এই জটিল কথাটা এতকাল হিরণ বুঝতে পারেনি। আজ হিরণ সেই লোকটার মুখ মন করতে পারে না। কিন্তু এতদিনে সে যেন সেই রোগটার অর্থ ধরতে পারছে। যদিও জটিল রোগ দুরারোগ্য–কিয়দংশে পরিকল্পিত ক্ষয় ও স্বপ্নের দ্বারা গঠিত, তবু হিরণ এর অর্থ বুঝতে পারে।
এখন মর্গে চারুলালের মৃতদেহের ওপর তার শিল্পচিন্তাগুলি মাছির মতো এসে বসেছে। তার মেদ–মজ্জা শুষে নিচ্ছে। দুরারোগ্য সেই ব্যাধি–বড় সংক্রামক। ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ ভয়াবহ চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে হিরণের। তার মনে হয় এক অচেনা কিন্তু সুসংবদ্ধ কার্যকারণ সূত্রে চারুলালের আত্মহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এ আইনসম্মত এবং এ কারও অনুমতিসাপেক্ষ নয়।
চারুলালের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগহীন ও সম্পর্কশূন্য অনুভব করে সে একবার ভাবল–এ অন্যায়। পরমুহূর্তেই ভেবে দেখল–কিন্তু হায়, চারুলালের এই মৃত্যু ধর্ম ও অধর্মে গঠিত এক ধাঁধার মতো–যার সমাধান কখনও সম্ভব নয়।
চারুলালের কাছে পাঁচটা টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু আজ রাত্রে হিরণ সেই পাঁচটা টাকার যাবতীয় স্বত্ব ও দাবিদাওয়া ছেড়ে দিল।
হিরণ অনুভব করে এবার সে আস্তে-আস্তে কিংবা এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়বে।
চিঠি
ভূতটাকে আমি দেখেছিলাম পুরোনো পোস্ট–অফিসের বাড়িতে। সেই থেকে ভূতের গল্পটা সবাইকে বলে আসছি, কেউ-কেউ বিশ্বাস করছে, কেউ কেউ করছে না।
নদীর একটা দিক ভাঙতে ভাঙতে শহরের উত্তর দিকটা অনেকখানি গিলে ফেলল। পুরোনো পোস্ট–অফিসের বাড়িটা থেকে যখন আর মাত্র বিশ গজ দূরে জল, তখনই প্রমাদ বুঝে সরকার। তরফ অফিসটা শহরের মাঝখানে তুলে আনেন। পুরোনো বাড়িটা নদীগর্ভে যাওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়ে একা পোড়োবাড়ির মতো দাঁড়িয়ে রইল, তার বিশ গজ দূর নদীর পাড় আরও খানিক ভাঙল। আরও খানিক। আরও খানিক। ভাঙতে–ভাঙতে একদিন সেই জল এসে বাড়ির ভিত ছুঁয়ে ফেলল। তলা থেকে ধুয়ে নিয়ে গেল মাটি। কিন্তু সে সময়ে বর্ষার পর জলে মন্দা লেগে যাওয়ায় সে বছরের মতো পুরোনো পোস্ট–অফিসের বাড়িটা বেঁচে যায়। কেবল নদীর দিকটায় ভিতের জোর কমে যাওয়ায় একটু কাৎ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বারান্দার দুটো মোটা থাম ভেঙে ছাদের একটা অংশ নেমে এসে আড়াল দিল। নৌকো বেয়ে নদী দিয়ে যেতে-যেতে চেয়ে দেখলে মনে হত, ঠিক যেন নতুন বউ ঘোমটা দিয়েছে লজ্জায়, যেমন নতুন বউরা ঘাটে এসে নৌকো দেখলে দেয়।
ওই ভাবেই রয়ে গেল বাড়িটা, কেউ সে বাড়ির দখল নেয়নি। কেবল তার জানালা দরজাগুলো গরিব–গুর্বোরা খুলে নিয়ে গেল, কিছু আলগা হঁট নিয়ে গেল লোকজন। কিন্তু পিসার হেলান স্তম্ভের মতো সেই হেলা–বাড়িতে কেবল নদীর বাতাস বইত দীর্ঘশ্বাসের মতো, আর ছিল বাদুড়, ইঁদুর, চামচিকে, সাপখোপ আর উদ্ভিদ। গাছের জান বড়ো সাংঘাতিক, তারা ভিত ফাটিয়ে গজায়, দেওয়ালে শেকড় দিয়ে গর্ত খুঁড়ে ফেলে। তা এরাই সব ছিল, আর কেউ নয়।
