রেবা বলল, মাসিমা, আমার কী দোষ বলুন। লোকটা যে ওরকম তা কি জানতাম!
কালিদাসীর বুকভরা তখন গুন্টুর চিন্তা। বলল, সে জানি বাছা। আজকালকার লোক বড় ভালো নয়। সাবধানে থাকবে।
রেবা কালিদাসীকে ধরে খুব যত্নে কাঁচা ড্রেনটা পার করাল। মনে-মনে বলল, চক্কোত্তিমশাই, দ্যাখো বুড়ি যেন আমাদের না তাড়ায়।
.
আট
গুন্টুকে নিয়ে রেলগাড়ি হাওড়া ছেড়েছে অনেকক্ষণ। জানলার ধারে বসে সে এখন বাইরে গ্রাম আর খেত দেখছে। গা ঘেঁষে ছোট বোন দুটি বসে। মা একটু তফাত থেকে মাঝে-মাঝে মুগ্ধচোখে তার মুখের দিকে চাইছে। আর বার-বার জিগ্যেস করছে, খিদে পেয়েছে বাবা তোমার? কিছু দিই? সন্দেশ আছে, রসগোল্লা, লুচি। কত এনেছি দ্যাখো! বাবা একবার কানে-কানে জিগ্যেস করেছিল—মাকে তোর পছন্দ হয়েছে তো গুন্টু?
গুন্টু ঘাড় নাড়ল। বেশ মা। বোন দুটিও বড় ভালো। এরকম মা বোন তার ছিল না তো এতদিন! দিদিমা বড় কেঁদেছে ডুয়ে পড়ে। মামা স্টেশন পর্যন্ত শুকনো মুখে এসে গাড়িতে তুলে দিয়ে গেছে। চক্কোত্তিমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসেনি। মনটা বড় খারাপ লাগে। আবার ভাবে, নতুন একটা জায়গায় যাচ্ছে, সেখানে না জানি কত ফুর্তি হবে! কত খেলা!
.
নয়
দিন ফুরোয়। সাঁঝের আঁধার ঘনিয়ে আসে। মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে। কানাই মাস্টার টিউশনিতে বেরোল। হেম আজ গেল রেবাকে নিয়ে সিনেমায়। অভয়পদ পরোটা খেয়ে পুজো কমিটির মিটিং এ যাওয়ার সময় বলে গেল—মা, যাই। কালিদাসী শুনতে পেল না, সে তখন গোয়ালঘরে গরু দুটোর সঙ্গে রাজ্যের কথা ফেঁদে বসেছে।
দিনটা গেল, যেমন যায়।
ঘরের পথ
আমার বাবা গিয়েছিল বিদেশে, রোজগার করতে। মা গিয়েছিল পাহাড়ে পাতা কুড়োতে। কেউই আর ফিরল না।
আমাদের বাড়িটা ছিল মাটির। তাতে ফাটল ধরেছিল। যখন বাতাস বইত তখন সেই ফাটলের মুখে শিস দেওয়ার মতো শব্দ হত। যেন বাইরে থেকে কেউ ডাকছে। কখনও-কখনও রাত্রিবেলা সেই শব্দে ভয় পেয়ে আমি মাকে জড়িয়ে ধরতাম, মা আমাকে। মাটির দাওয়ায় কিংবা দেওয়ালে অশ্বত্থ গাছের চারা দেখলেই মা আমাকে সেটি কেটে ফেলতে বলত। অশ্বখ চারা কাটতে–কাটতে আমার অভ্যেস দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অবসর পেলেই আমি দা হাতে অশ্বত্থ চারা খুঁজে বেড়াতাম।
