ওদিকে রিং মাস্টারও সপাসপ চাবুকের শব্দ করে বাঘটার ল্যাজ মলে দিয়ে বলে, “ড্রিঙ্ক, ওয়াটার বেঙ্গল-টাইগার, ড্রিঙ্ক, কাম কাম, হ্যাভ কারেজ, দি কাউ উইল ফ্লাই অ্যাণ্ড শো হার লেজ। ড্রিঙ্ক, ড্রিঙ্ক।”
দারোগাবাবু উঠে ফের হাঁক দিলেন, “দুটোর দড়ি খুলে দে। আপসে জল খাবে।”
তো তাই হলো। হারু মণ্ডল তার গরুটাকে ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে বলল, “কাল থেকে তোকে জল দিইনি মা, দারোগাবাবুর মুখ চেয়ে এতক্ষণ তেষ্টায় কাঠ করে রেখেছি, এবার ঠো করে পেট ভাসিয়ে খা মা।”
রিং মাস্টার তার বাঘকে ছেড়ে দিয়ে বলল, “ইউ হ্যাড নো ওয়াটার ফর টু ডেজ বেঙ্গল, নাউ ড্রিঙ্ক।”
দৃশ্যটা দেখার মতোই। এই আমরা প্রথম দেখলাম জীবনে। একটা গরু আর একটা বাঘ পাশাপাশি ভাই-বোনের মতো দাঁড়িয়ে মুখ নীচু করে এক ঘাটে জল খাচ্ছে। সবাই রৈরৈ করে উঠে দারোগাবাবুর জয়ধ্বনি দিতে থাকল। কবিয়াল দুকড়ি হালদার গান বেঁধে গাইতে লাগল, “ধন্য হে দারোগা বিধু তুমি ধন্য ধন্য হে। একই ঘাটে জল খায় গাই আর ব্যাঘ্র বন্য হে”।
কিন্তু জয়ধ্বনির রেশ তখনো মিলিয়ে যায়নি, দুকড়ি কবিয়াল ‘হে’র টান দিয়ে তখনো দম ধরে রেখেছে, এমন সময়ে বাঘটা জল থেকে মুখ তুলে গরুটার দিকে তাকাল। গরুটাও তাকাল বাঘটার দিকে। ফোঁস ফোঁস দুজনেরই নিশ্বাস পড়ল। বাঘটা গরু চেনে, সে গন্ধ পেয়ে পাশে দাঁড়ানো গরুটাকে শুঁকছে। চোখে ভাল দেখতে পায় না বলে বোধহয় ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না। কিন্তু হারু মণ্ডলের গরু কখনো বাঘ দেখেনি, তাই সে একটুও ঘাবড়াল না। বরং সে বেশ রাগের চোখে বাঘটাকে দেখতে লাগল। সেটা হাড় হারামজাদা গরু, বহুবার খোঁটা উপড়েছে, খোঁয়াড়ে গেছে, তার গুতো খায়নি এমন মানুষ গাঁয়ে বিরল। বাঘটার ভাবসাব দেখে সে বোধহয় বেশ বিরক্ত হয়েছিল, তাই বাঘের মুখের ওপরেই সে ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে একটু এগোলো।
দারোগাবাবু মহানন্দে গোঁফ চুমরে দৃশ্যটা দেখছেন তখন। হাসেন না বটে, কিন্তু হাসি তার চোখের দৃষ্টি, গালের মাংস, আর ভাবভঙ্গীর মধ্যে ফুটে উঠছিল। বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাচ্ছে।
গরুর ফোঁস শুনে বাঘটা দু’পা পিছিয়ে এল। বহুকাল অভ্যাস নেই বলেই বোধহয় হাঙ্গামায় যেতে চাইল না। কিন্তু গরুটাও বদমেজাজী। তার তখন রোখ চেপেছে। সে একটু শিং নাড়া দিয়ে দু পা এগোলো। বাঘটা আবার পিছিয়ে আসে। গরুটা একটা হাম্বা দিয়ে হঠাৎ আড়মোড়া ভেঙে মাথাটা নীচু করে হড়হড় করে এসে হুম্ করে একটা চুঁ দিল বাঘটাকে। বাঘটা মারপিট ভুলেই গেছে। আচমকা টুটা খেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা মেরে আলিস্যি ঝেড়ে দুই লাফে উঠে এল ঘাটের চাতালে। পিছনে গরুটা।
