কুমুদ জুতো পেটা হয়ে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল তখন চারিদিকে উদোম উধাও পৃথিবী। যেদিকে খুশি যাও, যা খুশি করো, কিছু বলার নেই কারও।
চৌদ্দ বছর বয়সে সে এক ভারী মজার ব্যাপার। প্রথম রাতটা জল খেয়ে গাছতলায় কাটিয়ে দিল কুমুদ। বেশ লাগল। একটু খিদে পায়, এই যা মুশকিল। কুমুদ চার-পাঁচ গাঁ তফাতে গিয়ে এক বাড়িতে চাকরের কাজ নিল। ঠিক তিন দিন বাদে ফাঁক বুঝে গিন্নিমার সোনার বালাটা হাতিয়ে কেটে পড়ল।
মতি স্যাকরা খুব ঠকিয়েছিল। মাত্র দেড়শো টাকা তাও মেলা ঝোলাঝুলির পর দিয়েছিল।
ধড়িবাজ লোক, বালাটা হাতে নিয়ে তার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলল , ‘এ তো চুরির মাল বাপু, ধরা পড়লে তোমারও হেনস্থা আমারও হেনস্থা।’
দেড়শো টাকায় কয়েকটা দিন একেবারে রাজার হালে কেটে গেল কুমুদের। তারপর সে আরও তফাত হতে লাগল। দশ-বিশ গাঁ আর দুটো গঞ্জ ছেড়ে ফুলপুরে বাসা গাড়ল। তুচ্ছ কাজ, একটা পুরোনো কালীমন্দির, ঝাঁট-পাট দেওয়া আর ধোয়া মোছার কাজ। মাইনে পাঁচ টাকা আর দু-বেলা খাওয়া।
এ কাজটা কুমুদের বেশ ভালোই লাগত। খবরদারি কারার লোক নেই, ছড়িদার নেই, খাটুনিও কিছু নয়। একদিন কালীমন্দিরে দুপুরবেলা এক ঝুল্লুস বাবাজি এসে হাজির। জটাজুট, দাড়ি আর ময়লা রক্তাম্বর। আর গায়ে যে বোঁটকা গন্ধ। বাবাজি নানারকম হু-হুঙ্কার ছেড়ে আর অং–বং চিৎকার করে আসার জমাতে চেষ্টা করল। সুবিধে হল না। তারপর কুমুদকে ধরে পড়ল, ‘দুটো টাকা দে সাপ ধরা শিখিয়ে দেব।’
দুটো টাকার তখন মেলা দাম। কুমুদ রাজি হল না। হতাশ হয়ে বাবাজি তখন নাট মণ্ডপে। শুয়ে ভোঁস-ভাঁস করে ঘুমোতে লাগল।
এমনই কপাল, ঠিক সেই সময়েই একটা গোখরো সাপ বেরোল মন্দিরের দক্ষিণ কোণে। সাপ! সাপ!
বাবাজি চেঁচামেচিতে উঠে পড়ল। তারপর এলেম দেখাল বটে।
সাপটা সবে নাট মন্দিরে নীচের ধাপে কিলবিল করে ঘাস জঙ্গলে পালাবার ফিকির খুঁজছিল, বাবাজি গিয়ে খপ করে লেজে ধরে সেটাকে তুলে ফেলল। অন্তত আড়াই হাতের পাকা গোখরো।
বাবাজি সাপটাকে হাতে ঝুলিয়ে পাকা চোখে সর্বাঙ্গ দেখে নিয়ে বলল , ‘গাভীন আছে। পেট ভরা ডিম।’
চিমটে দিয়ে দুটো বিষদাঁত উপড়ে সাপটাকে ফের ঘাস জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে কুমুদের দিকে চেয়ে বলল , ‘সবক’টা ডিম ফুটে যখন বাচ্চা বেরোবে তখন গরমের সময় ঘাসে পা দিতে পারবি না, ঠুকে দেবে।’
সাপের ভয় কুমুদের তেমন নেই। জন্মাবধি সাপখোপ নিয়েই বসবাস। তবে বাবাজি বেশ খপ করে সাপটাকে ধরে ফেলল তাতে সে বুঝল, বাবাজি এলেমদার লোক।
দুটো টাকা কবুল করে সে বাবাজির কাছে সাপ ধরা শিখিল দু-দিন ধরে। অবশ্য দু-টাকায় হল না। গাঁজার পয়সা, ভাতের ভাগও দিতে হল।