ঘরের চালে ভালো খড় ছিল না। বর্ষাকালে জল পড়লে আমাদের ভিজতে হত। সারা ঘর যখন জলে থইথই করত তখন মা আমাকে আধখানা আঁচলের আড়ালে রেখে আমাদের আগের দিনের সুখের গল্প বলত। আমাকে আঁচল দিয়ে ঢাকা ছিল মার স্বভাব। শীতে কিংবা বর্ষায় কিংবা ঝড়ে আমি মার আঁচলের আড়ালে চাপা থাকতাম। আমার বাবার একটা বুড়ো ঘোড়া ছিল। ঘোড়াটা কোনও কাজ করত না। আমি ঘাস কেটে এনে ওকে খাওয়াতাম। ঘোড়াটাকে বাবা খুব ভালোবাসত। আমি বাবাকে দেখিনি। যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন বাবা গিয়েছিল বিদেশে, রোজগার করতে। তারপর আর ফেরেনি। আমি বাবার ঘোড়াকে ভালোবাসতাম। ওর গায়ের গন্ধে আমার বাবার কথা মনে পড়ত।
বাবা ফিরল না দেখে মা পাহাড়ে কাঠ–পাতা কুড়োতে যেত। আমাদের গাঁয়ের গরিব মানুষেরা সবাই কাঠ কুড়োত। মা তাদের সঙ্গে খুব ভোরে চলে যেত। ফিরত সন্ধেবেলায়, কখনও-কখনও রাত্রি হত। যাওয়ার সময় মা বলত, সারাদিনে ঘর পাহারা দিও। ঘোড়াটাকে ঘাসজল দিও। সন্ধেবেলায় শুকনো পাতা জড়ো করে বাইরে একটা আগুন জ্বেলে তার পাশে বসে থেকো। পাহাড় থেকে আগুনটি দেখতে পেলেই আমি বুঝব তুমি ভালো আছ, ঘরে আছ। তা হলেই আমার ভাবনা থাকবে না।
আমি সারাদিন ঘরে থাকতাম। ঘোড়াটাকে ঘাসজল দিতাম। আর সন্ধে হলেই শুকনো পাতা জড়ো করে বাইরে একটি মস্ত আগুন জ্বালতাম। আগুনের পাশে বসে দেখতাম দূরে বহু দূরে নীল পাহাড় দৈত্যের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার বাঁদিকে মস্ত মাঠের ওপাশে, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পাহাড়টি মেঘ আর কুয়াশার মতো আবছা হয়ে যেত। তবু পাহাড়টি আমার চোখ থেকে কখনও হারিয়ে যায়নি। ছবির মতো পাহাড়টা আমার চোখের ওপর স্থির থাকত। আগুন জ্বলতে-জ্বলতে নিবে আসত। পাহাড়টিকে আমার বড় ভয়। ওই পাহাড় পেরিয়ে আমার বাবা চলে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। মা কখন ফিরবে ভাবতে-ভাবতে আমি কখনও-কখনও ঘুমিয়ে পড়ে মা ফিরে আসার স্বপ্ন দেখতাম।
কখনও-কখনও মা আমাকে বাবার গল্প বলত। ওই পাহাড়ের ওপাশে অনেক নদী–নালা খাল–বিল পেরিয়ে বাবা বিদেশে গেছে। সেখানে যেতে হলে ক’টা নদী ক’টা পাহাড় পার হতে হয়। মা জানে না। মা শুধু জানে, একদিন বাবা অনেক রোজগার করে ফিরে আসবে। তখন আমি নতুন জামা জুতো পরে একটা বাচ্চা ঘোড়ায় চড়ে বাবার বুড়ো ঘোড়াটার পাশে-পাশে টগবগিয়ে কোথাও চলে যাব।
মা কখনও-কখনও পাহাড়টাকে অভিশাপ দিত, ওটা গোটা পৃথিবীটাকে আড়াল করে বসে আছে বলে। আবার কাঠ–পাতা কুড়োতে ওই পাহাড়েই যেত।
একদিন মা আর ফিরল না। অনেকক্ষণ জ্বলে–জ্বলে আগুনটা নিবল। দূরের নীচে পাহাড় মেঘ আর কুয়াশার মতো আবছা হল। মা আর ফিরল না।
ভোর হতেই আমি মার খোঁজে বেরোলাম। যারা কাঠ কুড়োতে গিয়েছিল তারা সবাই ফিরেছে, শুধু আমার মা বাদে। তাদের মধ্যে একজন বলল , তোর মা গেছে সুখের খোঁজে। পাহাড়ের ওপারে। তুই ছিলি গলার কাঁটা, তাই তোকে ফেলে গেছে।
