ভেবেছিলাম সূর্য ডোবার আগেই অশ্বথের চারাগুলো কেটে ফেলব। এমন সময় চন্দ্রা এল হাতে ভাতের থালা নিয়ে। রোজ যেমন আসত।
আমি বললাম, ‘এতদিন আসিসনি কেন?’
ও গম্ভীর হয়ে বলে, ‘একটা বাঘ রোজ আমার পথ আগলে থাক। বলে, কোথায় যাচ্ছিস? থালা নামিয়ে রাখ সামনে আর বসে-বসে আমার লেজে হাত বুলিয়ে দে। নইলে তোকে যমের বাড়ি পাঠাব। রোজ এমনি করে বাঘটা তোর ভাত খেয়ে ফেলে।’
আমি বললাম, জানি। এ গল্প আমি মার কাছে শুনেছি। এক বুড়ি রোজ তার ছেলের কাছে খাবার নিয়ে যেত, আর পথ আগলে থাকত বাঘ।
‘হ্যাঁ, শুনেছিস। তাতে কী? এমন বুঝি হয় না?’
আমি ভেবেছিলাম, বড় হয়ে আমি বাঘটাকে মেরে ফেলব, খিদেকে বাঁচিয়ে রাখতে নেই, তেষ্টাকে বাঁচিয়ে রাখতে নেই। পথ আগলে যেই থাকবে তাকে সাফ করে দাও।
চন্দ্রা খিলখিল করে হাসল মুখ আঁচল দিয়ে। বলল , ‘তুই বাঘটাকে মারবি, না ওর লেজে হাত বুলিয়ে দিবি?’
আমি বললাম, ‘জানি না।’
ও বলল , ‘মা দেখছিল, তুই খিদের জ্বালায় আমাদের বাড়ি যাস কি না। মা তোকে যাচাই করছিল। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে মা বলেছে তুই মানুষ নয়। তোর বাপটা ছিল একটি গোঁয়ার, তাই একমুখো চলে গেছে। ঘরের পথ ফিরে চিনল না। তুইও যাবি, যাবি। কাঁদতে কাঁদতে মা ভাত বেড়ে দিল।’
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে, অনেক ভেবে চন্দ্রা বলল , ‘কিন্তু আমি জানি তুই যাবি না।’
এই বলে ও চলে গেল। আমি আমার দা’টা হাতে নিলাম। এক-এক কোপে অশ্বথের মোটা মোটা ডালগুলো খসে পড়তে লাগল। আমার শরীর গরম হল, ছলাৎছল করে রক্ত বইল শিরায় শিরায়। আমি আপন মনে হাসতে লাগলাম। শীতকালে আমাদের বুড়ো ঘোড়াটার গা থেকে ধোঁয়ার মতো একটা ভাপ বেরোত। সেই ভাপে ওর রক্তমাংস আর ঘামের গন্ধ পাওয়া যেত। নিজের শরীর থেকে আমি তেমনি এক গন্ধ পেলাম। মদের যেমন স্বাদ নেই, এ-গন্ধেরও তেমন ভালোমন্দ নেই। এ শুধু আমাকে মাতাল করে। আমি আপন মনে হাসলাম। যেন আমার নেশা হল। আমার ইচ্ছে নিজের শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে আদর করি। মাটির দাওয়ায় আমি শরীরটাকে গড়িয়ে দিলাম। আমার শরীরের ঘাম মাটির সঙ্গে মিশল। শীতের শেষে বসন্তের গোড়ার দিকে আমার কাছে এক বাঁশিওয়ালা এল। তখন বাতাসে টান লেগেছে। শুকনো পাতাগুলো টুপটাপ করে ঝরে-ঝরে শেষ হয়েছে। খেতে মটর শাকে পাক ধরল। যারা শুকনো কাঠ-পাতা কুড়োতে যেত তাদের দিন গেল।
এমনি একদিন শেষ দুপুরে অনেক দূর থেকে বাঁশিওয়ালা এসে আমার দাওয়ায় বসল। তার গায়ে একশো রঙের একশো তালি দেওয়া একটা জোব্বা, মাথায় একটা মস্ত পাগড়ি। সেই পাগড়িটা তার কপালটিকে ঢেকে ফেলেছে। রোগা দুটো পা রাঙা ধুলোয় মাখা। আমি কখনও এই বাঁশিওয়ালাকে দেখিনি।
