রামবাবু শুয়ে-শুয়ে কিছুক্ষণ ঠ্যাং নাচালেন, তারপর ‘দুত্তোর’ বলে উঠে পড়লেন। ঘুরে ঘুরে ঘরের যন্ত্রপাতিগুলো দেখতে লাগলেন। এক সময়ে তিনি নামকরা বৈজ্ঞানিক ছিলেন। তবু এই একশো বছর পরেকার আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলোর কলাকৌশল তিনি ভাল বুঝতেই পারলেন না। একটা বোতাম টিপতেই ঝড়ের মতো শোঁ-শোঁ শব্দ ওঠায় তাড়াতাড়ি সরে এলেন সেখান থেকে এবং গিয়ে দরজার হাতল ধরে টানাটানি করতে লাগলেন। ভাগ্য ভাল, দরজাটা হড়াক করে খুলে গেল।
কিন্তু করিডোরে রেখেই আঁতকে উঠলেন রামবাবু। করিডোরের মেঝেটা ঠিক নদীর ধীর স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে। তবে চলন্ত ফুটপাথ, এসকেলেটার বা কনভেয়ার বেল্ট রামবাবুর আমলেও ছিল, তাই খুব বেশি অবাক হলেন না। মাথাটা ঘুরছিল বলে তিনি চলন্ত করিডোরে বসে রইলেন। খানিকটা ওপরে উঠে এবং অনেকটা নীচে নেমে, খানিক ডাইনে গিয়ে এবং ফের কিছুটা বাঁয়ে মোড় নিয়ে করিডোরে চলতে লাগলেন। একটু বাদে আর একটা দরজা পেলেন। করিডোর থেকে লাফ দিয়ে নেমে দরজাটা টানলেন রামবাবু। দরজাটা খুলেও গেল।
বাইরে বেরিয়ে এসে রামবাবু একটা গভীর শ্বাস ছাড়লেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, যা ভেবেছিলেন তাই। না, তুষারযুগ আসেনি বা সূর্যও নিভু নিভু হয়নি। বরং একটার বদলে আকাশের চারধারে এবং মাঝখানে একটা, মোট পাঁচটা সূর্য জ্বলজ্বল করছে। আবহাওয়া খুবই মনোরম।
গরম, না ঠাণ্ডা। চারদিকে একশো দুশোতলা বাড়ি একেবারে গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে। আকাশেও তিনি বিস্তর বাড়িঘর ভেসে বেড়াতে দেখলেন। তারই ফাঁকে-ফাঁকে শো করে নানান সাইজের রকেট উড়ে যাচ্ছে, পিরিচের মতো দেখতে কিছু জিনিসকেও উড়ে যেতে দেখলেন তিনি, আরও দেখলেন রকেট লাগানো চেয়ারের মতো দেখতে ছোট ছোট আকাশ-গাড়িতে মানুষ চলাফেরা করছে!
সামনের চলমান ফুটপাথে উঠে পড়লেন রামবাবু। আশেপাশে আরও সব লোকজন রয়েছে। তারা হাঁ করে দেখছে তাকে। দেখবেই। তার পরনে সেই একশো বছর আগেকার ধুতি আর পাঞ্জাবি। এদের পরনে শুধু জাঙ্গিয়ার মতো খাটো একটু জিনিস, গা আদুড়।
রামবাবুর পাশেই একটা বুড়ো লোক। তার বয়স সত্তর বছর হবে। তা হোক, সত্তর হলেও এ লোকটা রামবাবুর চেয়ে না হোক সত্তর বছরের ছোট। তাই আপনি বলবেন না তুমি বলবেন, তা ঠিক করতে না পেরে রামবাবু বারকয়েক গলা খাকারি দিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কটা বাজে?
