তারপর জল আর পাতাল। ঝাঁকড়া মাথা বিরাট একটা দৈত্যের মতো কার মুখ যেন জলের ভিতরে।…ঝপ করে একটা শব্দ। একটা চিৎকার।
শেষবারের মতো ক্লান্তি, ঘুম আর অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যেতে-যেতে সে টের পায়, তার শরীরটা আছড়ে পড়ল মাটিতে। বুকটা হালকা। আর ডান হাতের তেলোয় তার মুঠোর মধ্যে শিথিল আঙুলের ফাঁক থেকে গড়িয়ে পড়বার আগের মুহূর্তে দুলটাকে সে অনুভব করে। দুলটা আছে! হাতেই!
তারপর একটা ছুড়ে–দেওয়া কালো চাদরের মতো অন্ধকারটা তাকে ঢেকে ফেলল।
.
টুনু চোখ মেলে চায়। অল্প অন্ধকার। ঘরে আলো জ্বলছে। অনেক লোক তাকে ঘিরে, তার ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে। টুনু বুঝতে পারে না কিছু। মার মুখটা সবচেয়ে কাছে। মা কাঁদছে। আর অন্য সকলের ভিড়ের ভিতরে বাবা দাঁড়িয়ে। বাবার পাশেই বিন্দুপিসি। তাকে দেখছে সবাই। সবাইকে একসঙ্গে দেখে কেমন যেন অদ্ভুত লাগে তার। তারপর আস্তে-আস্তে মাথার ঝিমুনি ভাবটা কেটে যায়। মনে পড়ে যায় আজ দুপুরবেলায়, ঠিক দুপুরবেলায় জলের অনেক নীচে সে আর সোনার দুলটা একই সঙ্গে ডুবে যাচ্ছিল।
টুনু চোখ বোজে। ক্লান্তি আর ঘুম।
অনেকক্ষণ পরে তাকায় সে। তার পাশে বাবা। আর কেউ নেই।
আবছাভাবে লণ্ঠনের অল্প আলোয় বাবার মুখটা দেখতে পাচ্ছে সে। মুখটা তার ওপর ঝুঁকে পড়েছে। অল্প দাড়ি বাবার মুখে। কোমল, শান্ত দুটো চোখ। বাবার রোমশ কঠিন একটা হাত আলতোভাবে তার কাঁধের ওপর, আর একটা হাত তার মাথার চুলের ভিতরে আঙুল বুলিয়ে। দিচ্ছে।
খুব নম্র শান্ত গলায় বাবা বলে–’কেমন আছস রে বাবা?’
–’ভালো–ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দেয় টুনু।
–’বাঘের বাচ্চা’বাবা বলে–’বাঘের বাচ্চা তুই।’
সব কথা বুঝতে পারে না টুনু। তবু চুপ করে থাকে।
রান্নাঘর থেকে মা এ-ঘরে এল।
‘টুনু, টুইন্যারে, তর দুধ আনছি’–এই বলে মা তার শিয়রের কাছে বসে। মা’র চুলগুলো ছাড়া। আবছা আলো-আঁধারেতে মা’র মুখটা দেখতে পায় সে। আর দেখতে পায় মা’র বাঁ-কানের লতিটা আর শূন্য নেই। সেখানে ঝকঝক করে জ্বলছে দুলটা। মা’র মুখটা হাসছে। যেন ভাঙাচোরা হাড়–উঁচু মুখটা বদলে গেছে হঠাৎ। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে মা’কে। মা’র মুখটা অনেক উঁচুতে। দুল দুটো যেন মুক্তো–যে মুক্তো সমুদ্রের অনেক নীচে থেকে কুড়িয়ে আনে ডুবুরিরা।
টুনু নড়ে।
–’না, তুই উঠিছ না’–বাবা বলে।
মা তার কপালের ওপর ঈষৎ তপ্ত একটা হাত দিয়ে চাপা দিয়ে বলে–’উঠিছ না তুই, আমি তরে ঝিনুক দিয়া খাওয়াইয়া দিতাছি।’
টুনু তাকায়। ওপাশের মাচাইয়ে বুলকি আর পানু ঘুমোচ্ছে।
