রাস্তা পার হয়ে হিরণ হতাশ হল। কেননা হিরণ কয়েক মুহূর্তের চিন্তায় ঠিক করে নিয়েছিল সে চারুলালকে পেলে জিগ্যেস করে বাঙলা অভিধানে ‘চাইরু’ বলে কোনও শব্দ পাওয়া যায় কি না এবং পাওয়া গেলে তার অর্থ কী। কেননা শব্দ সঞ্চয় করা চারুলালের স্বভাব এবং এইসব নিয়ে আলোচনা করাও তার প্রিয়। হিরণ ঠিক করেছিল শব্দ নিয়ে আলোচনা ক্রমশ জমে উঠলে সে একসময়ে আকস্মিকভাবে হঠাৎ মনে পড়ার মতো করে পাওনা টাকাটার কথাও বলে ফেলতে পারবে। কিন্তু আপাতত চারুলালকে একটা সমস্যার মতো মনে হচ্ছে।
হিরণ কফিহাউসের মোড় থেকে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ের লাল ডাকবাক্সটা পর্যন্ত এবং লাল ডাকবাক্সটা থেকে কফিহাউসের মোড় পর্যন্ত জঙ্গল ভেদ করে চারুলালকে বারকয়েক খুঁজে দেখল। অবশেষে হতাশ হয়ে আবার ট্রাম স্টপেজে দাঁড়াল হিরণ।
মানুষের চলাফেরার মধ্যে একটা অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলে হিরণ খুশি হয়। এমন মানুষকে ধরা ছোঁয়া বোঝা সহজ। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন কোনও মানুষের সারাদিনকার চলাফেরার একটা ম্যাপ যদি আঁকা হয় তা হলে দুই রকম মানুষের উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যহীনতার একটা বাস্তব তফাত পাওয়া যেতে পারে। মনে-মনে চারুলালের সম্ভাব্য গতিবিধির একটা ম্যাপ ছকে ফেলবার চেষ্টা করে দেখল হিরণ। কিন্তু ম্যাপটা ক্রমশ তার মনে নানাবিধ বক্র ও অর্ধবৃত্তাকার রেখায় এমন জটিল অ্যাবস্ট্রাক্ট রূপ ধারণ করল যে, সে ভয় পেয়ে হাল ছেড়ে দিল, সহজ অন্য কিছু ভেবে দেখবার চেষ্টা করতে লাগল। এ কথা ঠিক যে, চারুলাল কিংবা চারুলালের মতো মানুষগুলিকে হিরণ বোঝে না। তবে চারুলাল কিংবা চারুলালের মতো মানুষগুলি কী উদ্দেশ্য নিয়ে জটিল এবং অ্যাবস্ট্রাক্ট বক্ররেখাগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে? এই জটিল এবং অ্যাবস্ট্রাক্ট রেখাগুলিকে হিরণ বোঝে না। হিরণ ভাবতে-ভাবতে হাতে তখনও ধরে থাকা ট্রামের টিকিটটার দিকে তাকাল। সে এসপ্লানেডে যায়নি অথচ তার হাতে এসপ্লানেডের এই টিকিটটা বাতিল হয়ে গেল। এই অব্যবহৃত–উপযোগ সরবরাহে অক্ষম টিকিটটা তার কোন কাজে লাগবে? যদিও ব্যাপারটি দুর্বোধ্য তবু অস্পষ্টভাবে তার মনে পড়ল একদিন কফিহাউসে চারুলাল বাড়তি কাগজ খুঁজে না পেয়ে এমন একটি ব্যবহৃত টিকিটের পিছনে তার কবিতার পয়েন্ট টুকে রাখছিল।
যতদূর মনে পড়ে কবিতাটার নাম চারুলাল দিয়েছিল ‘শিল্পের কারণে আত্মহত্যা।’ বাস্তবিক আলাদা আলাদাভাবে ধরলে হিরণ শিল্প, কারণ ও আত্মহত্যা এই তিনটি শব্দের অর্থ বুঝতে পারে। কিন্তু এই তিনটি শব্দের দ্বারা বাক্য গঠিত হলে সে ‘চাইরু’ শব্দটার যে জটিলতা তেমনি এক জটিলতার সম্মুখীন হয়। হিরণ বুঝে উঠতে পারে না শিল্পের কারণ ও আত্মহত্যার কারণ এক কি না, কিংবা চারুল কি বোঝাতে চেয়েছে যে, শিল্প আত্মহত্যার এবং আত্মহত্যা শিল্পের কারণ স্বরূপ!