অভাবে পড়লে কুমুদ সাপ ধরে বেচে দিয়ে আসত গঞ্জে। বিষ আর চামড়া দুইয়েই কিছু দাম আছে। তবে তেমন কিছু নয়।
বুড়ো পুরুতের মেয়ে পুতুলকে কু-প্রস্তাব দিয়েছিল বলে যে কী ঠ্যাঙানটাই না ঠ্যাঙাল গাঁয়ের মোড়ল মাতব্বররা। হেনস্তার আর শেষ ছিল না। ভেবে দেখলে কুমুদ কাজটা খারাপই করেছিল। পুতুল বড় ভালো মেয়ে।
ঠ্যাঙানিটা খেয়েছিল বিকেল বেলায়। মেরে গাঁয়ের বাইরে একটা গাছতলায় টেনে ফেলে দিয়েছিল তাকে। জ্ঞান যখন ফিরল তখন অনেক রাত। গায়ে গতরে সাংঘাতিক ব্যথা। চোখেও ভালো দেখছে না। কিছুক্ষণ জিরিয়ে কুমুদ ফের গাঁয়ে ঢুকল। সোজা কালীমন্দিরে গিয়ে কালীর নথ আর দু-চারটে বাসন নিয়ে চম্পট দিল। নথটা সোনার, জানা ছিল কুমুদের।
এর পরের ঠেকটা বেশ ভালোই জুটে গেল কুমুদের। মানুষের মেলায় একটা চপের দোকানে সে তখন জোগানির কাজ করে। সেদ্ধ আলু মাখে, নেড়ো বিস্কুট গুঁড়ো করে উনুনে হাওয়া দেয়, খদ্দেরকে চপ কাটলেট পরিবেশন করে, পাতা ফেলে। মেলায়-মেলায় ঘুরতে হয়। দোকানের মালিক তোক তেমন সুবিধের নয়, একটু খেকি গোছের। নানুরের মেলায় এক খদ্দেরের নতুন শালে চা চলকে পড়ায় মালিক উঠে এসে দু-তিনটে থাপ্পড় কষালে। কিন্তু শালওয়ালা লোক ভালো। প্রথমে গালাগাল করলেও মারধর দেখে সে-ই এসে মেটাল। কুমুদের খুব দুঃখ হয়েছিল সেদিন। মালিক চড় থাপ্পড় দিয়েও ক্ষান্ত থাকেনি, জবাবও দিয়েছিল। মালিকের সন্দেহ ফাঁক পেলেই কুমুদ পয়সা সরায়। ক’দিন ধরেই তাড়াব তাড়াব করছিল। তা মালিকের দোষ নেই। পয়সা কুমুদ সাত বটে।
দোকান থেকে বেরিয়ে ফ্যাফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কুমুদ। হঠাৎ সেই শালওয়ালার সঙ্গে দেখা।
‘এই যে খোকা–তোমাকে কি লোকটা তাড়িয়ে দিল?’
‘হ্যাঁ। আপনার জন্যেই তো, চায়ের দাগ দুধ দিলেই উঠে যায়। ঝুটমুট আমার চাকরিটা খেলেন।’ শালওয়ালা ভারী অপ্রস্তুত। বলল , ‘তা বটে, তাহলে আর কী করা। চলো, আমার সঙ্গে, মানুষকে নিরাশ্রয় দেখলে আমার ভারী কষ্ট হয়।’
তা সেই শালওয়ালার বাড়িতে কয়েদিন তোফা কাটল কুমুদের। আসলে শালওয়ালার তিনকুলে কেউ নেই। হরিগঞ্জ গাঁয়ে বেশ বড় বাড়ি। অবস্থাও ভালো। লোকটা ইস্কুলে মাস্টারি করে। আর নানা বায়ু আর বাতিকে ভোগে। ঘন–ঘন হোমিওপ্যাথি ওষুধ খায়। কোথায় পয়সা রাখে তা বেবাক ভুলে যায়। দুটো চাকর আর-এক জন রান্নার লোক যে কেন লাগে কে জানে!
সে বাড়িতে থেকে বেশ দু-পয়সা আয় হতে লাগল কুমুদের। খ্যাঁটের বন্দোবস্তও বেশ ভালো। আর দুটো চাকর, রান্নার লোক আর কুমুদ চারজনই হাত লাগাত। বেশ জমে গিয়েছিল চারজনে।
