হবে, সবই হবে। মস্ত ইঁদারা বা পুকুর, টিপকল। মাঠটা ছেয়ে যাবে দোচালায়। এত বড় হাট কেউ দেখেনি। পূর্বধারে একটা গোহাটা করারও ইচ্ছে আছে গজপতির। শিবরাত্রিতে মেলা বসাবে! কে জানে, তেজোময়ী খুব শিবরাত্রি করত। নীচু চালা থেকে একটা গরু খড় টেনে খাচ্ছিল। সেটাকে তাড়িয়ে গজপতি ফের ছাতা মাথায় সাইকেলে চাপল।
বাড়িটাও তেজোময়ীর। উইল অনুসারে এখন গজপতির। তবে সর্বত্রই ওই এক অদেখা চার আনার হিস্যাদার। বাড়িতে দুটো মাত্র ঘর। একটু বারান্দা। ভিতরে একটু উঠোন। উঠোনে পাতকুয়ো। এর চার আনা ভাগাভাগি কী করে যে হবে তা মাথায় আসে না গজপতির। আর ভাগাভাগিই যে হবে তার কোনও ঠিক নেই। দৈত্য যোগেন ঘোষ এসে যদি তাকে ঘাড় ধরে। ভিটে–ছাড়া করে তাহলেও তো কেউ গজপতির পক্ষ নেবে না। তেজোময়ীর জারকে এই অঞ্চলের লোক ভালো চোখে দেখে না। তারা ঠিক যোগেনের পক্ষ নেবে। গজপতি পাতকোর ঠান্ডা জলে স্নান করে ভাত বেঁধে খেল। একটু গড়িয়ে নিল। সন্ধেবেলা মস্ত চাঁদ উঠলে পর সিঁড়িতে বসে বাঁশি ধরল গজপতি। বারান্দার ইজিচেয়ারে তেজোময়ীও এসে বসল। চোখ বুজে বাঁশির মধ্যে বুকের সবটুকু বাতাস উজাড় করে দিতে-দিতে স্পষ্টই টের পায় সে তেজোময়ীকে। এত লোক থাকতে ওই সুন্দর মেয়েটা যে কেন গজপতিকেই তুলে এনেছিল তা কখনও জেনে নেওয়া হয়নি। সত্যি বটে, বয়সকালে গজপতির চেহারাটা ছিল কেষ্টঠাকুরের মতো। মাজা রং। ঢুলুঢুলু চোখ। টলটলে মুখ। আর ছিল বাঁশি। কিন্তু শুধু এইটুকুতেই ভুলবার মানুষ তো তেজোময়ী ছিল না। তবে? জ্যোৎস্নাটা বড় ধাঁধাঁ করছে। গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। একটা বয়সের পর জ্যোৎস্নাটাও ভালো লাগে না বোধহয়। কিছুই তো আর থেমে নেই। সব পালটে যাচ্ছে। গজপতির কেষ্টঠাকুরের মতো চেহারাটা এখন শুকিয়ে হকি। বাঁশির দমেও আজকাল টানাটানি। তেজোময়ী নেই, খামোকা চাঁদটা জ্যোৎস্নার কেরানি দেখাচ্ছে। ভারী ছটফট করছে। মনটা। তার বোকা ছেলেটাকে কারা ঢিল মারে?
একটা রিক্সা এসে থেমে আছে সড়কে। এতক্ষণ লক্ষ করেনি গজপতি। একটা মোটা মতো লোক নেমে পয়সা দিচ্ছে এতক্ষণে। গজপতি চেয়ে রইল। লোকটা একটা বাক্স হাতে সোজা সামনে এসে বলল , বেশ বাজান তো মশাই। শুনতে ইচ্ছে করে।
গজপতি জ্যোৎস্নায় লোকটাকে ঠাহর করতে একদৃষ্টে চেয়েছিল।
লোকটা বলল , চিনবেন না। রাণীগঞ্জ থেকে আসছি চিঠি পেয়ে। আমার নামই যোগেন।
যেমন চমকাবার কথা তেমন চলকাল না গজপতি। বোধহয় যোগেন যে একদিন আসবেই তা বুঝতে পেরে মনটা ভিতরে-ভিতরে তৈরি ছিল। গজপতি ঠক করে উঠে পড়ে বলল , রাতে এখানেই খাবেন তো। ভাত চাপাই গে।
যোগেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , আর খাওয়া। তা চাপাবেন’খন। এই বুঝি বাড়ি? গজপতি বেশি কথায় গেল না। সত্যি বটে, যোগেনের চেহারাটা দত্যির মতো না হলেও দশাসই। তবে টপ করে গলা টিপে ধরার লোকও নয়। বয়স গজপতির কাছাকাছি, দু-চার বছর কম। লণ্ঠন নিয়ে ঘুরে-ঘুরে বাড়িটা দেখায় গজপতি।
ক’কাঠা জমি?
