ল্যাংটার নেই বাটপাড়ের ভয়। লেংটি পরে শ্বশুর বাড়ি যেতে একটু লজ্জা ভাব ছিল তার। হিমালয়ের কথা ভেবে সেটা ঝেড়ে ফেলল। সে যখন সাধুই হয়ে যাচ্ছে আর আমাশাতে মৃত্যু যখন লেখাই আছে কপালে, তখন আর ভয়টা কীসের?
শ্বশুর বাড়ির ঝুমকো লতায় ছাওয়া ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে সে একটানা পেল্লায় হাঁক ছাড়ল, ‘জয় শিব শস্তো।’
কাজ হল। একটা ঝি গোছের বয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এসে ‘ওম্মা গো’ বলে চেঁচিয়ে ভিতর বাড়িতে পালিয়ে গেল।
তারপর বেরিয়ে এল পরেশ পাল নিজে। বুকটা একটু কেঁপে উঠল কুমুদের।
‘এখানে সুবিধে হবে না বাবাজি, সরে পড়ো।’ কুমুদ কটমট করে তাকিয়ে বলল , ‘পাপী, পাপী!’ পরেশ পাল একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে মিইয়ে গেল। বলল , ‘বাড়িতে অসুখ আছে বাবাজি, অসুখ থাকলে ভিক্ষে দিতে নেই।’
কুমুদ কিছুদিন যাত্রা করেছিল। রাবণ রাজার হাসিটা এবার হাসল সে। হাঃহাঃহাঃ।
তারপর বলল , ‘মরবি-মরবি ঝাড়ে বংশে মরবি।’ এই বলে পিছু ফিরতেই পিছনে একটা নারী কণ্ঠের আর্তনাদ শুনতে পেল সে, দাঁড়াও বাবাজি, যেও না।’
কুমুদ ফিরে দেখল তার শাশুড়ি! বেশ টসকালো চেহারা। হাতজোড় করে বলল , ‘বাড়িতে অশান্তি বাবা। আমার পনেরো বছরের মেয়েটা সদ্য বিধবা হয়ে শয্যা নিয়েছে।’
কুমুদ এমন হাঁ হয়ে গেল যে বলার নয়। বিধবা মানে? সে জলজ্যান্ত বেঁচে থাকতে রামী বিধবা হোল কোন সুবাদে?
সে হুঙ্কার ছেড়ে বলল , ‘বটে! তা কী করে টের পেলি যে তোর মেয়ে বিধবা?’
‘জামাইয়ের দুই বন্ধু ছিল ভকু আর কালু। তারাই কাল বলে গেল কিনা, জামাই নাকি মরেছে।’
‘ডাক দেখি তোর মেয়েকে। এরকম তো হওয়ার কথা নয়?’
‘ডেকে আনাই বাবা। বসো।’
শাশুড়ি গিয়ে রামীকে ধরে-ধরে নিয়ে এল। রামীর পরনে ধুতি, মুখখানা নামানো, চোখের কোলে অনেক কান্নার চিহ্ন।
ভারী খুশি হয়ে পড়ল কুমুদ। আনন্দে ঠ্যাং নাচাতে লাগল সে। পরেশ পাল তাকে স্বীকার না করলে কী হবে। তার মরার খবরে মেয়ে তো বিধবা হল? তবে? হেঃ-হেঃ তাহলে এখনও তার দাম আছে। সবাই তাকে ঝেড়ে ফেলে দেয়নি।
আর রামীকে দেখেও ভারী খুশি লাগছিল তার। তেমন রূপসি কিছু নয় বটে, তবে বয়সের টানে চেহারাখানা দিব্যি হয়েছে। ছিপছিপে আঁটো গড়ন। মুখখানা ভারী মিষ্টি।
পরেশ পাল অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ দেখছিল, লক্ষ্য করেনি কুমুদ। হঠাৎ চোখে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। বলল , ‘কল্যাণ হোক, আমি চলি।’
পরেশ যদি চিনতে পারে তাহলে হয়তো ব্যাপারটা কেঁচে যাবে। এরকমই থাক। সে বরং হিমালয়ে গিয়ে সত্যি মরাই মরবে। এটুকু তো জানা গেল যে, তার অভাবে দুনিয়ায় অন্তত একজনও বিধবা হয়ে কান্নাকাটি করেছে।
কুমুদ একটু জোরেই হাঁটা দিয়েছিল। কিন্তু মাধবী লতার ফটক পেরিয়ে আমবাগানে পড়তেই পরেশ পাশ ধরে ফেলল তাকে।
‘এই যে বাজাজি।’
কুমুদ সভয়ে বলল , ‘কাকে বলছিস?’
