পলাশ মানুর সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা করার সুযোগ পায় না! তার সময়টা এখন খারাপ যাচ্ছে। গতবছরও ছিল একটা বড় কাগজের প্রেস ফটোগ্রাফার, বেশ নাম করেছিল পলাশ। তার দু-একটা স্টিল ছবি প্রাইজও পায়। একটা ছবি ছিল এইরকম–খুব বৃষ্টির মধ্যে আবছা একটা গোলপোস্টের সমকোণ দেখা যাচ্ছে, পেছন দিকটা ওয়াশ-এর ছবির মতো ধোঁয়াটে, সেই ধোঁয়াটে রহস্যময় পটভূতিতে দাঁড়িয়ে বয়স্ক এক গোলকিপার, কালো পুরোহাতার জামা গায়ে, হাতে কালো দস্তানা, পায়ে হোস, বুট। সে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে, তার সামনে একটা সাদা বল পড়ে আছে। বলটার দিকে তার বাড়ানো হাত, আর মুখে সীমাহীন ক্লান্তি। এই ছবি। ছবিটায় কিছু নেই, কিন্তু তবু একটি মানুষের সারাজীবনের লড়াইয়ের গল্পটি যেন বলা আছে। পলাশের এই ছবি অনেকে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেছে একদিন। এইসব ছবি তুলেছিল পলাশ, আর তুলেছিল কিছু বিপজ্জনক ছবি। পুলিশের লাঠি–গুলির ছবি। নেতাদের অবসর মুহূর্তের ছবি। দুর্ঘটনার ছবি। ছবির চোখ ছিল বটে পলাশের। কাগজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ভালোই। কিন্তু অতিরিক্ত স্পর্শকাতর লোকেরা চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারে না। পলাশ গতবছর চাকরিটা ছেড়েছে। মানু তার স্বামী সম্বন্ধে যখন আশাবাদী হয়ে উঠেছিল ঠিক তখনই এই অঘটন। ভারী। হতাশ হয়ে মানু বলেছিল–
–চাকরিটা ছেড়ে দিলে? এখন কী হবে?
–চাকরিটা করা যাচ্ছে না মানু। আমি ছবি তুলি, সেই ছবিগুলো লোকে দেখুক আমি তাই চাই। কিন্তু ওরা ছাপছে না। ছবিগুলো ওদের পলিসির উলটোদিকে যাচ্ছে।
মানু সব কথা বোঝে না। সে কেবল বোঝে কিছু ছবি ছাপা হয়, কিছু হয় না। যেগুলো ছাপা হয় না সেগুলো হতে নেই বলেই হয় না, সব ছবি কি ছাপা হতে আছে? মা গো! পলাশ বিয়ের পর মানুর অনেক ছবি তুলেছিল, তার মধ্যে অনেকগুলো ছিল যাতে মানুর গায়ে একবিন্দু পোশাক নেই! কখনও বনদেবী, কখনও বা ভেনাস সাজিয়েছিল তাকে পলাশ। সে সব ছবি কি তারা দুজন। ছাড়া আর কারও দেখতে আছে? তবে!
পলাশ বড় একগুঁয়ে। সে বাড়িতে ফিরে তার ক্যামেরা খুলে ফিল্ম বের করে। বাথরুমের পাশের ছোট্ট ঘরটা ডার্করুম করেছে সে। সেইখানে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। তারপর একদিন ছবিগুলো বের করে এনে বিছানায় ওপর তাসের মতো বিছিয়ে দেয় সে। কখনও কাছ থেকে, কখনও দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলো দেখে। একা-একা কথা বলে তখন। সেইসব ছবি অনেক দেখেছে মানু। পলাশ মগ্ন হয়ে নিজের তোলা ছবি থেকে চোখ তুলে কখনও-কখনও অচেনা মানুষকে দেখার চোখে মানুকে দেখেছে। অন্যমনে বলেছে–দ্যাখো, দ্যাখো তো–এ সবই কি এই দেশের সত্য ছবি নয়?