সে বলল , ‘আমি বাঁশি বিক্রি করিনি। বাঁশির সুর বিক্রি করি।’ এই বলে সে তার বাঁশিতে একটা অদ্ভুত সুর বাজাল।
আমি বললাম, ‘বাঁশিতে তুমি কী সুর বাজালে? আমি তার কতক বুঝলাম, কতক বুঝলাম না।’
বাঁশিওয়ালা তার ঘন জ্বর নীচে গভীর গর্তের মতো চোখ দুটো দিয়ে আমায় দেখল। বলল ‘এ সুর আমি কোথাও শিখিনি বাবা, কেউ আমাকে শেখায়নি। আমার কোনও গুরু নেই। আমি হাটে মাঠে ঘাটে যা শুনি তাই বাজিয়ে বেড়াই। কখনও নোঙর করা নৌকোয় জলের ঢেউ লাগবার সুর, কখনও শীতের শুকনো পাতায় বাতাস লাগবার সুর।’
সে আবার তার বাঁশিতে ফুঁ দিল। শেষে শীতের শুকনো বাতাসে বাঁশির টান লাগল। কয়েকটা সুর তীরের মতো আকাশে ছড়িয়ে মিলিয়ে গেল। আমার চোখের সামনে দুপুরটা মাতালের মতো টলতে লাগল। যেন অনেক দূর পথ! আমাদের এই মৌরি খেত ডিঙিয়ে ধানের আবাদের পাশ দিয়ে পাহাড় পেরিয়ে চলেছে–চলেছে–চলেছে। কত গঞ্জ, কত ব্যাপারীর আস্তানা, কত বন্দর, ঘাট মাঠ পেরিয়ে যাওয়া দেশ। বাঁশির সুর সেই দূর-দূরান্তের আভাস মাত্র নিয়ে কোকিলের অস্পষ্ট ডাকের মতো নরম, বিষণ্ণ হয়ে ফিরে ফিরে আসছে। সেই পথ ধরে, অনেক আলো, অনেক অন্ধকার মাড়িয়ে মাড়িয়ে কে যেন আসছে–আসছে–আসছে।
বড় ক্লান্ত পথ! বড় দীর্ঘ পথ! আমি চোখ বুজে ভাবলাম, সে আমার বাবা। কত দিন গেল, কত রাত গেল। ঘোড়াটি বুড়ো হল। বাবা আর ফিরল না।
বাঁশিওয়ালা সুর পালটে নতুন সুর ধরল। কখন আমার চোখ ছাপিয়ে কান্না এসেছে। এ কেমন সুর যা দিনের আলোকে অন্ধকার করে দেয়।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘এর মানে কী? আমাকে বুঝিয়ে দাও।’
বাঁশিওয়ালা থামল না।
যেন এতদিন মাঠটা ছিল রোদে পোড়া, ফাটা-ফাটা। একদিন পাহাড়ে মেঘ জমল। বৃষ্টি নামল। অঝোর ধারে বৃষ্টি। মাটির কোষে-কোষে জল ঢুকল। বীজধান ফুলে উঠল। বুক ফাটিয়ে শিষ বার করল আকাশে।
বাঁশিওয়ালা থামল। বলল , ‘এর অর্থ যেমন করে কুঁড়ি থেকে ফুল হয় আস্তে-আস্তে, তোমার চোখের আড়ালে অন্ধকারে যেমন করে আস্তে-আস্তে পাপড়িগুলো মেলে দেয়, যেমন করে শুকনো
পাতা ঝরে পড়ে আবার নতুন পাতায় ছেয়ে যায় গাছ তেমনি করে তোমার দেহেও একটা ঋতু আসে আর-একটা যায়।’
এই বলে বাঁশিওয়ালা আবার তার বাঁশিতে সুর দিল। যেন বলল , বুড়ো ঘোড়াটার জন্য দুঃখ কোরো না। এক-একটি ঋতু যায়, আর-একটি আসে। দুঃখকে সহ্য করো। খেতে আগুন লাগলে ফসল ভালো হয়।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘এ সুর তুমি কোথায় পেলে?
