একবার ভাবলেন ডাক্তার চৌধুরিকে প্রেসারটা দেখিয়ে নেবেন।
৮.
চুনুর একটা পা শুকনো কাঠি। একটা হাতও কমজোরি। বড় কষ্ট তার হাঁটাচলার। যে তাকে দেখে সে-ইদুঃখ পায়।
আর অন্যের এই দুঃখবোধটা খুব ভালো কাজে লাগাতে শিখে গেছে চুনু। জানলার কাছে একটা সাইকেল থেমে আছে। সাইকেলের ওপর শিবাজী।
–ডলিকে আমি নিজের চোখে দেখেছি পাম্প ছাড়তে। চুনু খুব ভালো মানুষের মতো বলে।
–কিন্তু আমার পিছনের চাকাটায় তো লিক বেরোল।
–লিক? তবে ঠিক সেফটিপিন ফুটিয়ে দিয়েছিল। তুমি তখন মান্তুদের বাড়িতে ক্যারাম খেলছ। খেলছিলে না?
–ক্যারাম?
–মিথ্যে কথা বোলোনা।
শিবাজী হেসে বললে–খেলছিলাম! তুমি ডলিকে বলেছ?
–না, মাইরি, কালীর দিব্যি।
–তবে বললে কে? ডলি জানল কী করে?
–বলব সত্যি কথা একটা? কিছু মনে করবে না তো?
–বলো না।
–মান্তু। ঠিক মান্তুই বলেছে। মান্তু আজকাল ইউনিভার্সিটির ঝিলে গিয়ে কার সঙ্গে বসে থাকে জানো? তপন।
–সেই বদমাশটা? গেলবারও আমাদের হাতে মার খেয়েছিল?…এই তোমার বাবা!
বলেই শিবাজী জানলার নীচে ডুব দেয়। পরক্ষণেই তার সাইকেলের ঘণ্টি দূরের রাস্তার দমকলের মতো ঘনঘন রি–রি–রিং রি–রি–রিং বাজতে থাকে।
চুনু আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকায়। তার মুখে কোনও অপরাধবোধ নেই। বউদির চিঠি চুরির জন্য মা তাকে বকেনি। আসলে বকতে সাহস পায়নি। বাবাও পাবে না।
দত্তবাবুও জানেন চুনুকে শাসন করার ক্ষমতা তাঁর নেই। কাউকেই শাসন করার ক্ষমতা নেই। এ-বাড়ির কেউই তাঁর কথা শোনে না।
–এ চিঠিটা চুরি করেছিস?
ঠান্ডা গলায় চুনু বলে–বেশ করেছি। একশো বার করব।
এই মেয়ের জন্যই দত্তবাবু আর লীলাময়ী গত পাঁচ বছর এক বিছানায় শুতে পারেননি। চুনু তখন থেকেই তার মাকে প্রায়ই বলত লজ্জা করে না তোমরা বুড়ো বয়সে একসঙ্গে শোও? কেন শোবে?
কী লজ্জা! সেই লজ্জায় লীলাময়ী দত্তবাবুকে বলেছিলেন–মেয়ে যখন চায় না তখন থাক না হয়।
দত্তবাবু গম্ভীর হয়েছিলেন। কিছু বলেননি। লীলাময়ীই আবার নিজে থেকে বলেন–ও তো জানে ওর সাধ আহ্লাদ মিটবে না! তাই বোধহয় হিংসে।
হবে। কিন্তু সেই আক্রোশটা দত্তবাবুর যায়নি এখনও। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন–কী বললি?
