বিধুবাবু অচল গাড়ির মধ্যে বসে ভাবছেন, গাড়িটাকে কী করে হস্তান্তর থেকে বাঁচানো যায়। কোনো উপায় তার মাথায় আসছে না। এই যে গাড়িটা খারাপ হলো, এর ফলে আজ রাতে তিনি হয়তো বাড়িতে ফিরতে পারবেন না। তার ফলে পুরোনো গাড়ির বিরুদ্ধে বাড়ির লোকের অভিমত আরও জোরদার হবে। বিধুবাবু অন্ধকার গাড়ির মধ্যে বসে বিষণ্ণ মনে গাড়িটার ভবিতব্য নিয়েই ভাবতে লাগলেন।
হঠাৎ তার মনে হলো, অন্ধকারে একটা আলো জ্বলে উঠেই নিবে গেল। না, বিদ্যুতের আলো নয়। অনেকটা টর্চের আলোর মতো, তবে অনেক বেশি জোরালো। মনে হলো আলোটা এল ওপর থেকে। বিধুবাবু একটু ভাবিত হলেন। নির্জন রাস্তা, জঙ্গল, বিপদ হতে কতক্ষণ?
এরপর বিধুবাবু টের পেলেন, তাঁর গাড়িটা একটা বেশ বড় রকমের আঁকুনি খেল। ঠিক যেন, গাড়ির ছাদে একটা ভারী জিনিস এসে পড়ল। গাড়ির কাঁচ তোলা, বিধুবাবু কাঁচটা একটু নামিয়ে গলা তুলে বললেন, কে রে? কে গাড়ির ছাদে?
কেউ জবাব দিল না। কিন্তু একটু বাদেই গাড়ির ছাদ থেকে একটা কে যেন লাফ দিয়ে নেমে এল। বিধুবাবু গাড়ির গ্লাভস কম্পার্টমেন্ট থেকে টর্চ বের করে জ্বাললেন। তারপর স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
যা দেখলেন তার চেয়ে বিস্ময়কর বস্তু আর কিছু হতে পারে না। এই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে একটা ডল পুতুল রাস্তায় দাঁড় করানো রয়েছে। প্রায় দুই ফুট উঁচু ফুটফুটে একটা মেয়ে-পুতুল। কিন্তু যেটা অবাক কাণ্ড সেটা হলো, পুতুলটা তার দিকে চেয়ে একটা হাত তুলে নাড়ছে। তাকে যেন কিছু বলতে চায়। তা বিদেশে কলের পুতুল অনেকদিন আগেই বেরিয়ে গেছে। এটা সেরকমই একটা রিমোট কন্ট্রোল পুতুল কি? হলেই বা এই জঙ্গলে বৃষ্টির মধ্যে এটা এল কোথা থেকে?
বিধুবাবু একটু ভয় খেলেন। ঘটনার পিছনে কোনও ষড়যন্ত্র নেই তো! থাকলেও তার উপায় নেই। তিনি জানলার কাঁচটা নামালেন।
পুতুলটা তুমুল বৃষ্টির শব্দের মধ্যেই বলল, তুমি চিন্তা করো না। চুপচাপ বসে থাকো।
বিধুবাবু একটু কাঁপা গলায় বললেন, তুমি কি পুতুল?
হ্যাঁ, আমি কলের পুতুল।
আমার কথা বুঝতে পারছো কেমন করে? পুতুল কি কথা বুঝতে পারে?
আমরা অন্য জগতের পুতুল।
তার মানে?
আমরা যন্ত্রগ্রহের পুতুল।
বুঝলাম না। বুঝিয়ে বলো।
পুতুলটা গুটগুট করে এগিয়ে এল। তারপর লাফ দিয়ে জানলার ওপর উঠে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে বলল, সব কথা কি তুমি বুঝবে?
বিধুবাবু সিঁটিয়ে গিয়ে বললেন, আমি বুঝবার চেষ্টা করব।
একান্ন আলো-বছর দূরে একটা গ্রহ আছে। সেখানে ঠিক আমাদের মতো দেখতে মানুষেরা বাস করে। তারাই আমাদের তৈরি করেছে। আমরা কলের পুতুল কিন্তু তারা সব মানুষ। মানুষগুলো একটু কুঁড়ে। আমাদের দিয়ে সব কাজ করায় আর নিজেরা কেবল বিশ্রাম করে, আর ফুর্তি করে।
বিধুবাবু খুব অবাক হয়ে বললেন, এখানে এলে কী করে?
