মঞ্জুর সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা পেতে। মঞ্জুও তোমাকে পাত্তা দিত না। কিন্তু সেই বয়সের টান কি সহজে ছাড়ে। ওদের বাড়ির আনাচকানাচ দিয়ে ঘুরতে, গুলতে পাখি মারবার চেষ্টা করতে, বড় গাছে উঠে যেতে। দেখানোর মতো এইসব বীরত্বই সম্বল ছিল তোমার।
তারপর একদিন নিজেদের বাগানে খেলতে-খেলতে মঞ্জু একদিন ফটকের কাছে ছুটে এসে ডাক দিল, রতু! এই রতু!
তুমি পালাচ্ছিলে ডাক শুনে। মঞ্জু ছাড়েনি তবু। ফটক খুলে পাথরকুচির রাস্তায় কচি পায়ের শব্দ তুলে দৌড়ে এসে হাত ধরল। বড়-বড় চোখে চেয়ে রইল মুখের দিকে, অবাক হয়ে।
এত ডাকছি, শুনতে পাওনি?
ডাকছিলে? ও, তাহলে শুনতে পাইনি।
ঠিক শুনেছ। দুষ্টু কোথাকার। ভারী ডাঁট তো তোমার।
তুমি কথা বলতেই পারোনি।
মঞ্জু হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল তোমাকে, ওদের বাগানে। পরির মতো মেয়েরা খেলছে ওদের বাগানে, গাছে চড়ছে, হাসছে, চেঁচাচ্ছে। চোরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলে তুমি।
মঞ্জু দৌড়ে একটা পেয়ারা এনে তোমার আড়ষ্ট হাতে গুঁজে দিয়ে বলল , খাও রতু।
খাবো?
তবে পেয়ারা দিয়ে কী করে লোকে? খায়ই তো!
কী যে সুগন্ধ মাখানো ছিল পেয়ারাটার গায়ে, আজও মনে আছে তোমার। হয়তো পাউডার বা স্নেয়ের গন্ধ, হয়তো তা মঞ্জুরই গন্ধ।
পেয়ারাটাকে কোন খাতে ধরবে মুখুজ্জে!
ইস্কুলে চোরের মার খেতে তুমি রোজ। মার খেতে খালাসিপট্টিতে, মেছোবাজারে, বাবুপাড়ায়। দুষ্টু ছিলে, দাঙ্গাবাজ ছিলে, তাই মার খেতে-খেতে বড় হলে। সবচেয়ে বেশি লেগেছিল একদিন। ইস্কুল থেকে ফেরার সময়ে খালাসিপট্টিতে একটা লোক হঠাৎ অকারণে কোথা থেকে সুমুখে এসে তোমার পথ আটকাল।
তুমি পাশ কাটাতে চেষ্টা করছিলে।
লোকটা হঠাৎ বলল ‘শুয়ারকা বাচ্চা’, তারপর বিনা কারণে তোমার কান ধরে গালে একটা চড় কষিয়ে দিল। সেই চড়টা আজও জমা আছে। কিছুতেই ভোলোনি। শোধ নেওয়া হয়নি। তুমি শোধ নিতে ভালোবাসো না কিন্তু আজও ভাবো, এই চড়টার শোধবোধ হওয়া দরকার। চড়টাকে কোন খাতে ধরবে মুখুজ্জে?
বড় একটা শ্বাস ফেললে। ফেল। তোমার অনেক নিশ্বাস জমা হয়ে আছে।
বেশ গুছিয়ে বসেছ। প্রথম যৌবনের ততটা টানাটানির সংসার আর নেই। দু-বেলা দুটো ভালোমন্দ খাও। ঘরে দু-চারটে দামি জিনিসপত্রও নেই কি? আর ছেলে, মেয়ে, বউ।
বউ সেই মঞ্জু নয়, বুলুও নয়। এ অন্য একজন, যাকে তুমি আজও চেনোনি।
বউ বলে, তুমি অপদার্থ, ভীতু। বদমাশ। কখনও বলে, তোমাকে ভালোবাসি।
এইসব কথাগুলো হিসেবে ফেলে দ্যাখো তো, কোনটা জমা, কোনটা খরচ।
পারছ না মুখুজ্জে, গুলিয়ে যাচ্ছে।
ওই যে একটা চিঠি এল তোমার নামে সেদিন। কী সুন্দর এক অচেনা মেয়ের চিঠি।
পড়ো মুখুজ্জে। লিখেছে : আপনার একটুখানি বেঁচে থাকা আমার কাছে অনেকখানি। প্রণাম করলাম।
কোন খাতে চিঠিটাকে ধরছ? জমা! হাসালে!
