তাই তো উচিত।
আর নিজের ছেলেটাকেও শেখাব, অন্যে ঢিল মারলে কি করে উলটে ঢিল মারতে হয়।
যোগেন সরল হাসি হেসে বলে, সেও তো উচিত কথাই।
গজপতি বলে, আর এইসব করতে করতেই বাকি জীবনটা চলে যাবে। কী বলেন?
খুব যাবে, খুব যাবে।
যাই তাহলে? পিলখানার সেই চোদ্দোটা হাতি স্বপ্নে মিলিয়ে গেছে কবে। তেজোময়ী নেই, যোগেন ঘোষও এসে গেল। বাঁশির দম ফুরিয়েছে। তবে আর কী? গজপতি সাইকেলে উঠে পড়ে। জামবনি অনেক দূর। সাইকেলের চাকায় তেমন হাওয়া নেই। মোড়ের দোকানে হাওয়া ভরে নেবে। ন্যালাখ্যাপা ছেলেটাকে বড় ঢিল মারছে ছেলেরা। গাছতলায় দাঁড়িয়ে ছেলেটা হয়তো “বাবা বাবা” বলে কাঁদছে।
জমা খরচ
কী বুঝছ মুখুজ্জে? চল্লিশ পেরিয়ে জীবনের এক-আধটা হিসেব কষে ফেলা উচিত ছিল তোমার। একদিন ছুটি-টুটি দেখে বরং একটা খাতা নিয়ে বসে যাও। একদিকে লেখো জমা, অন্য ধারে খরচ। ওই যেমন অ্যাকাউন্ট্যান্টরা ডেবিট-ক্রেডিট লেখে আর কি?
জমার ঘরে প্রথমেই লেখো, জন্ম। ওটা প্লাস পয়েন্ট। একটা আর্নিং তো বটেই। কিন্তু আয়ুটাকে জমার ঘরে রেখো না। জন্মের পর থেকে আয়ু আর জমা হয় না। ওটা খরচ বলে ধরো।
ব্যালানস শিটটার দিকে একবার তাকাও, ভালো দেখাচ্ছে না? জমা, জন্ম। খরচ, আয়ু।
জন্মের পর একরোখা বহুদূরে চলে এসেছ। টর্চের আলোটা একটু পিছন দিকে ঘুরিয়ে ফেলবে নাকি? মগজের ব্যাটারি এখন আর তেমন জোরালো নয় হে। আলো একটু টিমটিমে। তবু দেখা যায়। একটা সাইকেল দেখতে পাচ্ছ, মাটির দাওয়ায় ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো? একটা লেবু গাছ! আর ওই মস্ত সেই নদী! শীতের দুধসাদা চর জেগে ওঠে বুকে, ভরা বর্ষায় রেলগাড়ির মতো বয়ে যায়!
এসব কোনও খাতেই লিখো না মুখুজ্জে। ওগুলো না জমা, না খরচ। ওই সেই বাঘের মতো রাগী লোকটা সন্ধ্যায় আবছায়ায় পুবমুখো মস্ত ডেক চেয়ারে বসে আছে বারান্দায়! চেনো তো! আর কারও বশ মানেনি, কখনও, কেবল তোমার কাছে মেনেছিল। তোমার ইস্কুলের হাতের লেখা পর্যন্ত চুপি–চুপি লিখে দিত, ভুলে গেছ? কোন খাতে ধরবে তোমার দাদুকে?
