আশ্চর্যের বিষয়, অধীপ হাসল। অবশ্য এটা হাসি নয়। খুন করার আগে অভ্যস্ত খুনি কখনও সখনও এরকমই হাসে হয়তো।
তার পরেই সে চড়টা মারল। সুভদ্রা যে পাঁচ মাসের পোয়াতি তা মনে রইল না। লক্ষও করল যে তার দু-বছরের ছেলে দৃশ্যটা দেখছে।
৫.
–চালা! জোরসে চালা জলদি।
–হচ্ছে বাবা, হচ্ছে। পাম্প তো নেহি যে ভটভট করে গাদা খিচে লিবে!
দু-নম্বর ট্যাংকিতে ঘপ করে বালতি মারে মাগন। হাউস ফুল।
দত্তবাবু চেঁচিয়ে বলেন–এই ব্যাটা ময়লা ফেলার গর্ত করবি না?
–হ্যাঁ-হ্যাঁ, গোর্তো হোবে, গোর্তো ভি হোবে। এক বোতল শরাবের দাম দিবেন তো বড়বাবু?
–নালিতে ময়লা ফেলবি তো পয়সা কাটব। নালি আটকালে বাড়িওয়ালা পাঁচ কথা শোনাবে। খুব সাবধান।
–কোই চিন্তা নাই বড়বাবু। কাম পুরা করে পয়সা লিব।
প্লাস পাওয়ারের চশমাটা পরেও স্টেটসম্যানের খবরগুলো দেখতে পান না দত্তবাবু। পুরোটাই আবছা, অস্পষ্ট, হিজিবিজি এবং অর্থহীন। তবু মুখের সামনে কাগজটা ধরে রাখেন। মুখোশের মতো।
মুনমুনকে চিঠি দিয়েছিল বাড়িওয়ালার ছেলে মিলন। সেই চিঠি বাড়িওয়ালা রসিকবাবুর হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন দত্তবাবু। সেই থেকে গণ্ডগোলের শুরু। রসিকবাবুর স্ত্রী ওপরতলা থেকে পরিষ্কার শুনিয়ে দিলেন–এ হতেই পারে না। নষ্ট মেয়েটার পাল্লায় পড়ে মিলুও গোল্লায় যাচ্ছে। তুলে দাও।
দত্তবাবুর কিছু বলার দরকার হয়নি, লীলাময়ী নীচতলা থেকে গুষ্টি উদ্ধার করলেন ওঁদের। কয়েকদিন দত্তবাবু বুকের প্যালপিটিশনে কষ্ট পেলেন খুব। তাঁর খুব ইচ্ছে করে, যে বাড়িওয়ালার যুবক ছেলে নেই তার বাড়িতে উঠে যান। কিন্তু ইচ্ছে তো আর পক্ষিরাজ নয়।
এক বছর আগেকার সেই ঘটনা থেকেই অশান্তি চলছে। রান্না করতে-করতে মাঝখানে কলের জল বন্ধ হয়ে যায়। আঁচাতে গিয়ে বেসিনে জল পাওয়া যায় না। লীলাময়ী নীচে থেকে দাপিয়ে চেঁচান। আর দত্তবাবুর ঝি বাসন মেজে কলতলায় ছাই ফেলে এলে ওপর থেকেও দাপানো আর চেঁচানোর শব্দ হয়।
শ্বশুরমশাই বকের মতো পা ফেলে বাথরুমে যাচ্ছেন জল ঘাঁটতে। এ-বাড়ির জলকষ্টের মূলে এই লোকটার অবদান বড় কম নেই। সারাদিন জল ঘাঁটছে লোকটা। হাঁপানি আছে। সর্দির ধাত আছে। সারারাতের কাশি আছে। আর সেইসঙ্গে জল ঘাঁটাও আছে। জল ঘটুক, তাতে দত্তবাবুর আপত্তি নেই। তিনি শুধু শ্বশুরমশাইয়ের পায়ের চপ্পলটা লক্ষ করলেন। দত্তবাবুর চপ্পলের স্ট্র্যাপ নীল রঙের, শ্বশুরেরটা খয়েরি।
খয়েরি দেখে দত্তবাবু নিশ্চিন্ত হয়ে আবার স্টেটসম্যানের মুখোশ পরলেন, পরার দরকার ছিল। কারণ, লীলাময়ী আসছেন।
এসে একটা মুখ ভেঁড়া খাম দত্তবাবুর হাতে দিয়ে বললেন–এই সেই চিঠি?
–কীসের চিঠি?
–বউমার বাক্স থেকে বোধহয় চুনু নিয়েছিল।
–কেন?
