এবারে রাগেন লীলাময়ী! চাপা গর্জনে বলে–বড়দিরও আক্কেল দেখছি! কবে থেকে বাবাকে নিয়ে যাওয়ার কথা। সব যে যার স্বার্থ দেখছে। এই বুড়োর হ্যাপা যত আমাকেই সামলাতে হবে বরাবর? শরীর আমার বারো মাস খারাপ থাকে! স্বার্থপর, সব স্বার্থপর।
দ্রুত পায়ে বারান্দায় গিয়ে তিনি শচীলালের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলেন–কেন তোমার গুণধর ছেলে বাবাকে নিয়ে ক’দিন রাখতে পারে না? নাকি তাতে বউয়ের মাথা ধরার ব্যামো বাড়বে।
১০.
উঠোন কোমর পর্যন্ত গর্ত খুঁড়ে ফেলেছে মাগন। ঘামে জবজব করছে। পায়ে কাঁচের টুকরো ফুটেছে একটা। সেটা নখে টেনে তুলে ফেলল। কাটা জায়গাটা হাত দিয়ে ঘষে রক্ত লেপটে দিল।
–কী রে, দিন কাবার করবি নাকি?
–হচ্ছে বাবা, হচ্ছে। মাগন গর্ত থেকে উঠে এসে এক নম্বর ট্যাংকিতে বালতি নামিয়ে বলে –আভি দেখে লিন, সব সাফা।
রসিকবাবুর স্ত্রী ওপর থেকে এবং দত্তবাবু নীচে থেকে একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠেন–অনেক ময়লা রয়েছে এখনও!
মাগন হাসে। বলে–ময়লা তো আছে মালিক, কিন্তু উ তো সব শুখা মাল আছে। মালটা শক্তো হয়ে গেছে বড়বাবু, উঠবে নাহি।
–নাম ব্যাটা ট্যাংকে, নেমে কোদাল মেরে চেঁছে তোল। টাকা কি গাছে ফলে?
–হাঁ–হাঁ বাত তো ঠিক আছে বড়বাবু। লেকিন পাঁচ রুপেয়া বকশিশ দিয়ে দিবেন। চালিশ টাকার তো পাসিনা চলিয়ে যাচ্ছে। ভিটামিন দিবে কৌন?
মাগন ট্যাংকে নামে। গার্দা সব পাথরের মতো বসে গেছে। থকথক করছে পোকা, জল। বহোত গন্ধা। কোদালে ময়লা চাঁচতে–চাঁচতে মাগন আপনমনে বলে–কাম পুরা করে পয়সা লিব মালিক। বহোত গাদা বাবা, বহোত গন্ধা। সব গাদা সাফ থোড়াই হোবে বাবা। গার্দা কুছ জরুর থেকে যাবে মালিক! সব গাদা কখনও সাফা হয় না।
ডুবুরি
আঁচিয়ে এসে ঘরে ঢুকতেই থমকে গেল টুনু। বাঁশের মাচার ওপর বিছানায় মাথা গুঁজে মা কাঁদছে। একটু আগে তাদের খেতে দিয়ে মা পুকুরে গিয়েছিলেন স্নান করতে। এখনও মা’র শাড়িটা ভেজা। মাটির মেঝেটা শাড়ির জলে অনেকটা ভিজে গিয়ে কাদা–কাদা হয়ে গিয়েছে। সেই কাদা মা’র হাঁটুর কাছে আর গোঁড়ালিতে লেগে আছে। মেজেতে বসে উঁচু হয়ে ময়লা কাঁথা আর শাড়ির পাড় ছিঁড়ে তৈরি করা চাদরের বিছানায় মুখ গুঁজে মা ফুলে ফুলে কাঁদছে।
মাকে কাঁদতে এই প্রথম দেখছে না টুনু, বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলে কিংবা বাবা মারলে মা চিৎকার করে সারা কলোনিকে জানিয়ে কাঁদতে বসে। কিন্তু এইভাবে ফুলে ফুলে নিঃশব্দে কান্নাটা অন্যরকম। টুনু ভয় পেয়ে গেল। বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল তার।
টুনু ফিসফিস করে ডাকে–’মা, ওমা, মা।’ মা উত্তর দেয় না। টুনু আস্তে-আস্তে মার কাছে এগোয়–’মা, কান্দ ক্যান গো? কী হইছে?’
