বাজারদর? লোকটা একটু অবাক হয়, হেসেও ফেলে। বলে, খুব চড়া।
খুব? বলে রামবাবু বড় বড় চোখে তাকান। গয়েশের সঙ্গে এই নিয়েই বাজি! গয়েশ বলেছিল, একশো বছর পর বাজারদর হবে একশো গুণ, রামবাবু বলেছিলেন, কক্ষনো না। দশগুণ বড়জোর হতে পারে। রামবাবুর বুকটা তাই ঢিবঢিব করছিল। বললেন, তবু বলো বাবা, শুনে রাখি। আচ্ছা, আগে বলো চাল কত করে।
চাল? লোকটা হাসিমুখেই বলে, চাল যাচ্ছে তিন শো টাকা।
রামবাবু শকটা সামলাতে পারলেন না। চোখ উল্টে ফেললেন, হাত পা কাঠ হয়ে গেল, ভিরমি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলেন। এমন সময়ে লোকটা বলল, কিলো নয়। কুইন্টাল।
রামবাবু আবার সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে একটা শ্বাস ছাড়লেন। আর যা হোক তা হোক, বাজারদরটা ঠিক আছে।
বিধু দারোগা
সেবার বিধু দারোগা আমাদের গঞ্জে বদলি হয়ে এলে হৈ-হৈ পড়ে গেল।
ব্রিটিশ আমলে দারোগা-পুলিশকে ভারী ভয় খেত গাঁ-গঞ্জের লোকেরা। রাস্তায় ঘাটে বা হাটে-বাজারে পুলিশ দেখলেই নিরীহ সজ্জন মানুষরাও সাঁত সাত করে এধারে ওধারে লুকিয়ে পড়ত। এক স্বদেশী আন্দোলনের নেতাগোছের লোক বটতলায় বক্তৃতা দিতে এলেন। শ’ পাঁচেক লোক জড়ো হয়ে গরম বক্তৃতা শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। ঠিক সেই সময়ে একটা টিংটিঙে রোগা লাল-পাগড়িওলা পুলিশ হাট থেকে পালংশাক কিনে ফিরছিল। তাকে দেখে সেই পাঁচশ জোয়ান মদ্দ লোক দে-দৌড় দে-দৌড়। স্বদেশী নেতা গাছতলায় বসে বিড়ি ধরিয়ে, আপনমনে হতাশভাবে বললেন, হোপলেস। আর একবার, গঞ্জের নদীর ঘাট থেকে লোকভর্তি একটা নৌকা ছাড়ছে বিকেলবেলায়, সেই সময়ে গঞ্জের দারোগা আর কয়েকজন পুলিশও ওপারে যাবে বলে এসে নৌকোয় উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বিনা কারণে বিস্তর লোক ঝুপ ঝুপ করে হাঁটুজলে নেমে পালাতে লাগল। এমনকি, তাদের মধ্যে গাঁয়ের পাঠশালার পণ্ডিতমশাইও ছিলেন। পরে তাঁকে সবাই যখন জিজ্ঞেস করল তিনি কাচুমাচু হয়ে বললেন, “কি জানি বাবা, সবাই পালাল দেখে আমিও জলে নেমে পালালাম। ভয় বড় সংক্রমিক।”
এই তো ছিল দারোগা-পুলিশদের সে-আমলের দাপট। বিধু দারোগা ছিলেন সেই দাপুটেদের মধ্যেও আর এক কাঠি দাপুটে। তাঁর দাপটে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায় এ কেবল কথার কথা নয়। তিনি গঞ্জে এসেই চেঁড়ে পিটিয়ে দিলেন যে সামনের হাটবারে সবাই যেন স্বচক্ষে দেখে যায়, থানার উত্তর ধারের দিঘিতে বাঘে আর গরুতে এক ঘাটে জল খাবে।
