“আজ্ঞে আপনাকে দেখে ভয় খেয়ে ঐদিকের একটা আমগাছে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠে বসে আছে। বড্ড ভীতু।”
দারোগাবাবু করাল চোখে চেয়ে বললেন, “আর নরবলি যাকে দিবি সে-লোকটা কোথায়?”
কাঁপালিক কেঁদে উঠে বলল, “কোথায় নরবলি হুজুর! কত লোককে সাধ্য সাধনা করলাম, পায়ে ধরলাম, ভয় দেখালাম, কেউ রাজি হলো না। তাদেরও দোষ দিই না, বলি হতে কে-ই বা সহজে রাজি হয়! হুজুর, বলির কথা না রটালে লোকে সমীহ করে না। তাই রটিয়েছিলাম। কিন্তু আমি আসলে কাঁপালিক-টাপালিক নই হুজুর, আমাকে চিনতে পারছেন না! আমি সেই রিং মাস্টার।”
রিং মাস্টার! সবাই হাঁ হয়ে গেল। তাই তো! দাড়িগোঁফের জঙ্গল ভেদ করে রিং মাস্টারকে তো চেনা যাচ্ছে একটু-একটু। রিং মাস্টার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হারু মণ্ডলের গুণ্ডা গরুর তাড়া খেয়ে আমার বাঘটা সেই যে পালিয়েছিল তাইতে আমার আর বাঘের খুব বদনাম হয়ে যায়। তাই সার্কাস থেকে আমাদের তাড়িয়ে দেয়। সেই থেকে খিদের জ্বালায় দুজনে জ্বলে পুড়ে মরছি। নরবলি-টলি ওসব বাজে কথা, আমরা দুজনেই ভারী ভীতু জীব বড়বাবু।”
দারোগাবাবু হাসলেন। না, ঠিক হাসি নয়। তবে তার ভুরু চমকাল, কানটা যেন নড়ে উঠল, গোঁফের ডগা নীচু থেকে ওপরে উঠে গেল। হাসলেন না, তবু যেন হাসলেন। টর্চের আলোয় সবাই দেখল।
রিং মাস্টার আর তার বাঘকে গ্রেফতার করে আনা হলো থানায়। লোক ভেঙে পড়ল দেখতে। রিং মাস্টারের দাড়ি চুল সব কামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কদমগাছের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা বাঘটা লজ্জায় থাবায় মুখ লুকিয়ে মাথা নীচু করে বসে আছে।
হারু মণ্ডল দারোগাবাবুকে প্রণাম ঠুকে বলল, “হুজুর, আমার একটা আর্জি আছে আপনার বরাবর। আমার ভগবতী কিছু খেতে চায় না। খেলার সঙ্গী নেই বলে দৌড়-ঝাঁপ করতে পারে না। তাই খিদে হয় না। গাঁগঞ্জের ষাঁড় গরু সবাই ওকে ভয় খায়, তাই কেউ মেশে না ওর সঙ্গে।
তাই বলি, হুজুর, বাঘটা আমার দিয়ে দিন। ভগবতী ওকে ঢুঁ মেরে মেরে খেলবে। তাতে ওর খিদে হবে। আমি বরং বাঘের দাম বাবদ একশো টাকা ধরে দিচ্ছি।”
তো তাই হলো। হারু মণ্ডল দড়ি বেঁধে বাঘটাকে টানা-হাচড়া করে নিয়ে গেল। পথে লোকজনকে ডেকে ডেকে বলল, “সস্তায় বাঘ কিনলাম হে।”
কিন্তু ভগবতী মোটা হয়ে যাওয়ার পর থেকে খুব অলস হয়ে পড়েছিল। বাঘটাকে দেখেও তেড়েটেড়ে গেল না, কেবল একটা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। সেই শ্বাসের শব্দে বাঘটা পালাতে যাচ্ছিল, হারু মণ্ডল তাকে খড়মপেটা করে টেনে আনল ফের। ভগবতীর গোয়ালেই বেঁধে রাখল কে।
সেই থেকে বাঘটা গোয়ালেই থাকে। মাছের কাটা বা মাংসের হাড়মাখা ভাত খায়। মাঝে মাঝে ভগবতীর জাবনার গামলাতেও মুখ দিয়ে বিস্বাদে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবু চেষ্টা রাখে। ভগবতী স্নেহভরে মাঝে-মাঝে বাঘটার গা চেটে দেয়। বাঘটা থাবা দিয়ে ভগবতীর পিঠ চুলকোয়।