বুড়ো লোকটা একটু অবাক হয়ে তাকাল বটে, তবে একটু খোনাসুরে বলল, রাত নটা বেজে ছত্রিশ মিনিট তেরো সেকেন্ড।
রামবাবু নিজে বৈজ্ঞানিক। কাজেই অবাক হলেন না! এতক্ষণে বুঝলেন, আকাশে পাঁচটা সূর্য নয়, ওগুলো কোনো রকমের কৃত্রিম আলো যার ফলে চারদিকটা দিনের মতো দেখাচ্ছে। সম্ভবত ওগুলো পৃথিবীর অন্য পাশের সূর্যের আলো থেকে এপাশে আলো প্রতিফলিত করছে। এ ধরনের একটা আইডিয়া একশো বছর আগে তার মাথাতেও এসেছিল। রামবাবু ফের জিজ্ঞেস করলেন, আজ তারিখটা কত বলবে বাবা?
লোকটা অবাক চোখে ফের তাকিয়ে বলল, জানুয়ারি, বিশ শো ঊনআশি।
রামবাবু তা জানেন। তবু লোকটার সঙ্গে একটু খেজুরে আলাপ করছেন। তার আসল উদ্দেশ্য অন্য। একশো বছর পর পৃথিবীতে কীরকম পরিবর্তন হবে না-হবে, মানুষ কতটা এগোবে না-এগোবে, তা মোটামুটি আন্দাজ ছিল। সুতরাং তিনি চারদিকের পরিবর্তন দেখে খুব অবাক হননি। কিন্তু গয়েশের সঙ্গে একটা বাজি ছিল। সেইটে বড় খোঁচাচ্ছে।
রামবাবু বললেন, আচ্ছা সুকিয়া স্ট্রীটটা কোনদিকে বলতে পারো বাবা?
লোকটা বলে, সুকিয়া স্ট্রীট? সুকিয়া স্ট্রীট বলে কিছু শুনিনি তো?
নর্থ ক্যালকাটায়।
লোকটা হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলে, ক্যালকাটা? ওঃ, ক্যালকাটা নামে একটা গ্রাম আছে বটে। সে তো অনেক উত্তর দিকে।”
এ শহরটার নাম কী বাবা?
এ হল গোসাবা, সুন্দরবন?
বটে! গোসাবার এত উন্নতি? বলে রামবাবু চোখ কপালে তোলেন।
লোকটা হঠাৎ রামবাবুর একটা হাত খপ করে ধরে বলল, আচ্ছা, আপনি কি রামবাবু? একশো বছর আগে যাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল?
রামবাবু খুব জোরে মাথা নেড়ে বললেন, আমি সে-ই। কী করে বুঝলে বাবা?
বুঝব না? আপনার ঘুমন্ত মুখের ছবি যে প্রায়ই টেলিভিশনে দেখানো হয়। খবরের কাগজেও বেরোয়।
তাই বুঝি? বলে খুব হাসলেন রামবাবু। বললেন, তা কলকাতার কী হল বলতে পার বাবা?
সে তো আরো সত্তর-আশি বছর আগেই মশা, লোডশেডিং আর জলের অভাবে হেজে গিয়েছিল। শহরে জঙ্গল গজিয়ে যায়। তারপর এখন অবশ্য কলকাতা আবার বর্ধিষ্ণু গ্রাম হয়ে উঠেছে। ভাল চাষবাস হচ্ছে। চৌরঙ্গির আলু খুব বিখ্যাত, বাগবাজারের কুমড়ো পৃথিবীর সেরা, খিদিরপুরে মোচার সাইজের পটল জন্মায়। তাছাড়া কলকাতার এখন মশা বাঁচাও আন্দোলনের একটা হেড কোয়ার্টার হয়েছে।
বটে? সে আবার কী? মশা বাঁচাবে কেন বাবা?
মশা মেরে-মেরে মানুষ তো মশার প্রজাতিই ধ্বংস করে দিয়েছিল কিনা। যেমন একসময় আপনারা বাঘ-সিংহ মেরে সব প্রায় নিকেশ করেছিলেন। পরে আপনারা যেমন ব্যাঘ্রপ্রকল্প করে বাঘ বাঁচাতে চেয়েছিলেন, এখন ঠিক সেইভাবেই মশা জিয়োনোর চেষ্টা চলছে।
রামবাবু এবার আসল কথাটায় এলেন। খুব সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বাবা, একটা কথা বলবে? খুব সাবধানে বোলো৷ তেমন শকিং কিছু শুনলে আমার বুড়ো হার্ট থেমে যেতে পারে। এখনকার বাজারদরটা বলতে পারো?
