শালওয়ালার নাম ছিল গিরিনবাবু। তা গিরিনবাবু একদিন তাকে ডেকে চুপিচুপি বলল , ‘শোন কুমুদ, আমি ঠিক করেছি তোমাকে পুষ্যি নেব। উইল করে আমার বিষয় সম্পত্তি সব তোমাকেই দিয়ে যাব। এক জ্যোতিষী বলেছে আমার আয়ু আর বেশিদিন নয়।’
কুমুদের কাছে এ প্রস্তাব স্বপ্নের মতো। সে তক্ষুনি রাজি হয়ে গেল।
তবে পুষ্যি নেওয়াটা মুখে মুখেই হল। কাগজপত্র কিছু লেখা থাকল না। গিরিনবাবু মাথাপাগল লোক, তাঁর খেয়ালও কম।
কুমুদকে যে গিরিনবাবু পুষ্যি নিয়েছেন একথাটা কিন্তু তাঁর দুই চাকর ভজা আর কানু বিশ্বাস করল না। ঠাকুর নন্দলালও গায়ে মাখল না। অথচ এদের ওপরে খবরদারি করতে না পারলে তার পুষ্যি হয়েই লাভটা কী? তবে গিরিনবাবুকে সে প্রকাশ্যে বেশ খোলা গলায় ‘বাবা’ বলে ডাকতে শুরু করে দিল।
গিরিনবাবুর হঠাৎ একদিন খেয়াল হল কুমুদের বিয়ে দেওয়া দরকার। ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে তিনি পাত্রী খুঁজতে লোক লাগিয়ে দিলেন। গাঁয়ে গঞ্জে পাত্রীর অভাব নেই। মেয়ের বাপেরা মুখিয়ে বসে আছে। নবীগঞ্জের পরেশ পালের মেয়ে রামীকে পছন্দ করে এলেন গিরিনবাবু। তারপর বেশ বাজনা-টাজনা বাজিয়ে ফস করে বিয়েও হয়ে গেল। রামী তখন নিতান্তই বালিকা। ন-দশ বছর বয়েস। কথা ছিল বিয়ের পর বউ বাপের বাড়িতেই দু-চার বছর থাকবে।
কিন্তু গোলমাল বাধল অন্য জায়গায়। বিয়ের পর পরেশ পালের জ্ঞানের চোখ খুলল। তার কাছে যে কুমুদ সজাত হলেও গিরিনবাবুর ছেলে নয়, পুষ্যি। তার ওপর কুমুদের নানা কীর্তি কাহিনীও ততক্ষণে চাউর হয়ে গেছে। পরেশ পাল এসে একদিন খুব হাত-পা নেড়ে গিরিনবাবুকে পাঁচ কথা শুনিয়ে গেল।
গিরিনবাবু সেই অপমানের পর শয্যা নিলেন। এবং তিনদিন বাদে একদিন সকালে দেখা গেল, ঘুমের মধ্যে গিরিনবাবু ইহলোক ছেড়েছেন। তার তিনদিনের মধ্যে কোথা থেকে পিল পিল করে গিরিনবাবুর একগাদা ভাইপো ভাইঝির আগমন ঘটল। তারা এসেই বাড়িটাড়ি দখল করে ফেলল, আর ঘাড় ধরে কাজের লোকেদের তাড়াতে লাগল।
কুমুদ বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, সে আজ্ঞে কাজের লোক নয়। হু-হু বাবা, সে হল পুষ্যি পুত্তর।
একথায় তারা এমন হেসে উঠল যে, কহতব্য নয়।
কুমুদ তবু গাঁইগুই করছিল। তখন গিরিনবাবুর ভাইপোরা ধরে খুব আড়ং ধোলাই দিল। তাকে। তারপর জুতো পেটা করে তাড়াল। অবশ্য শুধু হাতে বিদায় নেওয়ার পাত্র কুমুদ নয়। দুশো টাকা আগেই সরিয়েছিল, যাওয়ার সময় দু-চারখানা বাসন, একখানা অ্যালার্ম ঘড়ি, তিনজোড়া জুতো সরিয়ে নিল।
