গোলদিঘির ভিড় তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে, হিরণ লক্ষ করল। সে বুঝল ফাঁকা কোনও বেঞ্চ পাওয়া অসম্ভব। সে আস্তে-আস্তে লক্ষ রেখে এগোতে লাগল এবং ভাগ্যক্রমে একটা বেঞ্চে। দুজন বুড়োমানুষ এবং তাঁদের পাশে একটা খালি জায়গা দেখে অবিলম্বে ঝপ করে বসে পড়ল হিরণ। নানা অনভ্যস্ত শিল্পচিন্তায় তার মাথা ঘুরছিল। টের পেল পাশের দুই বুড়োমানুষ তার। বসার ভঙ্গি ও ঘাড় হেলিয়ে দেওয়ার ঢঙ লক্ষ করছে। বুড়োমানুষদের সঙ্গী হিসেবে ভালো লাগে হিরণের। এঁরা অচেনা লোক পাশে এসে বসলে অসন্তুষ্ট হলেও উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন না। অন্য সময় হলে হিরণ এঁদের সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করত। আজ করল না, কারণ তার মন অস্থির ছিল, ঠান্ডা বাতাস তার চোখে মুখে লাগছিল, ঘুম পাচ্ছিল হিরণের। সে চোখ বুজল। এবং প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সে নানা এলোমেলো স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।
আধোঘুমের ভিতর সে শুনতে পেল পাশের বুড়োমানুষ দুজন অবিশ্রাম একঘেয়ে গলায় পূর্ববঙ্গের গল্প করে যাচ্ছে। সেখানে রোদ ছিল আলাদা বর্ষা ও মেঘ ছিল আলাদা, ঋতুগুলি ছিল ভিন্নরকম। তরমুজের খেত ও কাশবনকশাড়ের জঙ্গল, বালুচর ও ব্রতকথার সেই দেশ ছিল। কেমন সেই দেশ–উনিশশো চৌষট্টির সেপ্টেম্বরের কলকাতা থেকে আধোঘুমের ভিতরে সেই দেশকে বিদেশ বলে মনে হয়। খাঁড়ি দিয়ে বিলের জল বর্ষাশেষে নেমে যেতে থাকলে কাকামশাই চাঁদা মাছ ধরতেন, খাঁড়ির জলে ধারালো ইস্পাতের মতো ঝলসে উঠত রূপালি ইলিশ। যেন শরৎকাল ঘন হয়ে এসেছে, পাল খাটানো হয়েছে–দুলে–দুলে নৌকো চলেছে পূর্ববাংলার দিকে, স্মৃতি ও বিস্মৃতিময় দুটি নৌকো পাশাপাশি অনায়াস পাল তুলে উনিশশো চৌষট্টির কলকাতা ছেড়ে গেল। হিরণ রূপকথার মতো সেই গল্প শুনছিল।
তারপর ঘাড় কাত করে হিরণ অনেকক্ষণ আধোঘুমের ভিতরে স্বপ্ন দেখল। মাটির উনুনের আঁচে ইলিশ মাছের ঝোল ফুটছে, রূপশালির ভাত ফুটছে, ফুটফুট। কাঠের উনুনের ধোঁয়ার গন্ধ…আর দেখল উজান বিল, রাজহাঁস, কালকাসুরে ঝোঁপ ও জোনাকি পোকা। দেখল চারুলালের স্বপ্নের শকুন হাওড়ার ব্রিজ ছেড়ে গেল বুড়িগঙ্গা বিশালাক্ষীর ওপর কশাড়বন ও কাশফুলের ওপর তার ছায়া বিস্তার করবে বলে। স্বপ্নের নৌকো ধীরে-ধীরে দুলতে থাকে।…হঠাৎ হিরণ চারুলালকে দেখছিল ইউনিভার্সিটির নতুন অন্ধকার উঁচু বাড়িটার ভিতর ঢুকে যাচ্ছে–তড়িৎগতিতে অন্ধকার লিফট চালু করল চারুলাল–সশব্দ ইলেকট্রিকের তার চারুলালকে টেনে নিতে থাকে, হিরণ প্রাণপণে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে, চিৎকার করতে থাকে ‘চারু চারু’ বলে। স্তুপাকৃতি সিমেন্ট, কংক্রিটের থাম ও সিঁড়ি পেরিয়ে এই অকারণ আত্মহত্যাকে নিবারণ করতে চায় সে। কিন্তু দ্রুত ধাবমান ‘এলিভেটর’ চারুলালকে শকুনের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে। হিরণ দু-হাত তুলে বলতে থাকে, ‘তোমার উদ্দেশ্য কি চারুলাল? তুমি কত দূর যেতে চাও?’ ধাবমান ‘এলিভেটর’ থেকে চারুলালের দূর গলার ধীর আবৃত্তি কানে আসে, ‘কতবার গিয়েছি যে হিরণ…স্বপ্নে…শূন্যোদ্যানে…ব্যাবিলনে।’ হিরণ অন্ধকারে বিম–কাঠের ঠেকা, কার্নিস, জ্যামিতিক সিঁড়ি ও লিফটের খাঁচার অরণ্যকে লক্ষ করে হাল ছেড়ে দেয় হঠাৎ।
কিমিদং এর অর্থ কী! হিরণ বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে ঘুম ভেঙে চেয়ে দেখল বেঞ্চটা খালি হয়ে গেছে। সন্ধ্যা রাত্রির দিকে গড়িয়ে গেল। গোলদিঘির দক্ষিণ কোণে ভিড় জমেছে খুব। কিছু একটা হয়েছে ওখানে। হিরণ ভালোভাবে জেগে উঠে এইসব স্বপ্ন কিংবা স্বপ্ন ও চিন্তার সংমিশ্রণ পরিষ্কার করে নিতে চেষ্টা করল। কেন না সে তার জীবনে কখনও শিল্পের জন্য আত্মহত্যার কথা ভাবেনি, স্বপ্নের শকুনের কথাও না। উদ্ভটের প্রতি কোনও মোহ ছিল না। হিরণের, তবু কেন উদ্ভটই আজ তাড়া করে ফিরছে! তার ব্যাবিলন ছিল না, মধ্যাহ্নের ভূতের মতো জাগর–স্বপ্ন ছিল না-তবু মনে হচ্ছে আজ চারুলালের ব্যবিলন পিছু নিয়েছে তার। এ কি চারুলালের সম্মোহন প্রভাব সে অনেকক্ষণ চারুলালের কথা ভেবেছে আজ সেই জন্যে?
গোলদীঘির দক্ষিণ কোণে গোলমালটা বেড়ে চলেছে। হিরণ দেখে অনেক লোক ছুটে যাচ্ছে ওদিকে। দারুণ ভিড়। কী হতে পারে! হিরণ ভাবল। পরমুহূর্তেই অকারণে অন্যমনস্ক হয়ে গেল হিরণ। আলস্যের সঙ্গে সে ভেবে দেখল চারুলালের সঙ্গে তার তফাতটা কোথায়। দারুণ অভাব। আছে চারুলালের সংসারে। চাকরিও খোঁজে চারুলাল–কিন্তু তেমন উৎসাহের সঙ্গে নয়। টিউশনি করে সে নিজের খরচ চালায়, গাঁটের ট্রামভাড়া খরচ করে নানা পত্রিকার অফিসে কবিতা ফিরি করে বেড়ায়, সংসারে কিছু দেয় চারুলাল–কিন্তু সে তেমন কিছু না। আর হিরণ বারো বছর বয়সে কলকাতার রাস্তায় একদিন ধূপকাঠি ফিরি করে বেড়াত, ওইভাবে কলকাতা চেনা হয়। প্রথম উনিশশো সাতচল্লিশ থেকে। ক্রমশ চিনতে পেরেছে সে পথঘাট ও চরিত্র। হিরণ এখন সংসার চালায়–সংসারের তরুণ অভিভাবক সে-তাকে আয়কর দিতে হয় এখন, লোককে ধারও দিতে পারে হিরণ। পথঘাট ও চরিত্র হিরণের চেনা হয়ে গেছে। তবে কেন খামোকা চারুলালের ব্যাবিলন তার পিছু নেয়, কেন স্বপ্নের শকুনের কথা ভাবতে গেল হিরণ? ‘দ্যাখো হে। চারুলাল’, হিরণ মনে-মনে বলল , ‘আমাকে আয়কর দিতে হয়। বেশিরভাগ অফিসবাড়ি, কারবারি ও দোকানদারদের আমার জানা হয়ে গেছে। আমি যতদূর বুঝতে পারি বুলডোজারের মুখে তৈরি হচ্ছে পৃথিবী–সাদামাটা আমার চিন্তা। কিন্তু তুমি একি তৈরি করছ চারুলাল–যা আমাকেও তাড়া করে দেখছি!’