দারোগাবাবু চেয়ার ছেড়ে পৈঠায় উঠে গেলেন সাত করে। লোকে থ। এমনটা হবে কেউ ভাবেনি। এ কী দৃশ্যরে বাবা! প্রকৃতির সব নিয়মকানুন যে ভণ্ডুল হয়ে গেল। বাঘটা তখন দিঘির ধারের মাঠটায় প্রাণভয়ে ছুটছে। হারুর গরু মহাতেজে শিং নেড়ে দৌড়োচ্ছে তার পিছু পিছু। তোবেই। বাঘটা হালুম-মলুম বলে ডাক ছাড়ছে প্রাণপণে। গরুটা হাম্বা-খাম্বা বলে তম্বি করছে তাকে। সে কী দৌড়! যেমন বাঘ ছোটে, তেমনি গরু। ছুটতে ছুটতে বাঘের দমসম অবস্থা। ভারী কাহিল হয়ে পড়েছে বেচারা। হারু মণ্ডল বিস্তর ডাকাডাকি আর সাধাসাধি করে তার গরুকে ফেরাতে চাইছে। গরু ফিরছে না। রিং মাস্টার ডুকরে উঠে বলছে, “ও ভাই হারু, আমার গরিব বাঘটাকে তোমার গুণ্ডা গরু মেরে ফেললে।”
তা ফেলতই মেরে। বাঘটা ছুটে ছুটে হয়রান হয়ে পড়েছে তখন, গরুটা মহাতেজে প্রায় ধরো-ধরো করে ফেলছে তাকে, এমন সময়ে হারু মণ্ডল গিয়ে সটান শুয়ে পড়ল তার ভগবতীর সামনে, বলল, “মা গো, অনেক লীলা দেখিয়েছো মা। অনেক বাঘ-সিংহী ধরে দেবো মা তোমায়, সব কটাকে গুঁতিয়ে ঢিট কোরো। আজ যে তোমার জাবনার সময় হয়ে গেছে মা।”
এইসব শুনে ভগবতী দাঁড়িয়ে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। বাঘটাও ফঁক বুঝে এক লাফে খাঁচায় ঢুকে ঝাঁপের দরজাটা ফেলবার জন্য নিজেই পিছনের দু পায়ে দাঁড়িয়ে টানাটানি করতে লাগল। খাঁচার ওপরের লোক দুজন ঘাপটি মেরে ছিল, তাক বুঝে ঝ করে দরজা ফেলে দিল। বাঘটা নিশ্চিন্ত হয়ে বসে হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাঁফাতে লাগল।
এই ঘটনার পর বিধু দারোগার নাম-যশ সহস্রগুণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল গঞ্জে। তার রাজত্বে শুধু বাঘে-গরুতে একঘাটে জলই খায় না, সেখানে গরুর তাড়ায় বাঘেরও জান লবেজান হওয়ার জোগাড়। সুতরাং সাবধান!
সবাই তাই সাবধান হয়ে গেল। চুরি ছ্যাচড়ামি বন্ধ, ডাকাতি বাড়ন্ত, ঝগড়াঝাটি পর্যন্ত দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। প্রবীণ লোকেরা থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে জুতো ছেড়ে রেখে থানার উদ্দেশে হাতজোড় করে ভক্তিভরে প্রণাম করে যায়। যেমন সবাই মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে করে। বিধু দারোগা ব্যাপার দেখেন আর হাসেন। না, হাসেন না ঠিক, কিন্তু হাসি তার গোঁফের ডগায় ঝুলে থাকে, নাকের ডগায় কঁপে, ভুরুতে নাচে। সবাই বুঝতে পারে, বিধু দারোগা হাসছেন। অথচ হাসছেন না। ময়রারা দারোগা-সন্দেশ, বিধু-অমৃতি বের করে ফেলল। খুব বিক্রি।
ওদিকে ভগবতীরও খুব নাম-ডাক। গঞ্জের লোক তো আছেই, আশপাশের গাঁ গঞ্জ, বহু দূরের ভিন গাঁ, এমনকি শহর থেকে পর্যন্ত লোক ঝেটিয়ে আসছে রোজ। ভিড়েঙ্কে ভিড়। সকলেই ভগবতীর জন্য রাশি রাশি খাবার আনছে। শাকপাতা, লাউটা-কুমড়োটা তো আছেই, সেই সঙ্গে সন্দেশ-রসগোল্লা, দুধ-দৈ, এমনকি ঘি-মাখন পর্যন্ত। হারু মণ্ডলের গোয়াল ঘরে পাহাড় প্রমাণ খাবার জমে গেল। অলৌকিক গরুর মহিমা শুনে জমিদার মশাই বিলিতি নেট দিয়ে ভগবতীর জন্য ভাল মশারি করে দিলেন, সেই সঙ্গে সাটিনের বালিশ, তাকিয়া পর্যন্ত। ভগবতী সারাদিন ঘরে বসে খায়, রাতে মশারির তলায় তাকিয়ে ঠেস দিয়ে বসে জাবর কাটে আর ঘুমোয়। তার এই তাগড়াই চেহারা হয়েছে। মোটা হয়ে গরমে হাঁসফাস করলে ভক্তরা তাকে হাতপাখার বাতাস করে ঠাণ্ডা রাখে। সাহাগঞ্জে ভগবতী বিদ্যালয় নামে ইস্কুল খোলা হলো। ‘ভগবতী তৈল’ নামে একটা বাতের মালিশ বেরিয়ে গেল।