টুনু হাঁ করল। দুটো ঠোঁটের কোণে ঝিনুকটা আর মার কয়েকটা আঙুল। অল্প গরম দুধটা তার জিভ বেয়ে গলার কাছে নেমে এল। হাসি পেল টুনুর, যেন সে অনেক অনেক ছোট হয়ে গেছে। যেন সে মা’র কোলে, আর মা তাকে ঝিনুক দিয়ে দুধ খাইয়ে দিচ্ছে।
শেষবার তার ঠোঁটের পাশ থেকে ঝিনুকটা সরিয়ে নিয়ে নিতে মা বলে–’এই ঝিনুকটা দিয়া ছোটবেলায় তরে দুধ খাওয়াইতাম। তর কি আর মনে আছে? মা’র গলাটা কাঁপছে অল্প অল্প। মা’র চোখে বোধহয় জল।
–’হ অর কি মনে থাকনের কথা!’ বাবা বলে।
বাবা যেন একটা কাঁচের ওপাশ থেকে কথা বলছে। গলার স্বরটা ক্ষীণ। বাবা যেন দুর্বল, কথা বলতে পারছে না। বাবা কাঁদছে? না, বাবা কাঁদছে না। বাবা কোনওদিকে তাকিয়ে নেই। গায়ের চাদরটা দিয়ে দেহটা ঢাকা। চোখ দুটো বন্ধ। ভেজা-ভেজা। অল্প-অল্প দুলছে বাবা। ছবিতে দেখা যিশুখ্রিস্টের মতো মুখ বাবার।
হঠাৎ টুনুর মনে হল, খুব সুন্দর তার বাবা। খুব সুন্দর। বহু-পরিচিত পুরোনো বাবাকে যেন চিনতে পারছে না সে। এখন এই আধো-অন্ধকার ঘরে শিয়রের কাছে মা, আর পাশে খুব কাছেই বাবা। খুব কাছাকাছি দুজন। মা আর বাবা। দুজনেই তাকে ছুঁয়ে আছে।
খুব ক্ষীণ স্বরে, যেন একটা কাঁচের ওপাশ থেকে বাবা বলে–’মধ্যে-মধ্যে মনে লই যে মরি। অখন মরণ হইলেই ভালো। কিন্তু মাইজ্যা বউ, এত সহজে আমরা মরুম মা। আমরা–’
আর শুনতে পায় না টুনু। ঘুমে জুড়ে আসে চোখ। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়, মা বাবা আর পরাণ মাঝি যেন একই রকমে দুঃখী, অসহায় দুর্বল। তারা কেউ নিষ্ঠুর নয়।
তারপর সুখী টুনু, তার দুঃখী মা-বাবার মাঝখানে থেকে তাদের শরীর ওম-এর ভিতরে ডুবুরি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে-দেখতে, আর তার দুঃখী মা-বাবা তার ছোট রোগা নরম শরীরে তাদের নিজেদের দেহের তাপ সঞ্চার করে দিতে দিতে একটা বৃহত্তম কূল–কিনারাহীন অথই অন্ধকারের সমুদ্রের ভিতরে পৃথিবীর আরও লক্ষ-লক্ষ কোটি–কোটি মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে একই দুঃখ বেদনায় জ্বলতে–জ্বলতে খুব ছোট্ট সোনার টুকরোর মতো সুখস্বপ্নের দিকে চোখ রেখে আস্তে আস্তে ডুবে যেতে লাগল।
তৃতীয় পক্ষ
একদম আনকোরা, টাটকা, নতুন বউকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিল কনিষ্ক গুপ্ত। বউয়ের নাম শম্পা। শম্পার সঙ্গে বিয়ের আগে কখনও দেখা হয়নি গুপ্তর। প্রেম-ট্রেমের প্রশ্নই ওঠে না, এমনকী বিয়ের আগে শম্পাকে চোখেও দেখেনি। একটা ফটোগ্রাফ অবশ্য পাঠিয়েছিল ওরা কিন্তু সেটাও স্পর্শ করেনি।
বিয়ের আগে গুপ্তর একটা প্রেম কেঁচে যায়। সে বিয়ে করতে চেয়েছিল মলি নামে এক স্কুল শিক্ষিকাকে। মলি দেখতে-শুনতে যাই হোক, স্বভাব যেমন ধারাই হয়ে যাক না কেন, গুপ্ত তাকে ভালোবাসত। মলিরও গুপ্তর প্রতি ভালোবাসার অভাব দেখা যায়নি কখনও।