হবেও বা, মানু অত জানে না, শেষ দিকে পলাশের ভোলা বেশির ভাগ ছবিই নাকচ হয়ে যাচ্ছিল। ছাপা হচ্ছিল না। কিন্তু তাতে কী? স্থায়ী চাকরির মাইনেটা পলাশ পেয়ে যাচ্ছিল ঠিকই। কোনও গোলমাল ছিল না সেখানে। কিন্তু চাকরির চেয়ে ছবির নেশা পলাশের অনেক বেশি।
–এই সবই এই দেশের সত্য ছবি। মানু, খবরের কাগজের জন্য শিল্প নয়। তার ছবি আলাদা। আমি থাকতে পারব না।
মানু চমকে বলেছে–তা কেন? চাকরি চাকরিই, তোমার ছবি তুমি তুলে বেড়াও না। কে দেখতে যাচ্ছে?
পলাশ মাথা নেড়েছে–আমি বুঝতে পারছি, চাকরি ছাড়লেই আমি এক বিশাল ছবির রাজ্যে চলে যেতে পারব। ছবি ছাড়া আমি যে আর কিছু বুঝি না।
মানু খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে, তাদের বাড়িতে কেউ কোনও শিল্পচর্চা করেনি। বাবা একসময়ে শৌখিন থিয়েটার করতেন, ছোটভাইটা তবলা ঠোকে। বাস, এর বেশি কিছু না! পলাশের মতো মানুষ মানু, তাই আর দেখেনি। ফলে, সে পলাশের দুঃখটুঃখগুলো সঠিক বুঝতে পারে না কোনওদিনই, কখনও বা পলাশকে তার ভয় হয়, কখনও বা পলাশের ওপর খুব রাগ হয় তার।
পলাশ তাকে এই বলে ভোলাত–দেখো মানু, আমি ফ্রিল্যান্সে অনেক বেশি রোজগার করব।
মানু তাতে ভোলেনি, কিন্তু পলাশ গতবছর চাকরিটা ছেড়েছিল ঠিকই। বড় দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ পলাশ। তাদের এখন দু-দুটো বাচ্চা। বড়টা ছেলে, তার নাম চিত্রার্পিত–পলাশেরই রাখা। নাম। চিত্রার্পিতের ছয় বছর বয়স চলছে। ছোটটি মেয়ে নাম সোনারেখা–তার বয়স তিন। এই বাড়ন্ত ছেলেমেয়ের বাবা কোন আক্কেলে যে চাকরি ছাড়ে।
এখন আর পলাশের সময় নেই! কোন সকালে ক্যামেরা ঘাড়ে করে বেরোয়, রোদে–রোদে ঘোরে সারাদিন। তার মুখ হয়ে যাচ্ছে রুক্ষ, গায়ে লাবণ্য কমে যাচ্ছে। গায়ে প্রায়দিনই ময়লা পোশাক থাকে, গালে দাড়ি বেড়ে যায়, সানগ্লাস পরে থাকে বলে ওর চোখের চারপাশে একটা সাদা ভাব। ভারী ক্লান্ত হয়ে রাতে ফেরে পলাশ। কারও দিকে তাকায় না। জামাকাপড় ছেড়ে একটা কালো অ্যাপ্রন পরে ডার্করুমে ঢুকে যায়। লাল আলো জ্বেলে ক্যামেরা আনলোড করে, সেখানে বসেই এককাপ চা খায়, তারপর আলো নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘণ্টার–পর–ঘণ্টা কেটে যায় তার ডার্করুমে। মানুর সঙ্গে তার মেলামেশা নেই–ই প্রায়, চিত্র আর সোনাও ক্রমেই বাপকে ভুলে যাচ্ছে। কখনও ভুলেও তাদের কাছে ডাকে না পলাশ, আদর করে না। মানু মাঝে মাঝে বলে–তুমি কি আমার পেয়িং গেস্ট?
পলাশ কথাটার অর্থ না বুঝে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর কোনওদিন বা হাসে, কোনওদিন নিজের মধ্যে ডুবে থাকে।
