আমার বিশ্বাস হল না। ওরা হাসল প্রাণ খুলে। আমার পিঠে চওড়া হাতের চাপড় মেরে বলল , ‘তার জন্য ভাবনা কী, তুইও তো জোয়ান মরদ হয়ে উঠবি দু-দিন বাদে। খেটে খেতে পারবি না? চিরকাল কি মায়ের আঁচল চাপা থাকে কেউ, না কি আমাদের তাই করলে চলে?’
মা আমাকে ফাঁকি দিয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে ভেবে সারা গাঁ পাতি–পাতি করে খুঁজলাম। ওরা বলল , ‘খুঁজে কী করবি! তার চেয়ে পাহাড়ে চল। পাতা কুড়োবি।’
আমি পাহাড়ে গেলাম। কিন্তু কাঠ–পাতা কুড়োতে মন গেল না।
ওরা বলল , ‘তোর মা গেছে সুখের খোঁজে। পাহাড়ের ওপারে। আয়, কাঠ কুড়োবি।’
আমি জেনেছিলাম যে আমি আছি বলেই মার সুখ। সুখ মানেই দুঃখের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি। আমি আছি বলেই মার সেই শক্তি আছে। অনেক বড় হয়ে জেনেছিলাম যে আমিই মার দুঃখ, আমি ছিলাম বলেই মা সুখের খোঁজে চলে যেতে পারছিল না। দুঃখ মানেই সুখের পথ আগলে যে দাঁড়ায়।
আমার বাবা গেল পাহাড়ের ওপারে, আমার মা-ও আর ফিরল না। রইল শুধু ঘোড়াটা। সেই ঘোড়াটাও বুড়ো হয়েছে। কাজকর্ম করতে পারে না। কখনও মাঠে চরতে যায়, বেশিরভাগ সময়েই ঘরে বসে ঝিমোয়। আমি ঘাস কেটে এনে খাওয়াই, জল দিই। যেমন বাপ বুড়ো হলে ছেলে তার কাজকর্ম করে। মাঝে-মাঝে ওর প্রকাণ্ড বুড়ো মাথাটি আমার কাঁধে নামিয়ে রাখত। তখন ওর ঘন, গাঢ় দীর্ঘ নিশ্বাসের শব্দ শোনা যেত। সে নিশ্বাসে ওর গায়ের চামড়া থরথর করে কাঁপত। ওর মুখে, চোয়ালে, ঘাড়ে শিরাগুলো থাকত ফুলে, ওর ভাঙাচোরা মুখটা ছিল গাছের কাণ্ডের মতো এবড়োখেবড়ো। ওর প্রকাণ্ড ঘাড়টা দু-হাতে জড়িয়ে থেকে আমার মনে হত যেন বহুদিনের পুরোনো একটা বটগাছ শাখাপ্রশাখা মেলে আমায় আশ্রয় দিয়েছে।
একদিন ঘোড়াটিকে দেখে গাঁওবুড়ো বলল , ‘ঘোড়াতে চেপে তোর বাপ বিয়ে করতে গিয়েছিল। ঘোড়াটি তোর বাপের মতন। ওকে যত্ন–আত্তি–করিস!’
ঘোড়াটিকে নিয়ে ছিলাম মেতে। বাদবাকি সময়টা কাটত চুপচাপ দাওয়ায় বসে। সারাদিন। বাতাস আমাদের ফাঁকা বাড়িটায় শিস দিয়ে খেলা করত। দেখতাম, গুড়মি শাকের জঙ্গলে চড়াই নেচে বেড়াচ্ছে, ধনে পাতার গন্ধে বাতাস ভারী, সরসর করে গাছের শুকনো পাতায় বাতাস বইছে। কুয়োর পারের ছোট্ট একটু গর্তে জমে থাকা জলে শালিক চান করছে জল ছিটিয়ে। ও চলে গেলে জলের কয়েকটা সরু রেখা থাকত মাটিতে, কয়েকটা পালক বাতাসে। আমার চকচকে দা’টাতে মরচে পড়ল। সারা বাড়িটায় অশ্বখ চারা উঠল গজিয়ে।
দিন কাটে। সন্ধে হলে পাতা জড়ো করে আগুন জ্বেলে চুপ করে শুয়ে থাকি। আগুনটা মরে এলে তার নরম আঁচ অনেকটা মার শরীরের তাপের মতো মনে হয়। তাই কখনও ঘুম আসে শরীর অবশ করে দিয়ে।
যে দাই আমার নাড়ি কেটেছিল সে এসে একদিন বলল , ‘এমনি করে কি না খেয়ে মরবি? তার চেয়ে আমার কাছে চল। আমার তো ছেলে নেই, একটা মাত্র মেয়ে। দুজনে বেশ থাকবি।’
‘উঁহু। আমি রাতে স্বপ্ন দেখি বাবা ফিরে আসছে।’
‘হ্যাঁ যেমন তোর মা মুখপুড়ী ফিরল। তা খাস কী?’
