বিষণ্ণ হিরণ বসে দেখল গোলদিঘির দক্ষিণ কোণটা লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। কিছু একটা হয়েছে ওখানে। কী হতে পারে! ভিড় দেখলে সাধারণত উৎসাহী হয় হিরণ–ভিড়ের কারণ খুঁজে দেখে। কিন্তু আজ তার উঠতে ইচ্ছে করল না, কাউকে কিছু জিগ্যেস করল না হিরণ। চুপচাপ বসে রইল খানিকক্ষণ। তারপর উঠে পড়ল। ধীরে-ধীরে সে ভিড়ের কাছেই এসে দাঁড়ায়। কথাবার্তা না বলেও সে বুঝতে পারে কে একজন জলে পড়েছে–এখন তাকে তোলা হচ্ছে।
জলের মধ্যে কয়েকজন মানুষকে দেখতে পেল হিরণ, জলের ধারে একজন ‘বিট’-এর পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ক্রমশ হিরণ দেখল জল থেকে কয়েকটা হাত একটা দেহকে ধরে তুলল। পুলিশটার পায়ের কাছেই শুইয়ে দিল তাকে। ভিড় ক্রমশ বাড়ছে, হিরণের দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েও আবার ফিরে এল হিরণ। লোকটা চেনাও তো হতে পারে–কত লোককেই তো চেনে হিরণ–এই ভেবে সে ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে লাগল। রেলিঙের কাছে সে যখন এসে পৌঁছোল তখন লোকটাকে একটা স্ট্রেচারে শুইয়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু যতদূর মনে। হল লোকটা মারা গেছে কাছাকাছি যারা ছিল তারা হতাশার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছিল।
বাহকেরা হিরণের চোখের তলা দিয়ে স্ট্রেচারটা ধীরে-ধীরে নিয়ে গেলে প্রথমটায় একবার চমকে উঠেই কাঠ হয়ে গেল হিরণ। চারুলালের চোখ খোলা ছিল না, তবু হিরণের মনে হল চারুলাল তাকে সারাক্ষণ দেখতে-দেখতে গেল। এত কাছাকাছি ছিল চারুল! কিন্তু মুহূর্তেই পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে সচেতন হিরণ বুঝতে পারল এখন কোনও শব্দ করলে তার মুশকিল হবে। সে সাক্ষী থাকতে চায় না। নিঃশব্দে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল হিরণ। পুলিশ চারুলালের পরিচয় ঠিক খুঁজে বের করবে। আপাতত হিরণের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল স্থির নিশ্চিতভাবে সে জেনে গেল যে, চারুলাল আত্মহত্যাই করেছে।
‘কিন্তু এটা কেমন হল!’ ‘এটা কী হল হে চারুলাল’, মনে-মনে বলল হিরণ, ‘এমন তো কথা ছিল না হে!’ হিরণ গম্ভীরভাবে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আজ বিকেলে চারুলালকে দেখবার পর থেকে যেসব অকারণ চিন্তা হিরণকে পেয়ে বসেছিল, এখন হিরণ টের পেল এর কোনও অর্থ আছে। এই আত্মহত্যা নিশ্চিন্ত অকারণ-এর কোনও মানে নেই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ এতদিনের মধ্যে কোনও দুর্ঘটনায় পড়েনি হিরণ–তার হাত পা অটুট আছে, ইন্দ্রিয়গুলি সতেজ ও কর্মক্ষম আছে। এইজন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। সে শিল্পের কারণ ও আত্মহত্যার প্রয়োজন ও উপযোগ বোঝে না বলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।
