পলাশ আধো-অন্ধকারে মুখ ফেরায়। তার মুখে স্টেশন আর জাতীয় সড়কের আলোর আভা এসে পড়ে, দ্রুত তার মুখে আবছা আলোর আভা ফেলে দৌড়ে যায় লরি, পলাশ মাথা নেড়ে বলে–হয়, মনে হয় আমি ওই জগতের কেউ না। আমি বাইরের লোক।
–কেন এরকম মনে হয়?
–কী জানি!
মানু হাসে-আমি জানি। যা নড়েচড়ে, যা জীবন্ত, তার কিছুই তোমার ভালো লাগে না। তুমি ছবির রাজ্যে বাস করতে-করতে এখন আর যার গতি আছে এমন কিছু পছন্দ করো না।
পলাশ হাসে, বলে–বাঃ মানু, তুমি কী সুন্দর সাজিয়ে বললে! বাঃ!
তারপর অন্ধকার ঘরে বসে পলাশ আবার পশ্চিমের জানালা দিয়ে বাইরে গাঢ় অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকে।
রাস্তা। একটা বাস স্টপ। খুব ভিড়। একটা ডবল–ডেকার থেমে আছে। তার পাদানিতে মানুষজনের প্রচণ্ড জড়াজড়ি। উদ্যত হাত-পা বাড়িয়ে বাস স্টপের মানুষেরা সেই ভিড় ভেদ করার চেষ্টা করছে। তাদের মুখে উগ্রতা; ব্যগ্র, নিষ্ঠুর চেষ্টায় তাদের সকলের মুখই প্রায়। একরকম দেখাচ্ছে। এই দৃশ্যটা পটভূমি। সামনে রাস্তার ধারে বসে আছে উনিশ–কুড়ি বছরের। একটা ময়লা কাগজ–কুড়নি ছেলে। জরাজীর্ণ তার চেহারা। ক্ষুধার্ত মুখ। পাশে বস্তাটা নামিয়ে রেখে সে বসে দেখছে রাস্তার পিচের ওপর কারা যেন এঁটো খাবার অজস্র ফেলে গেছে। লুচির টুকরো, মাংসের হাড়, ভাতের স্তূপ। ছেলেটা উবু হয়ে বসে তার ব্যগ্র একখানা হাত বাড়িয়েছে সেই রাস্তার ওপরকার খাবারের দিকে। ছবিটা এই।
ডার্করুমে টোকা দিয়ে চা দিতে ঢুকে মানু দেখল, টেবিল–ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলো জ্বেলে পলাশ ছবিটা দেখছে। পলাশের ঘাড়ের ওপর দিয়ে মানুও দেখল। এরকম নগ্ন দৃশ্য মানু বাস্তবে কখনও দেখেনি। দেখতে-দেখতে তার বুক ব্যথিয়ে উঠল। চোখে জল এসে গেল।
সে প্রায় রুদ্ধগলায় বলল –ইস গো, কী অদ্ভুত ছবিটা!
পলাশ মুখ তুলল। তার মুখে স্পষ্ট হতাশা। হাত বাড়িয়ে চা নিল সে। দু-একটা চুমুক দিয়ে মাথা নাড়ল আপনমনে। বিড়বিড় করল। তারপর মানুর দিকে চেয়ে বলল –তবু এ ছবিতে সত্য দৃশ্যটা নেই।
–নেই কী গো! ছবিটা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। কান্না আসে।
পলাশ অনেকক্ষণ চুপ করে চা খেয়ে গেল। তারপর আবার মাথা নেড়ে বলল –নেই। ছবিটায় কী যেন নেই।
–কী নেই?
