তখন কিছুদিনের জন্য ভগবতী গরু বিধু দারোগার কথা ছাড়া লোকের মুখে অন্য কথা নেই। বিক্রি মন্দা বলে সার্কাসওলা তাবু গুটিয়ে পালিয়েছে। কাছেপিঠে আর বাঘ-ভালুকও নেই যে ভগবতী গিয়ে গুঁতোবে। খেতে খেতে চোয়াল ব্যথা।
বিধু দারোগার দশাও তাই। চোর নেই, ডাকাত নেই। শুয়ে বসে গতরে জং ধরে গেল। লোকে রোজ পাঠা, মুরগি, ডিম, তরি-তরকারি, মাছ দিয়ে যায়। খেতে-খেতে খিদে মরে গেছে। বহুকাল আর খিদে পায় না বিধু দারোগার। খাবার দেখলে হাই ওঠে। দারোগার ঘোড়াটার পর্যন্ত পায়ে চর্বি জমেছে। নিয়মমাফিক রোজ একবার বিধু দারোগা ঘোড়ার পিঠে চড়ে গঞ্জে চক্কর মারেন। নাঃ, কোথাও কোনো হাঙ্গামা হয়নি। বিরক্ত হয়ে ফিরে এসে থানার দাওয়ায় বসে গম্ভীরভাবে হুঁকো টানেন তিনি।
একদিন সকালে একটা লোক আধমন ওজনের একটা পাকা রুইমাছ নিয়ে এসে দারোগা সাহেবকে প্রণাম করে হাতজোড় করে সামনে বসল। বিধু দারোগা প্রকাণ্ড মাছটা দেখে অরুচিতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লোকটা ভাবল, দারোগা সাহেবের বুঝি এত ছোটো মাছ পছন্দ হয়নি, তাই ভয় খেয়ে মিনমিন করে বলল, “বড়বাবু, আমার পুকুরে এর চেয়ে বড় মাছ। আর নেই। আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আমার মাছটাও পুঁটিমাছের মতো ছোটো, তবু যদি আপনার ভোগে লাগে তো–।”
বিধু দারোগা ফস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, “খিদে পায় না যে বাপ, আমার যে আর খিদে পায় না। বড্ড অরুচি।”
লোকটা ফের একটা প্রণাম করে বলে, “বড়বাবু, অপরাধ নেবেন না, তা যদি বললেন তো বলি, ঠাকুর দেবতারাও কোন জন্মে অমৃত খেয়ে গাট হয়ে বসে আছেন, খিদে তো তাদেরও পাওয়ার কথা নয়। তবু কি লোকে ভোগ নৈবিদ্যি দিতে ছাড়ে? ভক্তদের মুখ চেয়েই তারা অরুচি নিয়েও খান। আমি তো বুড়ো হতে চলোম, তবু জন্মেও শুনিনি যে রাজা-জমিদার কিংবা লাট বা দারোগার কখনো খিদে পেয়েছে। খিদে তাদের কখনো পায় না, দেবতুল্য লোক সব। তবু খেতে হয়, আমাদের মুখ চেয়েই! আমাদের মতো ছোটোলোক হাঘরেদেরই যত খিদে হুজুর।”
লোকটা লাট আর দারোগা একসঙ্গে বলায় দারোগাসাহেব খুশি হলেন। একটু হাসলেন। না, ঠিক হাসি নয় বটে তবে টাকটা যেন একটু চকচক করে উঠল, গালের মাংসে একটু ঢেউ দিল, ভুঁড়িটা কয়েকবার কেঁপে উঠল। হাসি নয়, অথচ যেন হাসি। আবার একটা শ্বাস ফেলে বললেন, “খিদেই বা পাবে কী করে! নড়াচড়া নেই, কাজকর্ম নেই, একেবারে পাথর হয়ে গেলাম। ছ্যাঃ ছ্যাঃ, তোরাই বা সব কেমনধারা মানুষ, দারোগাবাবুর খিদে পায় না শুনছিস, সেজন্যও তো একটু শখ করে চুরিচামারি করতে পারিস। চোর-ছ্যাচড়ের পিছনে হাঁকডাক দৌড়োদৌড়ি করতে করতে আমারও একটু খিদের মতো হয় তাহলে। কেমন নির্দয় মানুষ তোরা, অ্যাঁ?”
