মেয়ের বিয়ে বেশ জাঁকিয়েই দিচ্ছেন বঙ্কুবাবু। তার মেলা পয়সা। চার-পাঁচ রকমের ব্যবসা আছে। বঙ্কুবাবুর বাড়ি ফটিকের একরকম গা ঘেঁষেই। রোজ দু’বেলা যাতায়াতের পথে সে দেখেছে, বিয়ের মস্ত আয়োজন হচ্ছে। বিশাল শামিয়ানা, দেবদারু দিয়ে তোরণ হচ্ছে, নহবত বসেছে। মেলা লোক খাটছে দিনরাত। দুঃখের বিষয়, এ-বিয়েতে ফটিকের নেমন্তন্ন নেই। হওয়ার কথাও নয়। তার মতো লোককে পৌঁছে কে?
ভয়ে ফটিকের কেমন যেন হাঁফ ধরে যাচ্ছে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কিন্তু কী করবে তা বুঝতে পারছে না। বঙ্কুবাবুর মতো পাজি লোক মারা গেলে তার কিছু যায় আসে না। কিন্তু খুন করাটায় তার ঘোর আপত্তি হচ্ছে।
ফটিকের মাথায় নানা ফিকির খেলছে। কিন্তু কোনওটাই মনোমতে নয়। একবার মনে হলো, পালিয়ে যাবে। কিন্তু পালানোটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। যারা তার পেছনে লেগেছে, তারা হয়তো নজর রাখছে। পুলিশের কাছে যাবে? গিয়ে লাভ নেই, পুলিশ তার কথায় বিশ্বাস করবে না। উলটে পিস্তল রাখার দায়ে হাজতে পুরবে। বঙ্কুবাবুকে সব ভেঙে বলবে? লাভ কী? তিনি খুন না হলে সে নিজেই যে খুন হবে।
দুপুর অবধি মাথাটা পাগল-পাগল লাগল। তারপর নুন-লঙ্কা-তেঁতুল দিয়ে পান্তাটা খেয়ে নিল সে। পেট ঠাণ্ডা হলো। মাথাটাও যেন একটু শীতল লাগতে লাগল। দাওয়ায় মাদুর পেতে শুয়ে সে ভাবতে লাগল। কে হতে পারে লোকটা? খুন করতে চায় কেন? তাকে দিয়েই খুনটা করাতে চায় কেন? বঙ্কুবাবুকে মেরে কার কী লাভ?
হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠল ফটিক। একখানা কথা মনে পড়ে গেল তার। মাস তিনেক আগে বঙ্কুবাবুর বাগেনের আগাছা পরিষ্কার করতে মুনিশ খাটানো হয়েছিল। সেই দলে ফটিকও ছিল। সারাদিন খাঁটিয়ে মাত্র পাঁচটি টাকা মজুরি দিয়েছিলেন বঙ্কুবাবু। খাবার জুটেছিল চিড়ে আর গুড়। তবে বড় ঘরের জানালার নীচে আগাছা কাটার সময় ফটিকের কানে একটা কথা এসেছিল। ফটিকবাবু যেন কাকে বলছেন, “ওই গাড়াই আমাকে মারবে একদিন। তারপর সব গাপ করবে।”
এই গ্যাড়াটি কে তা ফটিক জানে না। কিন্তু চুপ করে বসে থাকলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। সে পিস্তলটা বিছানার তোশকের তলায় লুকিয়ে রাখল। পাঁচশোটা টাকা টাকে গুজল। গায়ে জামা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বঙ্কুবাবুদের বাড়িতে সানাই বাজছে। মেলা লোকলস্কর খাটছে। তোরণে ফুলের তৈরি প্রজাপতি বসানো হয়েছে। লুচি ভাজার গন্ধে বাতাস ভুরভুর করছে। ফটিক বাড়িতে ঢুকে চারদিক দেখতে লাগল। তার মতো আরও অনেকেই দেখতে এসেছে। ফটকে দরোয়ানদের তেমন কড়াকড়ি নেই।
শামিয়ানার ওপরে বড় বড় ঝাড়লণ্ঠন লাগানো হচ্ছে। ঘাড় উঁচু করে দেখছিল ফটিক। হঠাৎ কে যেন বজ্রমুষ্টিতে তার ডান হাতের কনুই চেপে ধরে বলে উঠল, “এই যে!”
