তাই আমি চন্দ্রাকে নিয়ে ঘর বাঁধলাম।
আমার মা বলেছিল, ‘বাইরে একটি আগুন জ্বেলে রেখো। পাহাড় থেকে আমি যেন দেখতে পাই তুমি ঘরে আছ, তুমি ভালো আছ। ঘর সামলে রেখো, কোথাও যেয়ো না।’
দাইমা বলেছিল আমার কাছে চল। আমার ছেলে নেই, তোকে ছেলের মতো পালব।
বাঁশিওয়ালা বলেছিল : বৃষ্টির জল লেগে বীজধান ফলবে। বুক ফাটিয়ে শিষ বের করবে আকাশে। বড় ঘোড়াটার জন্য দুঃখ কোরো না। একটা ঋতু আসে আর একটা যায়।
গাঁওবুড়ো বলেছিল : ঘরদোর সামলে রাখিস। বুড়ো ঘোড়াটাকে দানাপানি দিস। বসে থাকিস না, দিনগুলো চলে যেতে দিস না। মনে রাখিস বাঁশিওয়ালা মাত্র একবার আসে।
আমি বলেছিলাম: বুড়ো, তুই আমার বাপ। ভাবনা করিস না, আমি তোকে দেখব।
আমি আগুন জ্বেলেছিলাম। ঘর আগলে ছিলাম। তবু কেন যে আমার বাবা গেল বিদেশে, রোজগার করতে! আমার মা গেল পাহাড়ে, পাতা কুড়োতে। আমার ঘোড়াটা গেল জলার ধারে, ঘাস খেতে।
চারুলালের আত্মহত্যা
ট্রাম থেকে হিরণ দেখল প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনে ফুটপাথ দিয়ে চারুলাল উত্তরমুখো হেঁটে যাচ্ছে। হাতে একরাশ বই, চুল উশকোখুশকো। এতদূর থেকেও বোঝা যায় চারুলালের হ্যান্ডলুমের গেরুয়া পাঞ্জাবি বড় ময়লা হয়ে গেছে। চারুলালের কাছে পাঁচটা টাকা পাওনা ছিল–হঠাৎ মনে পড়ায় হিরণ হাত নেড়ে ‘চারু’ বলে ডাকল। চারুলাল শুনতে পেল না। লক্ষ করে হিরণ তাড়াহুড়ো করে ট্রাম থেকে নেমে পড়ল।
নেমে খেয়াল হল যে, তার ট্রামের টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছিল। এসপ্লানেডের টিকিট। এখন যদি চারুলালকে না পাওয়া যায় তবে আর একবার টিকিট কাটতে হতে পারে! কিংবা সে দ্বিতীয়বার যদি টিকিট না কাটে এবং পরবর্তী কোনও ট্রামের কন্ডাক্টর যদি ভদ্র ও অন্যমনস্ক হয়। তবে সে একবার ভাড়া দিয়ে এসপ্লানেড না গিয়ে অন্যবার ভাড়া না দিয়ে এসপ্লানেডে পৌঁছতে পারে। একটু অন্যমনস্ক হিরণ হাত তুলে একটা ধীরগতি ফিয়াট গাড়িকে দাঁড় করিয়ে তার সামনে দিয়েই রাস্তা পার হল এবং যথাসম্ভব দ্রুত গতিতে ভিড় ঠেলে চারুলালের পিছু নেওয়ার চেষ্টা করল। সে হ্যারিসন রোড পার হল এবং কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ডাবপট্টি পর্যন্ত এগিয়ে গেল। হিরণ একটু বেটে, ভিড়ের গড়পড়তা উচ্চতাকে অতিক্রম করে চারুলালের মাথা কিংবা পাঞ্জাবির অংশ কোথাও দেখতে পেল না। তা ছাড়া চারুলাল যে সহজ সোজা পথে যাবে তারও কোনও নিশ্চয়তা ছিল না-কেন না চারুলাল কবি, অন্যমনস্ক, অমিতব্যয়ী ও বিপথগামী।