কান্নার সঙ্গে-সঙ্গে মা’র খালি পিঠের পাতলা চামড়া ভেদ করে পাঁজরের হাড়গুলো গিরগির করে উঠছে। টুনু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ প্রায় চিৎকার করে ওঠে সে-’কি হইছে কও না ক্যান?’
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে মা’র কান্না থেমে যায়। সোজা হয়ে বসে মা। ভেজা মাথার চুল থেকে কেঁচোর মতো মোটা-মোটা ধারায় জল এঁকে-বেঁকে নেমে চোখের জলের সঙ্গে মিশে হাড়-উঁচু শুকনো মুখের থুতনিতে এসে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে।
টুনু চেয়ে থাকে। মার গলার কাছটা ফুলে ফুলে উঠছে। ফোঁপাতে–ফোঁপাতে চোখের জল হাত দিয়ে মুছে মা বলে–’কিসু হয় নাই, চিকইর দিস না।’
–‘কিসু হয় নাই, তবে কান্দ ক্যান? কী হইছে কও না আমারে।’
–‘কইলাম তো কিছু হয় নাই। খাইছস নি প্যাট ভইরা?’
টুনু এগিয়ে গিয়ে মার কাছে, খুব কাছে দাঁড়ায়। তারপর সোজা হয়ে মা’র চোখের দিকে তাকিয়ে বারো বছরের টুনু বিজ্ঞের মতো বলে–’কী হইছে কও না আমারে।’
–’চুপ–চুপ, আস্তে। কেউ য্যান শোনে না।’ মা তাড়াতাড়ি চাপা গলায় বলে–’তর বাবায় ট্যার পাইলে কিন্তু আস্ত রাখব না। দুলটা পুকুরে হারাইছি।’
টুনু বুঝতে পারে। কেন না, সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, মার বাঁ-কানের লতিটা শূন্য। ওখানে একটু আগেও ঝকঝকে সোনার দুলটা দুলছিল। যদিও মাকে খুব বেমানান লাগছিল। হাড়–উঁচু মুখ, প্রায় ন্যাকড়ার মতো জ্যালজেলে ময়লা শাড়ি আর রুক্ষ তেল–না-দেওয়া চুলের সঙ্গে দুলটার কোনও মিল ছিল না। কাল রাতেও বাবা ঠাট্টা করে বলেছে–’গোবরে পদ্মফুল। মাইনসের যেমুন দুল চাই, দুলেরও হেমুন মানুষ চাই। সাজলেই হয় না গো মাইজ্যা বউ।’ এসব কথায় মা রেগে গিয়েছিল খুব। রাগ করে বলেছে–’হগো হ’ শরীল যে গেছে হেই দোষটা আমারে না দিয়া বুঝি শান্তি পাও না। মাইয়ামানুষ পালতে গেলে মুরাদ চাই, বুঝলানি! কয় ট্যাহা রোজগার করো। তুমি যে, শরীল তুইল্যা কথা কও!’ কিন্তু ঝগড়াটা শেষ পর্যন্ত খুব সাংঘাতিক হয়নি। কারণ, কাল সুভাষ পল্লির হারান জ্যাঠার মেয়ে লতিদির বিয়েতে গিয়েছিল দুজন। তা না হলে কীভাবে মার একটা একটা গয়না নিয়ে বিক্রি করে সংসার খরচ চালিয়েছে বাবা, সে কথা না বলে এবং বুক চাপড়ে না কেঁদে মা থামত না।
কাল রাতে মা তার বহু পুরোনো লাল রঙের ওপর সাদা জরির তারাফুল তোলা বেনারসিটা পরে বাবার সঙ্গে লতিদির বিয়েতে গিয়েছিল। বিয়ের নিমন্ত্রণে গেলেই মা বেনারসিটা পরে আর কানে দুলজোড়া। এছাড়া মা’র আর ভালো পোশাক নেই, গয়নাও নেই, শুধু হাতে কয়েক গোছা ব্রোঞ্জের চুড়ি ছাড়া।