বড় জট পাকিয়ে যাচ্ছে হিসেব নিকেশ মুখুজ্জে। মেয়ে এসে গলা জড়িয়ে বলছে, বাবি, তোমাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। অবোলা ছোট্ট ছেলেটা তোমাকে দেখলেই দুহাত তুলে ঝাঁপিয়ে আসে।
এগুলো জমার খাতে ধরবে না!
সুখ আর দুঃখগুলোকে আলাদা করে-করে আঁটি বেঁধে রেখেছ, কিন্তু কোন খাতে যাবে তা ধরোনি। সব সুখই তো আর জমা নয়। সব দুঃখই যেমন নয় খরচ।
কাঁদছ মুখুজ্জে! কাঁদ। এই মধ্য বা শেষ যৌবনে একটু-আধটু কাঁদতেই হয় মানুষকে। হিসেবের সবে শুরু কি না।
জ্যোৎস্নায়
বিলেত থেকে মোট দেড়খানা চিঠি লিখতে পেরেছিল লেবু। আর সময় পায়নি। মদ সেখানে বেজায় সস্তা, আর ভারী ভালো। অফিসের সময়টুকু বাদ রেখে বাদবাকি সময় লেবু লন্ডনের নালায় নর্দমায় পড়ে থাকে, সাহেবরা বড় বিপদে আছে তাকে নিয়ে।
এ খবর জানিয়েছে ডাক্তারের ভাইঝি–জামাই নৃপেন, তার কাছেই থাকে লেবু। থাকে মানে ওই আর কি থাকার কথা, আসলে তো থাকে ফুটপাথেই।
চিঠি পেয়ে ভারী রেগে যায় ডাক্তার। রুগিভরা চেম্বার ছেড়েই উঠে আসে ভিতর বাড়িতে, দুই বউকে ডেকে হেঁকে বলে–এই দ্যাখো তোমাদের দেওরের কাণ্ডটা দ্যাখো। বলে নৃপেনের লেখা এয়ারোগ্রামখানা তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে আবার গোঁ–গোঁ করতে-করতে চেম্বারে গিয়ে ঢোকে।
দুই বউ আসলে দু-বোন। বড়টি সোনালি। বাঁজা। বিয়ের দশ বছর তক বাচ্চা না হওয়ায় স্বামীর পায়ে মাথা খুঁড়ে নিজের ছোট বোন রূপালিকে বিয়ে করিয়েছে। ভারী ভাব দুই বোনে, সতীনের কোঁদল নেই। রূপালি দুটো ছেলেমেয়ের মা। সোনালি বাচ্চাগুলো নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকে। রূপালি হুটোপাটা করে কাজ সারে, গান গায়, সিনেমায় যায়। বাচ্চাদের সঙ্গে তেমন সম্পর্কই নেই। তাতে সোনালিই বেশি খুশি। বাচ্চারা কথা বলতে শিখতেই সে তাদের নিজেকে মা আর রূপালিকে ছোট মা ডাকতে শিখিয়েছে।
এয়ারোগ্রামখানা দুই বোনে পড়ে। লেবু সোনালির চেয়ে বয়সে ছোট, রূপালির চেয়ে বড়। সোনালি দেওরের জন্য চিন্তায় পড়ে। রূপালি গালে হাতে দিয়ে বলে–ওমা! বিলাতেও নালা নর্দমা আছে! বলে সে গুনগুন করে গান গাইতে-গাইতে নিজের কাজে উঠে যায়।
পেটের রোগে ডাক্তারের খুব হাতযশ। একটা খয়েরি রঙের ক্কাথ মতো ওষুধ দেয়, তাতেই খিদে বেড়ে রোগীরা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অনেকের সন্দেহ ডাক্তারের ওষুধে আফিঙ মেশানো আছে। তা হোক, চেম্বার তবু খালি যায় না। ইচ্ছে করলে আরও দুটো বউ মেনটেন করতে পারে।
