মাঝরাতে আবার জানালায় ঠকঠক। ফটিক জানালা খুলে অমায়িক গলায় বলে, “যে আজ্ঞে।”
ভারী গলায় বলল, “মনে আছে তো?”
“খুব মনে আছে। বাকি টাকাটা দেবেন নাকি?”
“কাল পাবে। জায়গামতো। কাজে যদি গণ্ডগোল হয় তো মরবে।”
“আর বলতে হবে না।”
পরদিন ফটিক দোকানে গিয়ে ভাল করে সাঁটিয়ে খেল। দুপুরে ঘুমোল, বিকেলে একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে গিয়ে হাজির হলো বন্ধুবাবুর বাড়িতে। সারা বাড়ি আজ যেন রাজবাড়ির মতো দেখাচ্ছে। আলোয় আলোয় স্বপ্নপুরী। ভিড়ে ভিড়াক্কার। বরসহ বরযাত্রীরাও বি এসে গেল সন্ধ্যের মুখেই। গোলাপজল ছিটোনো হচ্ছে চারদিকে। বঙ্কুবাবু সবাইকে ‘আসুন, বসুন” করছেন। পাশে গাড়া। সেও খুব সেজেছে।
বাজি পোড়ানো শুরু হলো। বাজির শব্দে চারদিক একেবারে গমগম করতে লাগল। হঠাৎ ফটিক লক্ষ্য করল, গ্যাড়া এই এত ভিড়ের মধ্যেও আড়চোখে তাকে নজরে রাখছে।
ফটিক মনে মনে হাসল। গ্যাড়া এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধুবাবুর কাছ থেকে নড়ছে না।
লোকজন যখন শামিয়ানার বাইরে এসে ভিড় করে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে আকাশে আতশবাজি দেখছে, ঠিক সেইসময় ফটিক এগিয়ে গিয়ে গাড়ার পেছনে দাঁড়াল। নলটা তার পিঠে ঠেকিয়ে বলল, “ইষ্টনাম স্মরণ করুন বঙ্কুবাবু!” গ্যাড়া হঠাৎ আঁতকে উঠে তখনই বলল, “আমি বঙ্কুবাবু নাকি? আহাম্মক কোথাকার! ওই তো বন্ধুবাবু।”
ফটিক মাথা চুলকে বলল, “ইস, বড্ড ভুল হয়ে যাচ্ছিল তো?”
গ্যাঁড়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “গাধা কোথাকার! যাও যাও, কাজ সারো, আর সময় নেই!”
ফটিক একগাল হাসল, “বটে! তা টাকাটা জায়গামতো আছে তো!”
গ্যাড়া মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “আছে।”
“ঠিক তো?”
গ্যাড়া ঘুরে তার গালে একখানা চড় কষিয়ে দিয়ে বলল, “বেয়াদপ কোথাকার!”
ব্যাপার দেখে বঙ্কুবাবু এগিয়ে এলেন, “এ কী! কী হয়েছে?” ফটিক গালে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “হয়নি। তবে হবে।”
“কী হবে ফটিক? ফটিক গাড়ার দিকে চেয়ে বলল, “বলব বাবু?”
গাড়ার মুখটা হঠাৎ ছাইবর্ণ হয়ে গেল। আচমকা সে ভিড় ঠেলে অন্ধের মতো ছুটতে লাগল। তাকে আর দেখা গেল না।
বঙ্কুবাবু চালাক লোক। ফটিকের হাত ধরে ভিড় থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন চট করে।
“ফটিক, ব্যাপারখানা কী?”