সেই হাটবারে দিঘির ধারে লোক ভেঙে পড়ল। বাঁধানো ঘাটে বিশাল চেহারার বিধু দারোগা চেয়ারে বসে আছেন। তাকে কেউ হাসতে দেখেনি। কখনো। ভীষণ রাগী চোখে চারিদিকে চেয়ে দেখছেন। তাঁর চোখ যার ওপর পড়ছে সে-ই নিজের জায়গা ছেড়ে একটু সরে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের ব্যায়ামবীর ছোটোকাকাও তিনবার জায়গা বদল করে অবশেষে কচুবনের ভিতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ জোরে কথা বলছে না, ফিসফাস, গুজগুজ করছে। সবাই শুনে আসছে বটে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খাওয়ার কথা, কিন্তু কেউ কখনো দেখেনি! হারু মণ্ডলের বাঁকানো শিঙওলা দুষ্টু গরুটা খুঁটোয় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বাঘ তখনো দেখা যাচ্ছে না। তাই নিয়ে সকলের কৌতূহল।
বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। পাশের গাঁয়ের প্রবর্তক সার্কাস গত অমাবস্যা থেকে খেলা দেখাচ্ছে। সেদিক থেকে একটা খাঁচাওলা গাড়ি বলদে টেনে আনল। খাঁচার মধ্যে গলায়-দড়ি-বাঁধা বাঘ বসে ঝিমোচ্ছে। অনেকে ফিসফিস করে বলল, বাঘকে আফিং খাইয়ে রাখে কিনা, তাই ঐ ঝিমুনি!
তা সে যাই হোক, গায়ে গেঞ্জি আর কালো ফুলপ্যান্ট পরা রোগা রিং মাস্টার লোকটা হাতে চাবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল খাঁচার দরজায়, দুজন লোক খাঁচার দরজাটা ওপর থেকে টেনে তুলল! খাঁচার দরজা খোলা হতেই লোকজন সব দুড়দাড় দৌড়ে খানিক তফাতে গিয়ে দাঁড়াল। ঘাটে রইলেন শুধু রিং মাস্টার, হারু মণ্ডল, বিধু দারোগা আর সার্কাসের দুজন লোক। থানার সিপাইরাও সব তফাতে এসে দাঁড়াল। বাঘ বেরোবে ইয়ার্কির কথা নয়।
তা বাঘটা আফিংখোরই হবে। রিং মাস্টার বিস্তর চাবুকের শব্দ করল, খোঁচাল, তবু বেরোয় না। বার তিনেক হাই তুলল অবিকল বুড়ো মানুষের মতো শব্দ করে। দারোগা মশাই ধমক দিয়ে বললেন, “টেনে বের করো কুলাঙ্গারটাকে।” রিং মাস্টার সেলাম দিয়ে বলল, “আপনাকে সামনে দেখে একটু ভয় খেয়েছে।”
অবশেষে দড়ি ধরে টানা-হঁচড়া করে তাকে বের করা হলো। কী আলিস্যি তার! বাইরে বেরিয়েও অবিকল বেড়ালের মতো ডন মারল একটা, তারপর ঘুরচোখে চারদিকে চাইতে লাগল। মনে হলো, বাঘটা চোখে ভাল দেখতে পায় না, ভুরু কোঁচকানো খুব ঠাহর করে করে দেখছে। বিধু দারোগা হাঁক ছাড়লেন, “দুটোকে জলের কাছে নিয়ে যা!”
তখন হারু মণ্ডল তার দুই গরুটাকে আর রিং মাস্টার তার অলস বাঘটাকে দড়ি ধরে টানতে লাগল। অনেক টানা-হাচড়ার পর দুটোকে জলের কাছে নিয়ে পাশাপাশি দাঁড় করানো হলো বটে, কিন্তু কেউই জলে মুখ দেয় না। বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ার কথা। জলই যদি না খায় তো দারোগাবাবুর সম্মান থাকে কী করে! তাই তখন হারু মণ্ডল তার গরুর গলকম্বলে হাত বুলিয়ে অনেক আদর করে বলতে লাগল, “খাও মা ভগবতী, জল খাও। এই একবারটি খাও মা, আর কখনো বলব না। ঐ ছাগলের মতো বাঘটাকে দেখে ডরিয়ো না মা, ওর দাঁত নড়ে, চোখে ছানি, বড্ড ভীতু জীব।”