হতাশ হিরণ একটু দীর্ঘতর শ্বাস ছাড়ল। হাতের টিকিটটার দিকে চেয়ে সে আর একবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল। এ কথা ঠিক যে তার চিন্তা ভাবনা সব সময়েই অর্থনীতির ধার ঘেঁষে যায়। এখন তাকে একজন ভদ্র ও অন্যমনস্ক ট্রাম কন্ডাক্টর খুঁজে বের করতে হবে। অথচ ব্যাপারটা ঠিক আইনমাফিক হবে না। হাতের ট্রামের টিকিটটা ক্রমশ তার অর্থনৈতিক চিন্তাকে উজ্জীবিত করে। সে ভেবে দেখছিল এসব ক্ষেত্রে কন্ডাক্টরের কাছে ‘জার্নি ইনকমপ্লিট’ লেখা কোনও স্ট্যাম্প থাকলে সে ভদ্রভাবে এবং আইনমাফিক লক্ষ্যস্থলে পৌঁছোতে পারত।
যে স্টপেজে নেমেছিল আবার সে স্টপেজের দিকেই ফিরে আসছিল হিরণ। পুরানো বইয়ের দোকানের ধার ঘেঁষে, ফড়ে, দোকানি, ছাত্র–ছাত্রীর ভিড়ের ভিতর দিয়ে ইঁদুরের মতো দ্রুত গর্ত খুঁড়ে এগোতে গিয়ে সে লক্ষ করল কলেজ স্ট্রিটে মন্থর একটি ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হচ্ছে। ‘ধুত্তোর’ বলে ট্রাম–বাস থেকে নেমে পড়ছে লোক। ‘শালার মিছিল’–হিরণের প্রায় কান ঘেঁষে একজন চলতি মানুষ বলে গেল।
হিরণ মিছিল ভালবাসে না, আবার বাসেও। সে লক্ষ করল উত্তর দিকে কলেজ স্ট্রিট হয়ে মাঝারি এক মিছিল সামনে লাল সালুর ওপর রূপালি লেখা ভাসিয়ে দক্ষিণমুখো আসছে। অতএব কিছুক্ষণের জন্য এসপ্লানেডের ট্রামবাস বন্ধ। মন্দ নয়। হিরণ ভেবে দেখল মিছিলের সঙ্গ ধরলে সে দ্বিতীয় বারের ট্রামভাড়া সঞ্চয় করতে পারে এবং এসপ্লানেড পর্যন্ত এতটা পথ গোলেমালে কাটিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু তার আর দরকার হল না। কেননা সে দেখতে পেল চারুল উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে এইমাত্র একটা সিগারেট ধরাল। ‘চারু’ বলে চিৎকার করে হিরণ হাত নাড়ল এবং থেমে থাকা গাড়ি ও ট্রামগুলি অতিক্রম করে দেখল মিছিলটা ধীরগতিতে চারু আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। চারু মিছিল দেখছে। ‘চারু’ বলে আবার ডাকল হিরণ, আর সেই মুহূর্তে মিছিলের উন্মত্ত স্লোগান…’চাই’ ধ্বনিতে শেষ হলে হিরণ দেখল ‘চারু’ ও ‘চাই’ দুটি শব্দ মিলে মিশে ‘চাইরু’ গোছের একটা শব্দ ধ্বনিত হল। ‘চাইরু’ শব্দটা বিস্মিত হিরণ আপন মনে উচ্চারণ করল। কিমিদং এর অর্থ কী! ভাবল সে। সে চারুকে আর ডাকল না, মিছিলটাকে চলে যেতে দিল। তার চারুলালকে নিয়ে ভাবনা হচ্ছিল। কেননা চারুলাল ইতিমধ্যে পূর্ব-পশ্চিম বা উত্তর দক্ষিণ যে কোনও দিকে খামোকা রওনা হয়ে পড়তে পারে। কেননা ইতিপূর্বে সে চারুলালকে উত্তর দিকে যেতে দেখেছিল, এবং এখন দেখা যাচ্ছে যে, সে আবার দক্ষিণ দিকে উজিয়ে এসেছে। চারুলালের চলাফেরার মধ্যে কোনও পরিকল্পনা নেই। কোনও লক্ষে পৌঁছোবার একমুখিনতা নেই। এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বাস্তবিক মিছিলটা শেষ হওয়ার পর দেখা গেল চারুলাল যথাস্থানে নেই। পুলিশের কালো গাড়িটা কয়েক মুহূর্তের আড়াল তৈরি করেছিল এবং সেটুকু সময়েই অস্থিমনস্ক চারুলাল মত পরিবর্তন করেছে।