তাঁর চেহারাটা কেমন দেখাল কে জানে! হয়তো খুবই ভয়ঙ্কর! দত্তবাবু ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেলেন।
ভয় পায় না, তবে এখন পেল। পিছনে হাত নিয়ে জানলার গ্রিল চেপে ধরে তবু ত্যাড়া ঘাড়ে, চুনু বললে–গায়ে হাত দেবে না বলে দিচ্ছি! ইঃ তেজ দেখাতে এলেন! মুরোদ জানা আছে। কই, বউদিকে তো চোখ রাঙাতে পারো না, যখন মাকে যা তা বলে মুখের ওপর! তোমার উইকনেস।
জানি। বেশি তেজ দেখাতে এলে সবাইকে চেঁচিয়ে বলব।
দত্তবাবু অবশ হয়ে যান। ঘেমে যান। মুহূর্তের মধ্যে। মারবেন বলে হাত তুলেও ছিলেন। সেই হাত সজোরে নেমে ঝুলে পড়ল ফাঁসির মড়ার মতো।
আস্তে-আস্তে ফিরে এসে স্টেটসম্যানের মুখোশ পরলেন।
এই সেদিন অধীপ যখন বিয়ে করবে বলে মাকে গিয়ে ধরেছিল সেদিন লীলাময়ীর কাছে সব শুনে কী রাগটাই না করেছিলেন তিনি। ছেলে তখন সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে। ঢুকেই বিয়ে। পার্মানেন্ট হ। মাইনে একটু ভদ্রগোছের হোক। নইলে তো হ্যাপা সামলাতে হবে বাপকেই।
কিন্তু দত্তবাবুর ইচ্ছেয় কিছু তো হয় না এ-বাড়িতে। যার যা ইচ্ছে তাই করে। অধীপেরও বিয়ে হল।
নতুন বউকে দেখে ভারী মুগ্ধ হয়ে গেলেন দত্তবাবু। বহুকাল এমন মিষ্টি মুখ দেখেননি। বউভাতের পরদিনই মাথাখানা বুকে টেনে বলেছিলেন–এখন তুমিই সংসারের কর্তী।
আত্মবিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন। কথাটা বলা ঠিক হয়নি। সেই থেকে সংসারে অশান্তির সূত্রপাত।
মনের মধ্যে পাপ আছে কি?
কে জানে বাবা! কে জানে! তবে পাপের চেয়েও লজ্জা অনেক বেশি।
শ্বশুরমশাই কী একটা পেছনে লুকিয়ে নিয়ে চুপিসাড়ে বাথরুমের দিকে যাচ্ছেন!
উঁকি মারলেন দত্তবাবু। দেখলেন, তাঁর নীল স্ট্র্যাপের হাওয়াই চপ্পল।
৯.
লীলাময়ী দুটো প্রেসারের বড়ি একসঙ্গে খেলেন। বেড়েছে।
একটা ছিটকিনি খোলার আওয়াজ পেয়েছিলেন যেন একটু আগে। মনের ভুলও হতে পারে। তবে কান খাড়া রাখছেন।
শচীলাল স্নান সেরে এসে নিজেই আসন পেতে জল থালা আর নুন নিয়ে বসে পড়েছেন। ভিতরের বারান্দায়। ডাকছেন–লীলা, দিবি নাকি?
ঠিক এই মুহূর্তে লীলাময়ীর রাগ হল না। ক’দিন আগেও শচীলাল জামাইয়ের সঙ্গে ছাড়া খেতেন না। ভদ্রতাবোধ বরাবরই প্রবল। ইদানীং এইসব হচ্ছে। লীলাময়ী বললেন–বসে থাকো একটু। যাচ্ছি।
শচীলাল বসে থাকেন। দুর্গন্ধ পাচ্ছেন ঠিকই। গা করছেন না। বড় মেয়ে হিরন্ময়ী বলেছে, নিয়ে যাবে শিগগিরই। হিরন্ময়ীর অবস্থা ভালো, দু-বেলা মাছ হয়, মাঝে-মাঝেই পোলাও। কতকাল পোলাও খান না শচীলাল!
লীলাময়ী টের পান, সুভদ্রা দরজা খুলল। প্যাসেজ দিয়ে নাতিটার পায়ের আওয়াজ ধেয়ে আসছে, কচিগলার ডাক এলঠানু। ও ঠানু আমরা যাচ্ছি।
সুভদ্রা গর্জায়–এই! খবরদার যাবি না। গলা টিপে মেরে ফেলব তাহলে।
ছেলেটা ফিরে যায়। একটু কাঁদে কি? লীলাময়ী উঁকি মেরে দেখেন প্যাসেজ দিয়ে বাথরুমের দিকে গেল সুভদ্রা। ছেলের নড়া শক্ত হাতে ধরা। সাজগোজ সব হয়ে গেছে। যাওয়ার জায়গা বলতে বাপের বাড়ি। তা যাক। বাড়িটা জুড়োবে!
–লীলা দিবি? শচীলাল ডাকেন।