–অন্যায় করেছে নিয়েছে। হয়তো লোভ সামলাতে পারেনি। এই নিয়েই অধীপের সঙ্গে ওই ঝগড়া।
দত্তবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে বললেন–কবেকার চিঠি?
–বিয়ের আগে অধীপ বউমাকে যেসব চিঠি লিখত তারই একটা। কী দরকার ছিল পুরোনো চিঠি জমিয়ে বুকে করে রাখবার? পুড়িয়ে ফেলা যেত না! ঘরে বয়েসের ননদরা, কোলের ছেলেও বড় হচ্ছে…
–তুমি চিঠিটা পড়েছ?
খুব দৃঢ় গলায় নয়। ঝংকার দিয়ে লীলাময়ী বললেন–পড়ব কেন?
–পড়োনি?
–ওপর–ওপর দেখেছি একটু। কী এমন কথা যার জন্য মাগির আঁতে ঘা পড়ল।…ওঃ, এই দুর্গন্ধের মধ্যে বসে আছ কী করে? তুমি মানুষ না কি?
দত্তবাবু বললেন–পড়ে ভালো করোনি।
–কেন? ভালো না করারই কী? তুমিও দ্যাখো না। বলে লীলাময়ী খাম থেকে চিঠিটা খুলে নিয়ে দত্তবাবুর হাতে দিয়ে বলে–পড়েই দ্যাখো।
–বউমা কী করছে?
–কাঁদছে, ঘরে দরজা দিয়ে।
–তুমি যাও।
লীলাময়ী চলে গেলে দত্তবাবু চিঠিটা খোলেন।…অশ্লীল, খুবই অশ্লীল চিঠিটা।
মন থেকে আজ কেমন জোর পাচ্ছেন না। মনের জোরের জন্য খানিকটা নৈতিকতা দরকার। হ্যাঁ, মর্যালিটি তা কি তাঁর আছে?
লীলাময়ী দুর্গন্ধের কথা বলে গেলেন। কিন্তু তিনি দুর্গন্ধ পাচ্ছিলেন না।
৬.
ডাক্তারকে খবর দেওয়া ছিল। সদর থেকে তাঁর হাঁক শোনা গেল এইমাত্ৰকই বউমা কোথায়?
বাইরের বারান্দাটাই এখন বসার ঘর। অধীপের বিয়ের পরই বাইরের ঘরটার দরকার হল। তখন বারান্দাটা প্লাইউড দিয়ে ঘিরে সোফা সেট পাততে হল।
লীলাময়ী প্রমাদ গুনলেন। বউমাকে দেখতে এসেছে। সর্বনাশ! তার বাঁ-গালে অধীপের পাঁচ আঙুলের দাগ ফুটে আছে এখনও, তার ওপর নাগাড়ে কাঁদছে। বাইরের লোকের সামনে বেরোবে না কিছুতেই। যদিও বা বেরোয় তো ডাক্তার সবই লক্ষ করবে।
উঠে গিয়ে তিনি ঘোমটা টেনে বললেন বসুন।
–বেশি বসবার উপায় নেই। চেম্বারে রুগি বসে আছে।
লীলাময়ী নিঃশব্দে গিয়ে দরজায় সামান্য শব্দ করে চাপা গলায় ডাকেন–বউমা! বউমা! ডাক্তারবাবু এসেছেন, দরজা খুলে দাও। ঠিকঠাক হয়ে নাও।
সুভদ্রা পাঁচ মাসের পোয়াতি। বড় ছেলে দুই পেরিয়েছে। সে হতে বড় কষ্ট গিয়েছিল। অধীপ তাই ঘনঘন ডাক্তার ডেকে চেক আপ করায়। কিন্তু অধীপটা রাগারাগি করে বেরিয়ে গেছে। অবস্থাটা সামাল দেবেন কীভাবে তা ভাবতে-ভাবতে লীলাময়ী গিয়ে চায়ের জল চাপান। চৌধুরি পারিবারিক ডাক্তার, তাঁর কাছে তেমন লজ্জা নেই। তবু তো লজ্জা! আজকালকার বউয়েরাও ভারী নির্লজ্জ। কথায়-কথায় পরপুরুষ ডাক্তারদের কাছে নিজেদের খুলে দেয়। ডাক্তাররা গোপন জায়গায় হাত দেয়, টিপ দিয়ে দেখে, অসভ্য সব প্রশ্ন করে। মাগো! লীলাময়ী মরে গেলেও পারবেন না। তাঁকে কয়েকবার লেডি ডাক্তাররা দেখেছিল। তাতেই কী লজ্জা!