চারুলালকে হিরণ বুঝে উঠতে পারে না। চারুল অদ্ভুত। একবার তারা দুজন ‘নাইট শো’ সিনেমা দেখে ফিরছিল। ফুটপাথে এক গাড়ি–বারান্দার তলায় জনা দশবারো লোক টানটান হয়ে ঘুমোচ্ছে দেখে চারুলাল বলল ‘দাঁড়াও।’ হিরণ ফিরে দেখল অত্যন্ত অন্যমনস্ক চারুলাল হিরণের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন কোনও পোকামাকড় খুঁজছে এমনি ভঙ্গিতে বলল , ‘তোমার কি মনে হয় না যে এই লোকগুলো এখন প্রত্যেকেই ঘুমের ভিতরে স্বপ্ন দেখছে!’ ‘হতে পারে।’ হিরণ হেসে জবাব দিল, ‘তাতে কি?’ খানিকটা যেন লজ্জা পেয়ে চারুলাল বলল , ‘না, কিছু না। আমার মনে হল প্রতিবার পা ফেলে আমি ভিন্ন ভিন্ন লোকের ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্নগুলোকে মাড়িয়ে যাচ্ছি। অদ্ভুত! খানিকক্ষণ নিঃশব্দে হেঁটেছিল তারা। একবার শুধু হিরণের অস্পষ্টভাবে মনে হয়েছিল চারুলাল তাকে পিছন থেকে ‘হিরণ’ বলে ডাকল, পিছু ফিরে হিরণ দেখল চারুল অন্যমনস্কভাবে হাঁটছে, তার দিকে চাইছে না, অস্ফুট স্বরে কিছু বলছিল চারুলাল
‘ব্যাবিলনে…শূন্যোদ্যানে…স্বপ্নে…হিরণ কতবার গিয়েছি যে… স্বপ্নেদ্যানে… শূন্যে… ব্যাবিলনে…!’
হিরণ অন্যমনস্কভাবে এইসব রহস্যের কিনারা করবার চেষ্টা করছিল, এমন সময় একজন লোক ভদ্রভাবে তার সামনে দাঁড়িয়ে গলা চুলকোতে–চুলকোতে জিগ্যেস করল, ‘আজকের খেলার রেজাল্ট কি দাদা?’ মুহূর্তে সংবিৎ ফিরে পেয়ে লোকটার কথার উত্তরে অস্পষ্ট ‘জানি না’ বলেই সে ঘড়ি দেখল ছ’টা বেজে পাঁচ মিনিট। সাধারণত হিরণ উদ্দেশ্যহীনভাবে কোথাও বেরিয়ে পড়ে না, কিন্তু এখন চারুলালের কথা বেশ কিছুক্ষণ ভাববার পর, তাকে এ কথা বেশ কষ্ট করে মনে করতে হল যে, সে কেন এসপ্লানেড যাচ্ছিল। মনে পড়ল গ্লোবের ছবিটা দেখবে বলে সে এসপ্লানেড যাচ্ছিল, হল-এর সামনে অমিয় তার জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু এখন আর গিয়ে লাভ নেই! খেলার মাঠের ভিড় ট্রাম বাস বোঝাই হয়ে ফিরছে! ইস্টবেঙ্গল এক গোলে জিতেছে–চিৎকার শুনতে পেল হিরণ। ট্রাফিক জ্যাম, মিছিল, খেলার ভিড়–এই সব কিছুর মধ্যে স্বপ্নবিষ্ট চারুলাল কোথায় থাকতে পারে ভেবে না পেয়ে হিরণ ধীরে-ধীরে অনেকদিন পর গোলদিঘির দিকে চলল।
চারুলাল সম্পর্কে কি একটা শেষ কথা জানবার ছিল হিরণের। এখনও জানা হয়নি। কিংবা কে জানে, হয়তো চারুলালকে জানবার ও বুঝবার মতো শক্তি হিরণের কোনওদিন ছিল না। তার আজ হঠাৎ মনে হল অনেকদিন থেকেই সে চারুলালকে একটু অবহেলা করে এসেছে। দুঃখ হচ্ছিল চারুলালের জন্য। সে ট্রাম থেকেও দেখতে পেয়েছিল যে চারুলালের পাঞ্জাবিটা বড় ময়লা হয়ে গেছে; মনে পড়ল, চারুলাল বড় আস্তে-আস্তে হাঁটছিল। এক মুহূর্তের জন্য হিরণ চারুলের প্রতি গোপন ও তীব্র একটা আকর্ষণ বোধ করল। ব্যাবিলনে…শূনে…স্বপ্নেদ্যানে…কোথায় যেন। যেতে চায় চারুলাল, হিরণ জানে না। অমন যাওয়ার ইচ্ছে হিরণের কখনও হয়নি। তাই সে কখনও বুঝতে পারে না চারুলালের কল্পনার মধ্যে কেন একটানা দুশো মাইল উড়ে এসে একটা শকুন হাওড়ার পুলের ওপর বসে, আর অন্যদিকে ইউনিকর্ন লাল ইমলি, লিপটনের নিয়নগুলি দপদপিয়ে ওঠে, মন্থর ট্রাফিক কলকাতায় ক্রমশই কঠিনতর জ্যাম-এর দিকে অগ্রসর হয়, কোনও কিছুতেই তার প্রয়োজন নেই বলে আবার হাওয়ায় ডানা ভাসিয়ে দেয় শকুন গোপনে সে যেন কার প্রাণ হরণ করে নিয়ে যায়। স্বপ্নের শকুন’ নামক এই কবিতা হিরণ শুনেছে। চারুলালকে খানিকটা বিখ্যাত করেছে।