জমার ঘরে ধরলে? ভুল করলে না তো? একটু ভেবে দ্যাখো। বরং কেটে দাও। কোনও খাতেই ধোরো না।
ময়ুরটার কথা লিখবে নাকি? সত্যি বটে, গোলোকপুরের জমিদার বাড়ির মস্ত উঠোনে পাম গাছের নীচে ওকে তুমি বহুবার পেখম ধরে থাকতে দেখেছ। চালচিত্রের মতো রঙিন বিস্ময়। কিন্তু বলো, বিস্ময় আমাদের কোনও কাজে লাগে? আমাদের মূলধন জমার খাতে সৌন্দর্যের কোনও ভূমিকাই নেই।
বরং জমার খাতে ধরতে পারো তোমার জেঠিমার হাতে ডাল ফোড়নোর গন্ধটাকে। ওই অসম্ভব সুন্দর ডাল দিয়ে থাবাথাবি করে কতজন ভাইবোন মিলে এক থালায় ভাত মেখে খেতে।
আর বর্ষায় মুকুন্দর ঘানিঘরের পিছনে যে কদমফুল ফুটত! যদি খুব ইচ্ছে হয়, তবে ওটাকেও জমার ঘরেই ধরতে পারো। তবে আমি বলি ফুলটুল জীবনে খুব একটা কাজে লাগে না। কদম ফুল অবশ্য লেগেছিল। পাপড়ি ছিঁড়ে গোল মুণ্ডুটা দিয়ে তোমরা ফুটবল খেলতে শিখল।
প্রথম এরোপ্লেন দেখার কথা মনে পড়ে? টর্চটা ভালো করে ফেলো। দেখতে পাবে। ওই যে কলকাতার মনোহরপুকুরের সেই দোতলার ঘর? দেশের বাড়ি, নদী, লেবু বন, দাদু সবকিছু থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল তোমাকে। সারাদিন মন খারাপ। পৃথিবী জুড়ে তখন বিশাল এক যুদ্ধ চলছে। এরোপ্লেনের আওয়াজ পেলেই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসতে তুমি। মাথাটা। উঁচুতে তুলতে। তুলতে-তুলতে মাথা লটকে যেত পিঠের সঙ্গে। এরোপ্লেন যেত ঝাঁক বেঁধে। তার মধ্যে একটা এরোপ্লেন দলছুট হয়ে একটা ডিগবাজি খেয়ে নিয়ে আবার উড়ে গেল।
তোমার শৈশব মাখামাখি হয়ে আছে রেলগাড়ি আর এরোপ্লেনে। তোমার ভিতরে জঙ্গল, পাহাড়, নদী, কুয়াশা, চা-বাগান ঢুকে পড়েছিল কবে! আজও তুমি তাই নিজের চারদিকটা স্পষ্ট করে দেখতে পাও না। মাঝে-মাঝে ঝুম হয়ে বসে থাকো। তোমার মাথার মধ্যে রেললাইন দিয়ে গাড়ি বহু দূরে চলে যায়, আকাশ পেরোয় বিষণ্ণ এরোপ্লেনের শব্দ, অবিরল নদী বইতে থাকে। তোমার সময় যায় বৃথা। মুখুজ্জে, এগুলো তোমার খরচের দিকে ধরে রাখো।
সেই কোকিলের ডাকের কথা তুমি বহুবার শুনিয়েছ লোককে। কাটিহারের সেই ভোরবেলা, শীতশেষের কুয়াশা মাখা আবছায়ায় শিমূল বা মাদার গাছের মগডাল থেকে একটা কোকিল ডেকে উঠেছিল। সেই ডাকে অকস্মাৎ ভেঙে পড়ল শৈশবের নির্মোক। তুমি জেগে উঠলে। সত্যি নাকি মুখুজ্জে? ঠিক এরকম হয়েছিল?
সেই কোকিলের ডাকের কথা তুমি একদিন বড় হয়ে বলেছিলে তোমার ভালোবাসার যুবতীটিকে।
সে বলল , যাঃ।
সত্যি। তুমি বুঝবে না বুলু। এরকমই হয়েছিল।
কোকিলের ডাক আমি তো কত শুনেছি। কোনওদিন আমার সেরকম হয়নি তো।
আঃ, কোকিলের ডাকটাই তো আর বড় কথা নয়।
তবে?
সে যে সেই বিশেষ মুহূর্তে ডেকে উঠল সেইটেই বড় কথা।
বিশেষ মুহূর্তটা কীসের?
শিশু বয়সের অবচেতনার ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ল যে।
যাঃ, বানানো কথা।
মুখুজ্জে, আজও তুমি ঠিক করতে পারোনি, কোকিলটাকে কোন খাতে ধরবে। কিন্তু কোনও-কোনও খাতে ধরতেই হবে যে, ওটা যে তোমার জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল।
ধরো, জমার খাতেই ধরো।
কোকিলের ডাকের পরেই এল মঞ্জু। মঞ্জুই তো? ঠিক বলছি না! মঞ্জুর মতো সুন্দর মেয়ে সেই বয়সে তুমি আর দ্যাখোনি। বব চুল, ফরসা, টুকটুকে, মেম ছাঁটের ফ্রক। এর কথাও তুমি বহুবার বলেছ।