পলাশ আবার চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে-আস্তে বলে–যখন এই দৃশ্যটা আমি দেখেছিলাম তখন কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না এই দৃশ্যের মধ্যে কোন বিষয়টা সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। ওই ব্যগ্র অফিস–যাত্রীরা, না ওই ছেলেটা, না কি ওই রাস্তার ওপরকার খাবারের স্থূপটা–কোনটাকে ছবির মাঝখানে রাখব, কোনটা হবে বিষয়, আর কোনটাই বা পটভূমি! সময় হাতে নেই, কারণ, দৃশ্যটা ক্ষণস্থায়ী, ফটোগ্রাফারের জন্য কেউ কোনও দৃশ্য ধরে রাখে না। বেশিক্ষণ। তাই আমি দৌড়ে চারপাশে ঘুরছিলাম, বারবার ক্যামেরা তুলে দেখছিলাম ভিউ ফাইন্ডারে কোনটাকে সমচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট দেখায়। সবচেয়ে যেটা ভালো মনে হয় সেটা তুলে নিলাম। তারপরই বাসটা ছেড়ে দিল, দৃশ্যটা ভেঙে গেল। ছবিটা উঠলও সুন্দর। তবু মানু, ছবিটাতে কী যেন নেই।
–কী সেটা? মানু ব্যগ্র প্রশ্ন করে।
পলাশ চুপ করে কপালে এসে পড়া চুলে ঘুরলি পাকায় আঙুল দিয়ে। অস্থির বোধ করে। তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে আলো নিভিয়ে দেয়।
অন্ধকারে পলাশ হাত বাড়িয়ে মানুর হাত ধরে।
বলে–মানু চারিদিকে এই যে অন্ধকার, সেটা কেমন?
–ভীষণ।
–এই অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। অথচ আমরা টের পাচ্ছি যে আমি আছি তুমিও আছ।?
–আছি তো।
–এই অন্ধকারের কি ছবি হয়? সেই ছবিতে কি বোঝানো যায় যে, তার ভিতরে আমি এবং তুমি দুজনেই আছি?
মানু চুপ করে থাকে।
পলাশ আবার আলোটা জ্বেলে হতাশার হাসি হাসে হয় না। মানু, ওরকম ছবি হয় না। ছবিটার ওপর আলোটা নামিয়ে আনে পলাশ। বলে–এই ছবিতে একটা অন্ধকার রয়েছে। তার। মধ্যে আছে আরও কিছু। কিন্তু তা ছবিতে ধরা পড়েনি।
হাতের কাছেই পড়ে আছে একটা জাইস–ইকন। সেটা তুলে নিয়ে ঝাঁকায় পলাশ। তারপর সেটা অবহেলায় ফেলে দিয়ে বলে ক্যামেরার সাধ্য বড় কম। কেন কম মানু?
মানু চুপ করে থাকে।
পলাশ ধীরে-ধীরে অন্যমনস্ক হয়ে যায় আবার। আপনমনে বে–খেয়ালে বলে–আমার বুকে কত ছবি জমে আছে।
মাঝে-মাঝে হাওয়া দিলে দেওয়ালে গোলকিপারের ছবিটা দোল খায়। দুপুরের আধো ঘুমঘোরে মানু চেয়ে দেখে। বয়স্ক মানুষটা সাদা বলের দিকে হাত বাড়িয়ে ঝুঁকে আছে। মাঝখানে অনন্ত দূরত্ব। অবিরল বৃষ্টি ধারায় ভিজে যাচ্ছে সে, মুখে অফুরান হতাশা। ছবিতে ওই বৃষ্টি থেমে কোনদিন রোদ উঠবে না। অনন্ত দূরত্ব থেকে যাবে বলটির সঙ্গে বয়স্ক মানুষটার। ছবিটা দোল খায়। একটা গল্প বলতে থাকে।
সেখান থেকে ঝুপ করে মানুর চোখ নেমে আসে। পশ্চিমের খোলা জানালায় পা তুলে নিঃঝুম বসে আছে পলাশ। মহানিমের নিবিড় ছায়া তাকে ঘিরে আছে। পলাশের রুক্ষ মুখের রেখাগুলি মিলিয়ে গেছে। তার ঘুমহীন চোখে স্বপ্নের ভিড়।
মানু টের পায়, পলাশের শরীরের ভিতরকার অন্ধকারে অজস্র ছবির জন্ম হচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে আবার। তাই মহানিমের ছায়া কোলে করে ও বসে আছে অমন। কারণ, ও জানে, সব ছবিই পৃথিবীর আলোতে আসে না। পুবের জানলা দিয়ে দেখা যায় অগ্রসরমান পৃথিবীর ছবি, জাতীয় সড়ক, দোকানপাট, দৌড়ে যাওয়া লরি। পশ্চিমের জানালায় মহানিমের ছায়া। দেওয়ালে বয়স্ক গোলকিপারের ছবি। তার নীচেই পলাশ।