ফটিক এমন আঁতকে উঠল যে মূৰ্ছা যাওয়ার জোগাড়। তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আজ্ঞে আমি না। আমি কিছু করিনি।”
বঙ্কুবাবু কিন্তু মোটেই বিচলিত হলেন না। হাসি হাসি মুখ করে বললেন, “তুই ফটিক না?”
“যে আজ্ঞে।”
বঙ্কুবাবু হাসি হাসি মুখ করেই বলেন, “একটু উপকার কর তো বাবা। কুমুদের দোকানে পাঁচ সের সুপুরি রাখা আছে, আনার লোক নেই। এক ছুটে গিয়ে নিয়ে আয় তো।”
ফটিক ধাতস্থ হলো। আঁতকে ওঠা ভাবটা চট করে কেটে গেল তার। কাল যে এ লোকটাকেই খুন করার কথা। ঘাবড়ালে চলবে কেন। সে হঠাৎ বলে বসল, “লোক নেই কেন বন্ধুবাবু? গাড়াকেই তো পাঠাতে পারেন।”
বঙ্কুবাবু অবাক হয়ে বললেন, “গ্যাড়া, গাড়াটা আবার কে?”
ফটিক সামান্য ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “ও যে আপনার কী যেন হয়!”
আন্দাজে ঢিল মেরেছিল। বোধহয় লাগল না।
বঙ্কুবাবু অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ভ্র-জোড়া কুঁচকে তার দিকে চেয়ে বললেন, “তোর তো সাহস কম নয়! জামাইকে দিয়ে সুপুরি আনাতে বলছিস! আর আমার বড় জামাই কী তোর ইয়ার যে গ্যাড়া-গাড়া করছিস?”
ফটিক হাতজোড় করে বলল, “আজ্ঞে আমরা মুখসুখ মানুষ, কত ভুলভাল বলে ফেলি!”
“যা সুমুখ থেকে। সুপুরিটা নিয়ে আয়।”
পথে হাঁটতে হাঁটতে দুইয়ে দুইয়ে চার করল ফটিক। বঙ্কুবাবুর দুটো মেয়ে, ছেলে-টেলে নেই। বঙ্কুবাবু মারা গেলে মেয়েরা ওয়ারিশান! বড় জামাই গ্যাড়া। তাকে চেনে না ফটিক। তবে একটা গন্ধ পাচ্ছে।
সুপুরি পৌঁছে দেওয়ার পর বঙ্কুবাবু একটা সিকি বকশিশ দিলেন। তারপর হাসিমুখ করেই বললেন, “হঠাৎ গাড়ার কথা বললি কেন বল দিকি!”
“আজ্ঞে বুঝতে পারিনি।”
বঙ্কুবাবু একখানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আপনমনেই বললেন, “অকালকুষ্মাণ্ড। ছিবড়ে করে ছেড়ে দিচ্ছে আমাকে। আজ এটা দাও, কাল সেটা দাও।”
ফটিক বশংবদ দাঁড়িয়ে থেকে শুনে নিচ্ছিল।
“কী শুনছিস দাঁড়িয়ে?”
“আজ্ঞে গালাগাল দিচ্ছেন তো, চলে গেলে বেয়াদপি হবে যে!”
“গালাগাল তোকে দিইনি!”
“তবে কাকে?”
“নিজের কপালকে। ওই যে দেখছিস না, চেহারা বাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওই আমার কপাল।”
যাকে দেখিয়ে দিলেন বঙ্কুবাবু তার বেশ লম্বা চওড়া চেহারা। রং ফরসা, কেঁচানো ধুতি আর মুগার পাঞ্জাবি পরে ঘুরে ঘুরে ব্যবস্থা দেখছে। “বেশ জামাইটি আপনার বন্ধুবাবু।”
“হ্যাঁ, একেবারে মনের মতো। এখন যা তো। জুলছি নিজের জ্বালায়।”
ফটিক লোকটিকে ভাল করে দেখে নিল। যাতে ভুল না হয়। তারপর ধীরে-সুস্থে ফিরে এল। মনটা একটু হালকা লাগছে।