কখনও-কখনও আমও যায় ছালাও যায়। গিরিনবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে নবাবগঞ্জের শ্বশুর বাড়িতেও একবার গিয়েছিল। পরেশ পাল তাকে বারবাড়ি থেকেই কুকুরের মতো খেদিয়ে দেয়। স্পষ্টই বলে দেয় যে মেয়ে তার কুমারীই আছে। আবার বিয়ে দেব। কুমুদকে সে জামাই হিসেবে মানে না। কুমুদ মাথা নেড়ে স্বীকার করে নিয়ে বলল , ‘মানা উচিতও নয়।’
সুখের পর দুঃখটা বেশ গায়ে লাগে। কুমুদেরও লাগল। গিরিনবাবুর বাড়িতে তোফা কয়েকদিন কাটানোর পর ফের খিদের কষ্ট সহ্য হচ্ছিল না।
কিন্তু গিরিনবাবুর মতো আর-এক জন মাথাপাগলা লোক না পাওয়া গেলে এসব সমস্যার সুসারও হয় না। কুমুদের ফেরেববাজি করে দিন কাটতে লাগল।
নোনাপুকুরের শ্মশানে একদল সন্ন্যাসী ডেরা গেড়ে ছিল। তারা সব হিমালয়ে থাকে। গঙ্গাসাগরে এসেছিল ফিরে যাচ্ছে। তাদের কাছে জরিবুটি কিছু পাওয়া যায় কি না এই আশায় কুমুদ গিয়ে তাদে সঙ্গে ভিড়ল, গাঁজা সেজে দেওয়া, পা দাবানা সবই করল। কিন্তু বুঝল না সাধুগুলো কোন গোছের। কিছু ভাঙতে চায় না।
দু-দিন বাদে সাধুগুলো ডেরা গুটাল। আশায়-আশায় তাদের সঙ্গ নিল কুমুদ। গায়ে ছাইটাই মেখে নিল। জটা হয়নি তবে যথাসাধ্য ধুলোটুলো ঘসে মাথাটারও একটা ব্যবস্থাও করে ফেলল। কমণ্ডল, শূল, আর কৌপীনও ধারণ করে নিল। সাধু সাজলেও এদেশে কিছু রোজগার বাঁধা। তাকে তাড়াল না সাধুরা।
হাঁটতে-হাঁটতে দুটো জায়গায় রাত কাটিয়ে পরদিন দুপুর নাগাদ যে গাঁয়ে পৌঁছল সেটা কপালক্রমে নবীগঞ্জ। কুমুদের শ্বশুর বাড়ি। শ্মশানে সাধুরা ধুনি জ্বালিয়ে চায়ের জল চাপাল, কুমুদের ওপর হুকুম হল দুধ জোগাড় করে আনতে।
মনটা ভালো ছিল না কুমুদের। সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে যেতে হচ্ছে, নিজের বাপ তাড়িয়ে দিয়েছে, পাতানো বাপ পটল তুলেছে, শ্বশুর বাপ মুখ দেখতেও নারাজ। ভরসা শুধু সাধুবাবা সকল। তারাও বেশি ভরসা দিচ্ছে না। বুড়ো সাধু বিবেচক, অনেকবার তাকে বলেছে পাহাড়ের শীতে বাঙালিদের আমাশা হয়। সে আমাশা ওষুধে সারে না। আর সেখানে শীতও সাংঘাতিক, ডাল সেদ্ধ হয় না, কাঠ জোগাড় করতে দম বেরিয়ে যায়। শুনে ভয় খাচ্ছে কুমুদ। একটা লোটা নিয়ে দুধ জোগাড় করতে বেরিয়ে শ্বশুর বাড়ির গাঁ–খানা ভালো করে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিল সে।
রামীকে তার ভালো মনে নেই। দেখনা-দেখনা করে বছর চারেক কেটে গেছে শুভদৃষ্টির পর। হ্যাজাকের আলোয় কচি মুখখানা দেখেছিল সেটা ভুলেই গেছে। এতোদিনে তার ডাগরটি হওয়ার কথা। বিয়েও হয়ে গেছে বোধহয় এত দিনে।
এধার-ওধার ঘুরল সে। চট করে শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হতে তেমন সাহস হল না। সাধু। দেখে সবাই তাকাচ্ছে, দু-একজন পেন্নামও করে ফেলল। গয়লা গাড়িতে পো টাক দুধ ভিক্ষেও পেয়ে গেল সে। ফেরার আগে শ্বশুর বাড়িটা একটু দেখে যেতে ইচ্ছে করছিল বড্ড। শেষ দেখা।