দেশসুদ্ধ লোক ভেঙে পড়ে দেখতে। হুঁ বাবা, বাঘে গরুতে এক গোয়ালে থাকে! দুকড়ি কবিয়াল গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়ায়, “বিধুর নামে দাওরে জয়ধ্বনি। বিধু মোদের নয়নের মণি।। ভগবতীর নামে দাও গো জয় জোকার। তাঁর গোহালে বাঘের কারাগার।। জয় জয় বিধু ভাগ্যবান। রাতির বেলায় দিনের আলো, দিনে জ্যোৎস্নার বান…।।”
শুনে বিধু দারোগা হাসেন। না, হাসি নয় ঠিক। তার গোঁফের ডগায় যেন হাসি দোল খায়, চোখের মণির ভিতরে যেন ঝিকমিক করে, ভুঁড়িটা কেঁপে ওঠে, নাকের ডগা নড়ে, কান দুটো ফড়িঙের পাখনার মতো থিরথির করে ওঠে। হাসেন না। তবু যেন হাসেন।
বিধুবাবুর গাড়ি
বিধুবাবুর একখানা পুরোনো মডেলের অস্টিন গাড়ি আছে। স্পেয়ার পার্টস পাওয়া কঠিন। প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে। বুড়ো মিস্ত্রি ইরফান সারিয়ে টারিয়ে দেয় বটে, কিন্তু প্রায়ই বলে, এ গাড়ি আর বেশি দিন নয়। গাড়িটা তাঁর বাবার। বড় মায়া। গাড়িটা বেচে দিলে হয়তো কয়েক হাজার টাকা পাওয়া যাবে। কিন্তু ওই মায়ার জন্যই পারেন না। পথে ঘাটে গাড়িটা নিয়ে মাঝে মাঝে খুবই বিপদে পড়তে হয়। বাড়িতেও অশান্তি হচ্ছে খুব।
সেইরকম একটা বিপদে পড়লেন আজ। মফস্বল থেকে কলকাতা ফিরছেন। রাত ন’টা বেজে গেছে। জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ তোড়ে বৃষ্টি এল। এমন বৃষ্টি যে দু’হাত দূরের কিছু দেখা যায় না। ওয়াইপারটা কিছুক্ষণ চলে বন্ধ হয়ে গেল। ইঞ্জিনে জল ঢুকে সেটাও গেল থেমে। বাড়ি এখনও ঘণ্টা খানেকের পথ। গাড়ির মধ্যে জল ঢুকে সেটাও গেল থেমে। গাড়ির মধ্যে বসে বিধুবাবু দুশ্চিন্তায় এতটুকু হয়ে গেলেন। ও যা বৃষ্টি সহজে থামবে না। মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যে চারদিকে জল দাঁড়িয়ে যেতে লাগল।
অসহায় বিধুবাবু চুপ করে বসে রইলেন। গাড়িটারই দোষ সন্দেহ নেই। কিন্তু বিধুবাবু গাড়ির ওপর রাগ করলেন না। গাড়িটার বয়স হয়েছে, যন্ত্রপাতিরও অমিল, কী আর করা যাবে? তিনি স্টিয়ারিঙে নরম করে হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি আমার অনেক দিনের বন্ধু, তোমাকে কি ছাড়তে পারি?
কথাটা বলার কারণ আছে। তার বন্ধু-বান্ধব শুভানুধ্যায়ীরা অনেকদিন ধরেই গাড়িটা বেচে দেওয়ার কথা বলেছে। ইদানীং বিধুবাবুর স্ত্রীও খুব ধরেছেন গাড়িটা বেচে দেওয়ার জন্য। একজন বড়লোক নাকি এটিকে ভিন্টেজ কার হিসাবে কিনতে চান। বেশ ভালো দাম দেবেন। এই নিয়ে বিধুবাবুর সঙ্গে তাঁর গিন্নির রোজই ঝগড়া হচ্ছে। বিধুবাবুর স্ত্রী গাড়িটা বিদায় করার জন্য এতই অস্থির হয়ে পড়েছেন যে, হবু খদ্দেরের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা অবধি নিয়ে ফেলেছেন। বিধুবাবুর আরও দু’খানা নতুন ঝকঝকে গাড়ি আছে। সুতরাং পুরোনো গাড়িটার যে আর দরকার নেই, এটাই বাড়ির লোকের অভিমত।
