটু কর্তা, দেখি একবার। মনে লয় পাইয়া যামু।’ কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলতে পারল না মাঝি। হাঁফাতে-হাঁফাতে কেটে-কেটে বলল । বলেই আবার ডুবে গেল। জলের মধ্যে। জলের ওপর সাদা কতগুলো বুদবুদ জমা হল। আরও বুদবুদ উঠে এল জলের ভিতর থেকে। কাঁচের মার্বেলের মতো সেগুলো ভাসতে লাগল জলের ওপর।
টুনু তাকিয়ে দেখে মাঝি উঠে আসছে। টুনু চেয়ে দেখল মাঝির হাতে মুঠো করা কাদা–মাটি।
পরাণ মাঝি ভেসে উঠল জলের ওপর। ক্লান্ত হাতে জলে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। তারপর সিঁড়ি ভেঙে উঠে এল ওপরে।
‘কর্তা’–দম নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে মাঝি বলে–’দ্যাখেন তো এইগুলির মধ্যে আছে নাকি!’
কাদার মুঠোটা খুলে মাঝি তাকে দেখায়। টুনু কাদার দলাটা হাত বাড়িয়ে নেয়। খানিকটা কাদা কয়েকটা পচা গাছের পাতা, একটু শ্যাওলা শামুক। আর কিছু নেই। টুনু নিশ্বাস ছাড়ল।
–’না মাঝি নাই তো এর মধ্যে।’
কোমরের গামছাটা খুলে মাটিতে বসে সেটা নিংড়োতে থাকে মাঝি। বলে–’দ্যাখলাম য্যান দুলের মতোই। খাংলা দিয়া তু লোমও। কপালে নাই কর্তা, কী করব্যান!’
পরাণ মাঝির গলার স্বরটা যেন অনেক দূর থেকে আসছে ঠিক এমনি ক্ষীণ স্বরে সে বলে –’পারি না কর্তা আর। যখন মাঝি আছিলাম শরীরের জোর আছিল। একদমে নদীর তল থিক্যা মাটি উঠাইতাম। গাঙ পার হইতাম ভরা বর্ষার। হেইদিন গেছে। অখন মাঝির নাম ঘুচাইয়া রিফিউজি হইছি।’
গা মুছতে মুছতে পরাণ মাঝি টুনুর দিকে তাকায়। টুনু মাঝিকে দেখে। প্রকাণ্ড শরীর কড়া পরা হাত। অথচ মাঝির হাত দুটো যেন কাঁপছে।
মাটিতে ফেলে রাখা ময়লা কাদা জামাটার পকেট থেকে বিড়ি বার করে পরাণ মাঝি। সেটা ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া টেনে বলে–’আছিলাম পরাণ মাঝি, একডাকে মাইনষে চিনতে পারত। কুয়ার মইধ্যে লাইম্যা ঘটি বাটি গলার হার তুলছি, অখনে অ্যাক বুক জলে ডুব দিতেই দম শ্যাষ। বয়স বাড়ছে অখন, শরীলে আর হেই তাকত নাই, প্যাটে ভাত নাই কর্তা।’
মাঝি ধোঁয়া ছাড়ে। আর পুকুরপাড়ে ভেজা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে টুনু বাবার কথা ভাবে। বাবা ফিরে এলে যদি জানতে পারে তবে মা আজ আর বেঁচে থাকবে না। গাটা শিরশির করে তার। বড় দুঃখী মা, টুনু ভাবে মা বড় দুঃখী। লোহার মতো শক্ত হাত বাবার, রোমশ বুক, পেট। খালি গায়ে। যখন উঠোনে কিংবা দাওয়ায় বসে তামাক খায় বাবা, তখন তারা কেউ কাছাকাছি যায় না। মাঝে-মাঝে যখন মাকে মারে বাবা, বিশ্রী গালাগাল দেয়, তখন মা কুঁইকুই করে ইঁদুর ছানার মতো কাঁদতে থাকে। বাবার প্রকাণ্ড দেহের দুটো হাতের ভিতর মাকে তখন ইঁদুরের মতোই ছোট্ট আর অসহায় মনে হয় তার।
পরাণ মাঝি উঠে দাঁড়িয়ে জামাটা গায়ে দেয়। বলে ‘চলি কর্তা–কাইল আইয়া আর একবার দেখুম অনে।’
টুনু চেয়ে থাকে। জামরুল গাছটার তলা দিয়ে বিন্দু-পিসির ঘরের বেড়ার কাছ ঘেঁষে আস্তে আস্তে মাথা নীচু করে পরাণ মাঝি চলে গেল। টুনু ভাবে ঠিক তার রোগা, ছোট্ট মায়ের মতোই। পরাণ মাঝিও যেন দুর্বল। খুব দুর্বল।
.
টুনু জলের দিকে তাকায় এবার। সবুজ জল, ঘন শ্যাওলা। দুপুরের সূর্য অনেকটা হেলেছে। পশ্চিমের দিকে। কিন্তু এখনও দুপুর। গরম লাগছে টুনুর। সে আস্তে আস্তে জলের প্রান্তে এসে দাঁড়ায়।
গায়ের শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে ঘাসের ওপর। একটা ব্যাঙ লাফিয়ে পড়ল জলে। কচু গাছ হাওয়ায় দুলছে। কেমন বিশ্রী একটা আঁশটে গন্ধ। পানা পুকুরে জলে তার ছায়া পড়ল।