তখন আমি ছোট, বছর সাত আটেক বয়স হবে। সে বয়সটার ধর্মই এই যে পৃথিবীর সব কিছু হাঁ করে দেখি, সব কথা হাঁ করে শুনি। কিছু বোকাসোকাও ছিলাম। বড়রা কেউ সঙ্গে না থাকলে যেখানে সেখানে যাওয়া বারণ ছিল, যাওয়ার সাহসও ছিল না।
তখন দাদু বিকেলবেলায় প্রতিদিন একহাতে আমার হাত অন্য হাতে লাঠি নিয়ে বেড়াতে বেরোত। সবদিন একদিকে বেড়ানো হত না। তবে প্রায়দিনই আমরা নদীর পাড়ে যেতাম। নদী শহরের ভিতর ঢুকে এসেছে, কাজেই বেশি দূর যেতে হয় না। একটু হাঁটলেই নদী। শহর বাঁচানোর জন্য বাঁধের ব্যবস্থা হয়েছে। চাঁই চাঁই পাথর, মাটি সব ফেলা হচ্ছে। শীতকাল তখন, বিশাল, বিস্তীর্ণ চর ফেলে নদী আবার অনেকটা উত্তরে সরে গেছে। সে চরের মাটি চন্দনের মতো নরম, তার উর্বরতা খুব। সেই মাটিতে বিষয়ী বিচক্ষণ লোক চাষ দিয়েছে, জমির কোনও দাবিদার নেই। যে চষে তার। চমৎকার গাঢ় সবুজ সব ফসলের সতেজ চেহারা নদীর মারকুটে ভয়ংকরতাকে ঢাকা দিয়েছে, সেই ফসলের জল যোগান দিয়ে তিতিরে নদীটা বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণ তিন চারটে ধারায়।
আমি আর দাদু সেই নদীর পাড়ে দাঁড়াতাম, দাদু লাঠিটা তুলে দূরের দিকে দেখাতেন। বলতেন–ওই যে কাকতাড়ুয়া কেলেহাঁড়ি দেখছ ওইখানে ছিল একটা বহু পুরোনো ডুমুর গাছ। ওর তলায় পঞ্চাশ ষাট বছর আগেও রাম পণ্ডিতের পাঠশালা ছিল। আর ওই যে ডালের খেতে একটা খোড়ো ঘর, ও ছিল ডাকাতে কালীবাড়ি। এখন দেখে বোঝাই যায় না, ওই নদীর ওপর দিয়ে একটা সুরকি বাঁধানো সড়ক গিয়েছিল জমিদার বাড়ি তক।
শহরের অনেকটা অঞ্চল হারিয়ে গেছে। সেই অংশটুকুতে ছিল বসত, ইস্কুল, মন্দির, রাস্তা। সেইটুকুই সব নয়, তার সঙ্গে অনেকের বাল্য ও কৈশোরের নানা স্মৃতিচিহ্ন। কত পুরোনো গাছ, পাথর ঘাট–আঘাটা।
দাদু নদীর ধারে এলে কিছুক্ষণ আমাকে উপলক্ষ্য করে সেই সব পুরোনো স্মৃতির চিহ্নগুলোর স্থান নির্দেশ করার চেষ্টা করতেন। তারপর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতেন। নতুন ঘাট তৈরি হয়েছে, সেখানে নৌকো বাঁধা। দাদু কখনও সেই ঘাটের কাছে গিয়ে ঝিম হয়ে বসে থাকতেন। তাঁর একদিকে লাঠি, অন্য ধারে আমি।
বাঁ-ধারে, অনেকটা দূরে পুরোনো পোস্ট–অফিসের রহস্যময় হেলা বাড়ি দেখা যেত। জানলা দরজার প্রকাণ্ড হাঁ–গুলো শোকার্ত চোখের মতো চেয়ে আছে সজীব পৃথিবীর দিকে। ভিতরে অন্ধকার ঘুটঘুট্টি। সামনের বর্ষায় যদি বাঁধ ভাঙে তো আর পৃথিবীর মেয়াদ শেষ হবে। বাঁধ না ভাঙলেও হেলাবাড়ি নিশ্চয়ই ওইভাবে রেখে দেবে না লোকে। ভেঙে ফেলবে। মুমূর্ষ বাড়িটা এই সত্যটা বুঝতে পেরেছিল। সে তাই অজানা মানুষের কাছে তার মৃত্যুর সংবাদ পাঠাত ওইসব অন্ধকার চোখের ভাষায়।