‘তোমাকেই হে। চিনতে পেরেছি।’
‘চিনে আর লাভ নেই। আমি সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে যাচ্ছি।’
পরেশ খপ করে হাতখানা চেপে ধরে বলল , ‘ঘাট হয়েছে বাপু। ফিরে চল।’
কুমুদ চোখ পাকিয়ে বলল , ‘কোথায় ফিরে যাব আমার কি যাওয়ার জায়গা আছে?’
পরেশ একটু থতমত খেয়ে বলল , ‘ইয়ে এখন না হয় আমার বাড়িতেই চলো। পরে না হয়—‘
‘পরে তো হিমালয়। না গো পরেশবাবু, সুবিধে হবে না-মেয়েকে তোমার বিধবা বলেই ধরে নাও।’
‘পায়ে ধরছি বাপু। আমি তোমার গুরুজন, তবু ধরছি।’
‘ব্যবস্থাটা কী হবে?’
‘ঘরজামাই রাখব।’
‘বটে! শেষে ঘরজামাইকে চাকর মুনিষের অধম করে খাটাবে না তো। গরু চরানো, গোয়াল পরিষ্কার করা, খড় কাটা, মাঠের কাজ এসব?’
‘আরে না। ভেবেই রেখেছি, তুমি হবে আমার ধানকলের ম্যানেজার। চলো।’
কুমুদের হঠাৎ ভারী লজ্জা করল। বলল , ‘লেংটি পরে যাব?’ পরেশ ধমক দিয়ে বলল , ‘এতক্ষণ তো দিব্যি ছিলে। নাও বরং আমার আলোয়ানখানা একটু ঝুল রেখে জড়িয়ে নাও। লোক পাঠিয়ে ধুতি জামা সব আনাচ্ছি।’
গর্ভনগরের কথা
লিফটের দরজার কাছে এক বুড়ো মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। একা। লিফটের দরজা খোলাই রয়েছে। ওপরে যাওয়ার যাত্রী আজকাল আর নেই। কিন্তু সীমন্তককে যেতেই হবে। ওপরেই তার কাজ।
আজ সকাল থেকে সীমন্তক খুশিই রয়েছে। খুশি হওয়া খুব বিচিত্র নয়। কারণ আজ সকালের রেশনেই সে পেয়েছে আধবুড়ি পালং শাক আর দু-মুঠো কড়াইশুটি। কী সবুজ! কী সবুজ! কৃত্রিম খাবার আর ভিটামিন আর ধাতব ট্যাবলেট খেয়ে-খেয়ে জিভ অসাড়। বহুকাল পরে সে আজ সবজে টাটকা তরকারি খেল। কড়াইশুঁটির খোসাগুলোও সে ফেলে দেয়নি, পালং শাকের শেকড়টুকুও।
খোশমেজাজে লিফটে উঠবার মুখে সে বৃদ্ধের করুণ চাউনি দেখে হাসিমুখে জিগ্যেস করল–ওপরে যাবেন নাকি?
–নেবেন?
সীমন্তক মাথা নাড়ল–আসুন।
বুড়োকে চেনে সীমন্তক। প্রায়ই এখানে সেখানে দেখা হয়। বয়স বোধহয় দুশো পঁচাত্তর বছর। আসলে এইসব বুড়ো মানুষেরা হল প্রদর্শনীর বস্তু। মানুষের বিজ্ঞান কতদূর কী করতে পারে এ হচ্ছে তারই এক উদাহরণ। যে কজন এরকম প্রবৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের বেশিরভাগেরই অভ্যন্তরীণ যন্ত্রপাতির অনেক অদল-বদল ঘটে গেছে। কারও বুকে অন্যের হৃদযন্ত্র, কারও ফুসফুস কৃত্রিম, কারও পাকস্থলী কেটে বাদ দিয়ে কৃত্রিম পাকযন্ত্র বসানো হয়েছে, কারও ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে মস্তিষ্ক। আর এইভাবেই এঁদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। তবে বেশিরভাগেরই স্মৃতি ধূসর, বোধ বা বুদ্ধি খুবই ক্ষীণ, আচরণ অনির্দিষ্ট। সীমন্তক এঁদের এড়িয়েই চলে। কিন্তু আজ সে বড় খোশমেজাজে আছে, তাই বৃদ্ধকে উপেক্ষা করল না।