শুনে লোকটা কান পর্যন্ত হাসল। ফের একটা প্রণাম ঠুকে বলল, “আজ্ঞে বড়বাবু, সেই জন্যই আসা। সফরগঞ্জে শ্মশানের ধারে কসারবনের মধ্যে বুড়ো বটের তলায় এক কাঁপালিক এসে থানা গেড়েছে ক দিন হলো। বড় সাঙ্ঘাতিক লোক। বাঘের পিঠে চড়ে ঘুড়ে বেড়ায়। শুনছি, আজ অমাবস্যার রাতে সেখানে নরবলি হবে। বড় ভয়ে-ভয়ে আছি আমরা।”
শুনে বিধু দারোগা একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “বটে?”
সেই হুঙ্কারে গঞ্জের বাড়িঘর কেঁপে উঠল, ঘোড়াটা চিহি ডেকে লাফিয়ে উঠল, ধারেকাছের লোকজন সব সাঁত সাত করে লুকিয়ে পড়তে লাগল, বাচ্চারা ককিয়ে উঠল, বেড়াল পালাল, কুকুর কেঁদে উঠল, আর কাকগুলো বন্দুকের আওয়াজ ভেবে কাকা করে ভিড় করতে লাগল আশেপাশে। যে লোকটা মাছ নিয়ে এসেছিল তারও একটু মূৰ্ছামতো হয়েছিল, খানিকক্ষণ পরে সামলে উঠে সে চোখ মেলে বড় সুখে হাসল। হ্যাঁ, এই হলো গিয়ে আসল দারোগা। আবার একটা প্রণাম করল সে।
অমাবস্যার নিশুতি রাতে দারোগাবাবু ঘোড়ায় চেপে সফরগঞ্জের শ্মশানে চললেন সঙ্গে বিস্তর সিপাই, অনেক লোকজন। তাদের হুঙ্কারে শেয়াল পালাল, পাখিরা ঘুম ভেঙে চেঁচামেচি করতে লাগল। খটাস, ভাম, বেঁজি, খরগোশ সব জঙ্গলের ছোটো ছোটো জীব গর্তে সেঁদিয়ে কাঁপতে লাগল। বিধু দারোগা বুড়ো বটগাছের তলায় এসে হাঁক ছাড়লেন, “কোথায় কাঁপালিক?”
কাপালিক নেই। দারোগাবাবু পাঁচ ব্যাটারির টর্চ জ্বেলে দেখলেন, খবরটা মিথ্যে নয়। নিভু নিভু হয়ে একটা ধুনি তখনো জ্বলছে, আশেপাশে বাঘের পায়ের ছাপও দেখা গেল, একটা চকচকে খাঁড়া পড়ে আছে, একপাশে একটা হাঁড়িকাঠও রয়েছে। দারোগাবাবু পিস্তল বের করে ফের হাঁক দিলেন, “কোথায় গেল সেই হারামজাদা কাঁপালিকটা?”
তাই তো! কোথায় পালাল! সবাই ভাবছে।
এমন সময়ে গাছের মগডাল থেকে করুণ স্বরে কে যেন বলে উঠল, “হুজুর আমি এইখানে। ভয়ের চোটে বড় উঁচু গাছে উঠে পড়েছি, এখন নামতে পারছি না। বাতিটা একটু ধরুন।”
অবাক হয়ে দারোগাবাবু উঁচুতে আলো ফেললেন। বটগাছের ঝুরি আর পাতার ফাঁক দিয়ে অনেক উঁচুতে কাঁপালিকের লাল কাপড় দেখা গেল, আর দাড়িগোঁফ। দারোগাবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন–নেমে আয়। সিরিঙ্গে চেহারার কাঁপালিকটা সাবধানে নেমে এলো। টর্চের আলো মুখে পড়তেই চোখ পিটপিট করে ভারী ভীতু চোখে চাইল, তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল দারোগাবাবুর ঘোড়ার পায়ের ওপর, বলতে লাগল, “বড়বাবু মাপ করুন।” লোকটার চেহারা আর ভাবভঙ্গী দেখে বিধু দারোগা হতাশ হয়ে বললেন, “তোর বাঘ কই?”