সম্ভবত এতটুকুই আসবার কথা ছিল চারুলালের, এর বেশি নয়। হাত পা ইন্দ্রিয়গুলির মতো মৃত্যুও সহজাত–হিরণের একথা অজানা নয়। বেঁচে থাকলে চারুলেরও মৃত্যু হত। সুতরাং চারুলাল নামক যে ব্যক্তিকে সে চিনত তার জন্য দুঃখ ছিল না হিরণের। তার পরিতাপ ছিল চারুলালের পরিকল্পনাহীনতা ও উদ্দেশ্যহীনতা লক্ষ করে। নিয়তিকে কে ঠেকাতে পারে? কিন্তু চারুলাল’, হিরণের ঠোঁট নড়ছিল, ‘এ উচিত নয়। এ আইন ভঙ্গ করা।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই আইনভঙ্গের কোনও আসামি নেই।
বিষণ্ণ হিরণ পথে–পথে খানিকটা ঘুরল। ট্রামে উঠল, ট্রাম থেকে নেমে পড়ল হঠাৎ, সিগারেট ধরিয়েই ফেলে দিল। তার চোখের ওপর দিয়ে ভেসে গেল নিওনের সাইন–বিনাকার বাচ্চা মেয়েটা হাসছে…লিপটনের কেটলি থেকে পতনশীল আলো…লুফৎহানসার উড়ন্ত অ্যাবস্ট্রাক্ট হাঁসের চিহ্ন…হ্যান্ডলুম ফ্যাব্রিকস…ক্রয় করুন, ক্রয় করুন…সেল সেল। হিরণ ভেবে দেখল…আলো ও অন্ধকারময় এই যা আছে, পাপপূণ্যময়, ধর্মাধর্মময় এই যা আছে, সবকিছুকেই বড় গোপনে ও নিঃশব্দে অবহেলা করে চারুলাল। এইখানেই কি তার জিৎ? না কি এখানেও নয়! আরও দূর বহুদূর কোনও জায়গায় চারুলাল জিৎ রেখে গেছে, যেখানে অন্য কেউ কখনও নাগাল পাবে না! সেইখানে যা যা চেয়েছিল চারুলাল সবকিছু দু হাত ভরে পেয়েছিল। আর প্রয়োজন ছিল না বলেই কি চারুলাল অবশেষে সাঁতার না শেখার প্রয়োজন হিরণকে–একমাত্র হিরণকেই বুঝিয়ে দিয়ে গেল!
আরও খানিকক্ষণ পরিকল্পনাহীন ও উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরল হিরণ। একটু রাত করে বাড়ি ফিরল এবং খুব তাড়াতাড়ি ঢাকা দেওয়া খাবারের সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। তড়িৎগতিতে অন্ধকার তাকে কামড়ে ধরল। বুঝতে পারছিল আজ রাতে তাকে অনিদ্রা রোগ আক্রমণ করবে। মশারির সাদা আবছা চালের দিকে চেয়ে হিরণের হঠাৎ মনে পড়ল অনেকদিন আগে হিরণ একটা লোককে চিনত–তার ছিল যক্ষ্মারোগ। কিন্তু সে কখনও রুগির মতো থাকেনি কয়েকবার বিভিন্ন জায়গায় হাসপাতাল থেকে সে পালিয়ে এসেছিল। রোগগ্রস্ত সেই লোকটাকে হিরণ কখনও সাহায্য করেছে কিন্তু খুশিমনে নয়। হিরণ জানত এই সাহায্য নানা লোকের কাছ থেকে পাওয়া যায় বলেই লোকটা বারবার হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসে-নিরাময়কে বড় ভয় ছিল সেই লোকটার, কেননা, দীর্ঘকাল ধরে রোগে ভুগে–ভুগে সে সেই রোগটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল যেমন আমরা আমাদের হাত পা নাক মুখ চোখ বিশ্বাস আত্মপ্রবঞ্চনা ও বৃথাগবগুলিকে, মেধা ও বোধগুলিকে ভালোবাসি। এর থেকে প্রতিসারিত কোনও অস্তিত্বের কথা আমরা কখনও ভেবে দেখিনি। শেষবার হিরণ লোকটাকে দেখেছিল লিন্ডসে স্ট্রিটের মুখে দাঁড়িয়ে একটা চোরাই ঘড়ি সম্ভাব্য খদ্দেরকে গছাবার তালে আছে। বিরক্ত হিরণ তাকে পাকড়াও করে প্রশ্ন করেছিল ‘এ সব কী? আপনি এখানে এভাবে কেন?’ লোকটা অনেকক্ষণ হিরণের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলেছিল তার রোগটা জটিল, এমন রোগ সহজে হয় না, সহজে সারেও না, এবং মৃত্যু অনিশ্চিত। হিরণ নিজের ধর্মবোধ ও পরোপকার প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হয়ে লোকটাকে প্রায় কোণঠাসা করে এনেছিল। লোকটা অবশেষে দৃঢ়ভাবে হিরণকে বলে দিল, ‘মশাই, যদি আমার ঘড়িটা কিনতে হয় তো কিনুন, নইলে নিজের পথে যান। আমি আত্মহত্যা করছি না-কেউই কখনও তা করতে পারে না।’