‘শাকপাতা যখন যা হয়।’
বুড়ি গজগজ করে আমাকে বকতে–বকতে চলে গেল।
তারপর থেকে দাইমার মেয়ে চন্দ্রা আমার জন্য ভাত আনত রোজ। ভাতের থালাটা মাটিতে রেখে বেড়ালের মতো খাপ পেতে আমার দিকে চেয়ে থাকত চন্দ্রা, যেন শহরের মানুষ দেখছে।
একদিন আমি বললাম, ‘কী দেখছিস? কী দেখিস রোজ?’
ও বলল , ‘তোকে। তুই একটা বুড়ো জানোয়ারের সঙ্গে থাকিস কেন?’
‘ওকে আমি আমার বাপের মতো ভালোবাসি।’
ও খিলখিল করে হাসল। তারপর আমার চোখের দিকে চেয়ে ভয় পেয়ে থামল। বলল , ‘ভালোবাসার আর লোক পেলি না। ওটা চড়ে তুই কোন দেশ জয় করতে যাবি?’
আমি ভাবলাম, যাব, একদিন যাব। পুবদিকে যাব–যে দিকে সূর্য ওঠে। একদিন আমি রাজা হয়ে ফিরব, দেখিস। আমি বললাম, ‘জানি না রে।’
ও হাত তুলে আমাকে আমার ঘর দেখাল। বলল , ‘ওই দেখ গাছের শেকড়গুলো সাপের মতো দেওয়ালের মাটিতে গর্ত খুঁড়ছে। তোর চারপাশের দেওয়াল আর বেশিদিন থাকবে না; ধসে পড়বে! সময় থাকতে শত্রুরগুলোকে মুড়িয়ে কাট!’
আমি ঠাট্টা করে বললাম, ‘ওরা আমার মায়ের মতো। কেটে ফেললে বাইরে থেকে ডালপালা দেখা যায় না, কিন্তু মনের মধ্যে ওদের শেকড় থাকে।’
শুনে ও রাগ করে চলে গেল। বলে গেল, ‘তোর মরণ এসেছে ঘনিয়ে। একদিন তুই দেওয়ালচাপা হয়ে মরবি।’
আমি ভাবলাম, শেকড়গুলো গর্ত খুড়বে, আরও গভীর হবে। মনের দেওয়ালে চিড় ধরবে, ফাটল হবে। তারপর একদিন চৌচির হয়ে ভাঙবে। সেদিন আমি আমার বুড়ো ঘোড়ায় চেপে পুবদিকে রওনা দেব। গাঁয়ের লোকেরা দেখবে আমার লাঠির আগায় বাঁধা পুটলিটা আস্তে-আস্তে দূর থেকে দূরে পাকা ধানের খেতের আড়ালে মিলিয়ে গেল। ওরা জানবে, আমি ফিরে আসব একদিন। রাজা হয়ে।
একদিন চন্দ্রা আমার ভাত নিয়ে এল না। ফাগনলালের ঘরের পাশ দিয়ে মৌরিখেতের কিনারায় কিনারায় যে পথটা ধরে চন্দ্রা আসে, সেদিকে চেয়ে সারা দুপুর কাটল। চন্দ্রা এল না। তারপর দিনও না। চন্দ্রা এল না দেখে আমি উঠে খুঁজে-পেতে আমার পুরোনো মরচে ধরা দা’টা বের করে পাথরে শান দিতে বসলাম।
সারাটা দুপুর পাথরে মুখ ঘষে দা’টা ঝকঝক করে হেসে উঠল, ওর গায়ে আগুন ছুটল। দা’য়ে শান দিয়ে–দিয়ে আমার হাতপায়ের মাংসগুলো ফুলে উঠল, শিরায়-শিরায় গরম রক্ত ছুটল টগবগিয়ে। কেমন যেন খুশি লাগল। নেশা পেল।
