শচীলাল ডাক্তারের গন্ধ পেয়েছেন। থুথু ফেলার জন্য তাঁর একটা টিনের কৌটো আছে। সেইটে গিয়ে গোপনে বেসিনে ধুচ্ছিলেন। জল ঘাঁটছেন টের পেলে মেয়ে আজকাল বড় বকে।
ডাক্তারের সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি কৌটো রেখে বাইরের বারান্দায় এসে বসেই বললেন–বুঝলেন ডাক্তারবাবু, গত দু-বছর যাবৎ আমার পেটের কোনও গোলমাল নেই।
চৌধুরি হেসে বলেন বাঃ খুব ভালো।
–যা খাই সব হজম হয়। ইটের মতো শক্ত পায়খানা। আপনি আমাকে রোজ সকালে দুটো করে মুরগির ডিম খাওয়ার ব্যবস্থা দিয়ে যান।
–সে আমি বুঝব খন। শ্বাসের কষ্টটা কেমন আছে?
–এটাই যা একটু কষ্ট দেয়, আর সব ভালো।
লীলাময়ী চা নিয়ে এসে বাবাকে দেখে বড়-বড় চোখে তাকিয়ে বলেন–তোমার আবার কী?
শচীলাল একগাল হেসে চৌধুরিকে বলেন বুঝলেন ডাক্তারবাবু লীলা ভাবে আমি পেট খারাপের কথা লুকোই। কাল তাই প্যানের ওপর পায়খানা করে ডেকে দেখালাম। বল না লীলা ডাক্তারবাবুকে কেমন পায়খানা!
চৌধুরি বলেন–আচ্ছা, দেখা যাবে।
লীলাময়ীর মুখ ফেটে পড়ছে রাগে, চাপা গলায় শচীলালকে বলেন–এখন ঘরে যাও তো!
–চা করলি?
–তুমি এখন খাবে না চা। স্নান করো গে। একেবারে ভাত দেব।
–চালকুমড়ো পাতার পুর করবি না?
লীলাময়ীর হাত-পা নিশপিশ করে। গোপনে আবার এসে, বউমার ঘরের দরজা নাড়া দেন–শুনছ বউমা!
ঘরে ছেলেটা কাঁদছে অনেকক্ষণ ধরে। বাপ-মায়ের রুদ্রমূর্তি দেখেই শুরু করেছিল। তারপর থেকে ভ্যাবাচ্ছেই।
সুভদ্রার কান্না থেমেছে। গম্ভীর গলায় বলল –ডাক্তার বিদেয় করে দিন গে। আমি দেখাব। আর বিরক্ত করবেন না আমাকে।
ভারী অসহায় বোধ করেন লীলাময়ী। কী করবেন? চৌধুরি এসেছেই যখন, রুগি দেখুক আর দেখুক, ভিজিটের টাকাটা দিতেই হয়। কিন্তু অধীপ ভিজিটের টাকা রেখে যায়নি।
৭.
–ইসি ট্যাংকিমে আর কুছু নাই বড়বাবু।
–নেই মানে? ইয়ার্কি পেয়েছিস? ডান্ডা মার, মার ডান্ডা। দেখি কতখানি আছে।
মাগন বলে–হাঁ–হাঁ দেখে লিন।
ডান্ডা মারতেই সেটা ভচাক করে দু-হাত পুরু ময়লায় ডেবে গেল।
–ওই তো। এখনও অর্ধেক রয়ে গেছে। চালাকি করার আর জায়গা পাস না? চল্লিশ টাকা কি এমনি–এমনি দেব?