মোট তিন।
বেচলে কত পাওয়া যাবে?
হাজার দশ-পনেরো।
ধুস। তার সিকিভাগ আর কত হবে?
রাত্রে আলুর দম রাঁধল গজপতি। বেশ হল সেটা খেতে। যোগেন প্রথম দফা ভাত শেষ করে আরও দু-হাতা নিয়ে বলল , উনি ছিলেন আমার মা।
তেজোময়ী? গজপতি হাঁ।
সৎ মা। বাবার দ্বিতীয় পক্ষ।
তবে যে শুনি, তেজোময়ীর স্বামী অল্প বয়সে মারা যায়।
পঁয়ষটি আর বয়স কী? মরার বয়েস তো নয়।
তাহলে তেজোময়ীর সঙ্গে আপনার আত্মীয়তা তো বেশ ঘনিষ্ঠই বলতে হবে।
ঘনিষ্ঠ নয়? মা বলে কথা। বাপের বউ। এক মাস অশৌচ পা লোম কি এমনি–এমনি? না পেলে উপায় কী, বেঁচে থাকতে সম্পর্ক ছিল না মায়ের চরিত্রদোষের জন্য। তা বলে তো আর সমাজ ছাড়বে না। আপনারও শুনেছি বউ–বাচ্চা আছে।
গজপতি চুপ করে থাকে। যোগেন আর একবার আলুর দম চেয়ে নেয়। বলে, আমি অবশ্য মায়ের দোষ দেখি না। কাঁচা বয়সের বিধবা। অমন হতেই পারে। আপনি বাঁশিটাও বেশ ভালোই বাজান। গজপতি লজ্জা পায়। ভাত নাড়াচাড়া করে।
পরদিন সকালে যোগেনকে রডে বসিয়ে সাইকেল মেরে হাটে নিয়ে এল গজপতি।
এই সেই হাট, যার কথা বলছিলাম।
যোগেন খুব আলগোছে দেখছে। তেমন আগ্রহ প্রকাশ করছে না। শুধু বলল , নতুন। বসিয়েছেন বুঝি? চলছে কেমন?
খুব চলবে।
ভালো। চললেই হল।
এর নাম দিয়েছি তেজোময়ীর হাট, নামটা ভালো না?
মায়ের নামে হাট তার আর ভালোমন্দ কী।
হঠাৎ গজপতি যোগেনের হাতটা চেপে ধরে বলে, হাটটা যখন হয়েছে তখন থাক। তুলে দেবেন না। যোগেন তার ঘন জ তুলল, আমি কে? মোটে তো চার আনার হিস্যা।
রাণীগঞ্জে আপনি কী করেন?
অনেক কারবার ছিল মশাই। সব তুলে দিয়েছি। এখন একটু কয়লার বিজনেস টিমটিম করে চলেছে। লাখোপতি সব ঠিকাদার চারদিকে হাজার–হাজার টাকা ঘুস ফেলছে। আমি কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পাই।
তাহলে এসে এখানেই বরং জেঁকে বসুন।
আর আপনি?
আমার একটা কাজ আছে।
কী কাজ?
একটা ন্যালাখ্যাপা ছেলে আছে আমার। কাল খবর পেয়েছি ছেলেটার পেছনে নাকি গাঁয়ের ছেলেরা খুব লাগে। ঢিল–টিল মারে। সেই থেকে মনটা খুব বিগড়ে আছে। ন্যালাখ্যাপা ছেলেটাকে সবাই ঢিল মারবে কেন বলুন।
ঠিক কথাই তো।
তাই ভাবছি। গিয়ে ছেলেগুলোকে খুব কড়কে দেব।