বাঃ, আমাদের বুঝি গাড়ি নেই? আমরা তো প্রায়ই তোমাদের গ্রহে আসি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ গো। আমাদের গ্রহের মানুষেরা খুব শৌখিন। সেখানকার শাকপাতা খেয়ে তারা খুশি নয়, নতুন নতুন জিনিস চায়। তাই আমরা ঘুরে ঘুরে তাদের জন্য শাকপাতা, ভালো মাছ, মাখন, মুরগি, ঘি, দুধ, মিষ্টি, চকোলেট নিয়ে যাই। শুধু তোমাদের গ্রহ নয়, অন্য সব গ্রহ থেকেও অনেক জিনিস আনি। কিন্তু সেগুলো কী জিনিস তা তুমি বুঝবে না।
বিধুবাবু কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে বললেন, এখানে এই বৃষ্টির মধ্যে এলে কি করে?
ওই তো কাণ্ড! আমাদের গাড়িটা ওই জঙ্গলের মধ্যে খারাপ হয়ে গেল যে। তখনই আমরা তোমাকে দেখলাম। আমরা কলকজা খুব ভাল জানি। গাড়িটা আমরা সারিয়ে ফেলেছি। এবার চলে যাবো। তোমাকে দেখে একটু মায়া হলো। ভাবলাম তোমার গাড়িটাও সারিয়ে দিয়ে যাই। আহা, কত পুরোনো আমলের গাড়ি।
তুমি বাংলা বলছো যে! ওমা! বলব না? প্রায়ই আসি যে। শুনতে শুনতে শিখে গেছি। আমরা যে অন্য গ্রহের পুতুল তা তো কেউ বুঝতে পারে না। ধরা পড়ার ভাব দেখলেই আমরা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারি।
বিধুবাবু একটা স্টোক গিলে বললেন, আমার গাড়ির ছাদে কী একটা রয়েছে বলো তো!
পুতুলটা হেসে বলল, আমাদের গাড়িটা। আমার বন্ধুরা তোমার গাড়িটা একটু দেখে নিচ্ছে। এখনই কাজ শুরু করবে।
বলতে বলতেই ঝুপ ঝুপ করে দশ-বারোটা ছেলে এবং মেয়ে পুতুল ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। হাতে নানারকম যন্ত্রপাতি, তারা বনেট খুলে ফেলে গাড়ির ইঞ্জিনের ভেতর ঢুকে পড়ল।
বিধুবাবু দুঃখের সঙ্গে বললেন, এ গাড়িটাকে আমি বড় ভালবাসি। কিন্তু তুমি তো জানো না, এ গাড়ি বেশিদিন রাখতে পারব না। সবাই বলছে বেচে দিতে।
পুতুলটা হাসল, তুমি যে গাড়িটাকে ভালবাস তা আমরা জানি। তোমার মনের ভাব আমাদের সূক্ষ্ম যন্ত্রে ধরা পড়েছিল। যারা যন্ত্রকে ভালবাসে তাদের আমরাও ভালবাসি। যন্ত্র নিপ্রাণ বটে, কিন্তু ভালবাসা সেও ঠিক টের পায়, ভালবাসার শক্তিই আলাদা, কী বলে?
বিধুবাবু দুঃখের সঙ্গে বললেন, তা তো বুঝলাম। কিন্তু ভালোবাসা দিয়েও কি গাড়িটাকে বাঁচাতে পারব? তোমরা না হয় আজ সারিয়ে দিলে, দুদিন পর আবার খারাপ হবে।
পুতুলটা মাথা নেড়ে বলল, আর খারাপ হবে না।
কোনোদিনও না?
পুতুলটা হেসে বলল, খারাপ তো হবেই না, এমনকি এখন থেকে আর গাড়িতে পেট্রল নিতে হবে না। ব্যাটারি বদল হবে না, চাকায় হাওয়া দিতে হবে না। লক্ষ লক্ষ মাইল চললেও না।