ডান্ডা তুলে ময়লার দাগ দেখিয়ে মাগন বলে–বাস এইটুকু তো সব ট্যাংকিতে থাকে। ট্যাংকি কি কখনও পুরা সাফা হয় বড়বাবু? কুছু তো থেকেই যায়। ই তো স্রিফ বালু আছে।
–বকবক না করে কাজ কর তো।
–হাঁ–হাঁ কাম তো করছে বড়বাবু।
দুনম্বর ট্যাংকিতে জলের নীচে ময়লা এখনও থকথক করছে। শক্ত মাল। বালতি মারলে ডোবে না। পা গর্তে ঢুকিয়ে চেপে বালতি ডোবায় মাগন। বলে বহোত পরেসান বাবা। একটা পুরানা জামা দিবেন তো বড়বাবু? ট্যাংকি বেডরুম বানিয়ে দিব।
লীলাময়ী আসছেন টের পেয়েই দত্তবাবু স্টেটসম্যানের মুখোশটা পরে নিলেন।
কিন্তু লীলাময়ী এলেনই। নাকে চাপা আঁচলের ফাঁক দিয়ে বললেন–চৌধুরি এসেছে। বউমা ডাক্তার দেখাবে না বলছে। কিন্তু ভিজিটটা তো দিতে হয়। অধীপ টাকা রেখে যায়নি।
বিরক্ত দত্তবাবু বলেন–আমার ব্যাগ থেকে নিয়ে দাও গে। অধীপ এলে চেয়ে রেখো।
–চাইব, কিন্তু সে দেবে কেন? তার বউকে তো আর দেখেনি।
–সেই তো ডেকেছে, আমরা তো কল দিইনি। রেসপনসিবিলিটি তার। লীলাময়ী নাকটা ছেড়ে একটু দম নিতে গিয়েই দুর্গন্ধে শিউরে উঠে ‘হ্যাক’ শব্দ করে আবার নাকে চাপা দিয়ে বলেন–বলছি কী, ভিজিট যখন দিচ্ছিই তখন আর মাগনা ছাড়ি কেন। প্রেসারটা দেখিয়ে নিই। বাবার বুকটাও পরীক্ষা করুক। তুমিও তো পরশুদিন মাথা ঘোরার কথা বলছিলে, দেখিয়ে নেবে নাকি?
ঠিক এই সময়ে ওপর থেকে রসিকবাবুর স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠে বলেন–এই জমাদার! নর্দমায় ময়লা ফেলছ যে বড়? নালি আটকে যাচ্ছে না? মাগন মুখ তুলে বলেন–নালি টেনে দিব মা। কাম পুরা করে পয়সা লিব।
–কেন, গর্ত করতে কী হয়? বলা হয়নি তোমাকে গর্ত খুঁড়তে? টাকা মাগনা আসে?
–হাঁ–হাঁ, গাজ্ঞা কী হোবে।
রসিকবাবুর স্ত্রী বেশ চেঁচিয়ে বলতে থাকেন–ছ’মাস আগে ট্যাংক পরিস্কার করানো হয়েছে, এর মধ্যেই যে কী করে ভরে যায় তা তো বুঝি না।
কথাটা গায়ে না মাখলেও হয়। কিন্তু লীলাময়ী মাখলেন।
–শুনলে?
দত্তবাবু স্টেটসম্যানের মুখোশ পরে ফেলেন। লীলাময়ী মুখটা সিলিং-এর দিকে তুলে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়েন–ময়লা কি শুধু আমাদের একার? ওপরতলায় বুঝি সব দেবতারা থাকেন, তাঁরা কেউ হাগেন মোতেন না? আর জমাদারের টাকার অর্ধেক তো আমাদেরও দিতে হবে। মাগনা কাজ হচ্ছে নাকি?
রসিকবাবুর স্ত্রী নাগাড়ে চালিয়ে যাচ্ছেন। সব কথা বোঝা যায় না। শুধু স্পষ্ট করে শুনিয়ে বললেন–ওই তো ছেলে ধরতে বিবি বেরিয়ে গেলেন। আর দোষ হল কি না আমার মিলনের! গুষ্টিসুদ্ধি তেড়ে এসেছিলেন ঝগড়া করতে। বলি, মেয়ে কোথায় যায়, কার সঙ্গে কীরকম ঢলাঢলি তার খবর রাখছে কে? সে বেলা তো চোখে তুলসীপাতা এঁটে থাকা হয়।
লীলাময়ী এখন আর দুর্গন্ধটা পাচ্ছেন না। নাকের কাপড় কখন খসে গেছে। বড়-বড় চোখে লীলাময়ী স্বামীর দিকে তাকান। মুখে কথা নেই।
দত্তবাবু এমন মুখের ভাবখানা করেন, যেন তাঁর মেয়ে বা তাঁর পরিবার নিয়ে কথা হচ্ছে না। এ যেন অন্য কারও কথা। প্রচণ্ড জিদবশত তিনি কাগজে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণ দাঙ্গার খবর পড়তে থাকেন। একবর্ণও বুঝতে পারেন না।
