এক-একদিন পলাশ বাড়িতে থাকে। সারাদিন অজস্র ছবি ডার্করুম থেকে বের করে বিছানার ওপর তাসের মতো সাজায়। কখনও দূর থেকে, কখনও কাছ থেকে দেখে। ছবি দেখায় এক সময়ে নিশ্চয়ই ক্লান্তি আসে পলাশের। তখন সে মাঝে-মাঝে পুবের জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে চেয়ে থাকে। মানু বুঝতে পারে, এই জানলাটা পলাশের প্রিয় নয়। এ জানলা দিয়ে যখন তাকিয়ে থাকে পলাশ, পুব আকাশের উজ্জ্বল আলোর আভা যখন তার মুখে এসে পড়ে, তখন তাকে ভারী নির্জীব দেখায়। হতাশা ফুটে ওঠে তার রুক্ষ মুখে। সে মাঝে-মাঝে মানুকে ডেকে বলে–এ জায়গাটা খুব কমার্শিয়াল হয়ে যাচ্ছে, দেখেছ! কত দোকানপাট উঠছে!
মানু বলে ভালোই তো।
–ভালো কেন?
–বাঃ। কলকাতার এত কাছে একটা জায়গা, চিরকাল কি তা গ্রাম হয়ে থাকতে পারে? কলকাতার প্রভাব আছেনা? আমার বাপু, দোকানপাট, আলো, মানুষজন ভালো লাগে।
পলাশ অন্যমনে জানালাটা দিয়ে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ আস্তে-আস্তে বলে–জায়গাটা মরে যাচ্ছে।
তারপর শ্বাস ফেলে আবার নিজের তোলা অজস্র ছবির মধ্যে হারিয়ে যায়।
এ কথা ঠিক যে পলাশের রোজগার অনেক কমে গেছে। যত তার ঘোরাঘুরি তত তার রোজগার নয়। বাড়িতে ছবি জমে পাহাড় হচ্ছে, তার ক’টাই বা বিক্রি হয়? তার ওপর আছে সরঞ্জামের খরচ। সব কিছুরই দাম বেড়ে যাচ্ছে। তবু সংসার চলে যায়। এক-এক সময়ে বেশ কিছু টাকা এনে ফেলে পলাশ, এক-এক সময়ে দিনের–পর–দিন টাকার ছবি দেখা যায় না। পলাশের চারটে দামী ক্যামেরায় অজস্র ছবি আসে, টাকা আসে না। সেজন্য পলাশের তাপ উত্তাপ নেই, মানুর আছে। কিন্তু মানু ঝগড়া করে না। পলাশকে সে কখনও ভয় পায়, কখনও বুঝতে পারে না, কখনও পলাশের ওপর রাগ করে গুম হয়ে থাকে।
যেদিন পলাশ বাড়িতে থাকে সেদিন প্রায় সময়েই দুপুরবেলা সে পশ্চিমের জানালাটা খুলে একটা চেয়ার টেনে বসে থাকে। দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যাস পলাশের নেই। কিন্তু তখন মানু ঘুমোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে কেবল এপাশ–ওপাশ করে। কারণ, পশ্চিমের জানালা দিয়ে আসে খাটালের বিশ্রী গন্ধ, উড়ে আসে মশা, পোকামাকড়, খড় কাটার শব্দ। কিন্তু তবু পশ্চিমের জানালাটা পলাশের প্রিয়। জানালার ওপর একটা মহানিমের ছায়া নিবিড় হয়ে থাকে। সেই ছায়ায় স্নিগ্ধ দেখায় পলাশের মুখ! তার মুখের রুক্ষ রেখাগুলি কোথায় মিলিয়ে যায়। দুই ঘুমহীন চোখে স্বপ্নেরা ভিড় করে আসে। চেয়ারটা পিছনে হেলিয়ে জানলার চৌকাঠে পা তুলে বসে পলাশ চেয়ে থাকে। তার মাথার ওপর দেওয়ালে সেই গোলকিপারের বিখ্যাত বাঁধানো ছবিটা দেখা। যায়। সামনে সাদা বলের দিকে হাত বাড়িয়ে এক ধোঁয়াটে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বয়স্ক গোলকিপার, তার মুখের ওপর দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা তীরের মতো নেমে আসছে, কপালের ওপর লেপটে আছে, তার মুখে গভীর হতাশা। পশ্চিমের মহানিমের শান্ত ছায়া পড়ে সেই গোলকিপারের মুখেও, বড় অদ্ভুত দেখায় তাকে। সে যেন একটি মুহূর্তের ভঙ্গির ভিতর দিয়ে তার সারা জীবনের গল্প নীরবে বলে যাচ্ছে। বড় কষ্ট হয় মানুর, সে গোলকিপারের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। পলাশের মুখ থেকেও। ঘুমঘোরে সে মনে আনতে চেষ্টা করে–সে ভেনাসের সুন্দর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ঠোঁট টিপে একা হাসে মানু। মনের বিষাদ উড়ে যায়।
আস্তে-আস্তে গড়িয়ে যায় শান্ত দুপুর। বিকেলে চায়ের সময় হয়ে আসে। মানু শ্লথ শরীরে আধোঘুম থেকে উঠে তখনও দেখে পলাশ পশ্চিমের জানলার কাছে চুপ করে বসে আছে। গাছগাছালির ভিতর দিয়ে রাঙা রোদ এসে পড়েছে তার রুক্ষ মুখে। মুখটা কোমল দেখাচ্ছে।
–কী দেখছ সারা দুপুর বসে-বসে? মানু জিগ্যেস করে।
পলাশ মুখ ফিরিয়ে হাসে। বলে–কী জানি! এদিকটা দেখতে আমার বেশ লাগে। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়।
যখন মানু চা এনে পলাশের হাতে দেয়, তখনও পলাশের ঘোর কাটেনি, স্তব্ধ হয়ে আছে। চা নিয়ে মানুর দিকে চেয়ে বলে–আমাদের গ্রামের বাড়িতে এইরকম একটা উঠোন ছিল। তার পশ্চিমে গোয়ালঘর, দক্ষিণে বেঁকিঘর, চেঁকিঘরের পিছনে পুকুর! আমরা এরকম বিকেলে উঠোনে খেলতে-খেলতে শুনতাম পেঁকিঘরে পাড় দেওয়ার শব্দ। উঠোনে খুব আলোছায়ার খেলা ছিল। পুকুরের আঁশটে গন্ধ ভরভর করত বাতাসে, গোবর–নিকোনো উঠোন থেকে সিঁদুর তুলে নেওয়া যেত! মানু, এই পশ্চিমের জানালাটা আমার অতীত, আমার নস্টালজিয়া। এই জানালা খুললেই আমি আমার দাদুকে দেখি–ওই দক্ষিণের ঘরের দাওয়ায় বসে তামাক টানতে-টানতে সুনীলকে বকছেন, বাবাকে দেখি–দুপুরে ছিপ ফেলে মাথায় গামছা দিয়ে পুকুরপাড়ে বসে আছেন, মাকে দেখি–স্নান সেরে ভেজা পায়ের ছাপ উঠোনে ফেলে ঘরে যাচ্ছেন, ঠোঁটে আদ্যার স্তব–ভেজা শাড়ি থেকে জলকণা ছড়িয়ে পড়ছে–কী ঠান্ডা গা ছিল মায়ের। পৃথিবীতে কত ছবি মুছে গেছে–সব ক্যামেরায় আসে না-কিছুতেই আসে না।
পশ্চিমের জানালার আলো মরে যায়। টিমটিমে টেমি জ্বলে ওঠে সূরযের খাটালে। তাতে মহানিমের ছায়ায় অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে জমে ওঠে। রাত্রির চোখ গড়িয়ে নামে। পুবের জানালায় তখন নিয়নের আলো দেখা যায়, জাতীয় সড়কের দোকানপাট ঝকমকিয়ে ওঠে, পেট্রোল–পাম্পের আলো জ্বলতে এবং নিভতে থাকে, আলো জ্বেলে দৌড়ে যায় লরি। পুবের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁতে ফিতে চেপে চুল বাঁধে মানু। দেখে দোকানপাট, প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রিক ট্রেন, লোকজন। তখন এক-এক সময়ে মানু মুখ ফিরিয়ে জিগ্যেস করে–আর, এ দিকটা দেখলে তোমার কিছু মনে হয় না?