ফটিক লজ্জায় অধোবদন হয়ে সবই বলল। খুব অপরাধী মুখ করে। কিন্তু বঙ্কুবাবুর মুখখানা চকচক করতে লাগল। একটু খুশির গলাতেই বললেন, “ব্যাটা অনেকদিন ধরেই নানা মতলব আঁটছিল। তুই বেজায় ভয় পাইয়ে দিয়েছিস। তোর বুদ্ধি আছে। ও ব্যাটা আর ইদিকে আসবে না শীগগির!” বঙ্কুবাবু খুশি হলেই হাত-উপুড়। আর তার হাত উপুড় মানেই পর্বত। বঙ্কুবাবু ফটিককে একখানা দোকান করে দিলেন। বেশ বড়সড় মুদির দোকান। আর বটগাছের তলায় পাঁচশো টাকাও পেয়ে গিয়েছিল সে। পিস্তলটা বঙ্কুবাবুকে দিয়েছিল ফটিক। বঙ্কুবাবু বললেন, “এটা আমারই জিনিস। গাড়া গেঁড়িয়েছিল।” তা কথাটা হলো, ফটিককে আর উঞ্ছবৃত্তি করতে হচ্ছে না।
ফুটো
দোলগোবিন্দবাবু দুঃখী মানুষ। বরাবরই তার দুঃখে কেটেছে। ছেলেবেলায় গরিব বাপের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুড়ি মোয়া বিক্রি করে পেট চালিয়েছেন। লেখাপড়া শিখেছেন অতি কষ্টে। এই পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের জীবনটা তাঁর আজও বেশ দুঃখেই কাটে। অল্প মাইনের একটা চাকরি করেন। ঘরে তার বউ দিনরাত গঞ্জনা দেন। ছেলেমেয়ে দুটো ভারী রোগা-ভোগা। অফিসেও তাকে কেউ বিশেষ পাত্তা দেয় না। ভালমানুষ বলে বেশি করে খাঁটিয়ে নেয়। দোলগোবিন্দবাবু নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছেন। তার অফিস বলতে একটা কেমিক্যাল ল্যাবরেটারি। নানারকম জিনিস তৈরি হয়। কালি, ইঁদুরমারা বিষ, নানারকম সিনথেটিক আঠা। দোলগোবিন্দবাবু একজন সামান্য কেমিস্ট। ক-এর সঙ্গে ফরমুলা অনুযায়ী খ মিশিয়ে গ তৈরি করা আর কী। তবে মাঝে মাঝে অনেক রাত অবধি যখন একা একা বসে কাজ করেন তখন তার ইচ্ছে যায়, নানারকম জিনিসের সঙ্গে নানারকম বেখাপ্পা জিনিস মিশিয়ে দেখলে কেমন হয়? এরকম মিশিয়ে দেনও কয়েকবার। তেমন কিছু দাঁড়ায়নি।
আজও অফিস থেকে বেরোতে বেশ রাত হয়ে গেল। বাইরে দুর্যোগ চলছে। ভয়ংকর হাওয়া দিচ্ছে, সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি। রাস্তায় হাঁটুভর জল দাঁড়িয়ে গেছে। দোলগোবিন্দবাবু র্যাক-এ ঝোলানো তাঁর ছাতাটা নিতে গিয়ে একটু অবাক হলেন। বাঁ দিকের দ্বিতীয় হুকটায় তিনি বরাবর তার ছেঁড়া তাপ্লি-দেওয়া ছাতাটা ঝুলিয়ে রাখেন। আজও রেখেছেন। অথচ ছাতাটা নেই। তার বদলে একটা খুব ঝকমকে নতুন ছাতা ঝুলছে। শুধু নতুন নয় বেশ কায়দার ছাতা। কালো বাঁকানো পুরু হ্যাঁন্ডেল, দারুণ দামি কাপড়, ওজনেও সাধারণ ছাতার চেয়ে পাঁচগুণ ভারী। র্যাক-এ আর দ্বিতীয় ছাতা নেই। অফিসের সবাই কখন বাড়ি চলে গেছে।
দোলগোবিন্দবাবু দারোয়ান রামবিলাসকে ডেকে ছাতার কথা জিজ্ঞেস করলেন। রামবিলাস বলল, আমি তো কিছু জানি না বাবু।
অন্যের ছাতাটা নেওয়া উচিত হবে কিনা তা বুঝতে পারছিলেন না তিনি। তবে ছাতা যারই হোক সে ছাতা নিতে এই দুর্যোগে আজ আর আসবে বলে মনে হয় না। সুতরাং কাল ছাতাটা ফেরত আনলেই হবে। এই ভেবে দোলগোবিন্দ ছাতাটা নিয়ে বেরোলেন।
ছাতাটা ভাল। খুবই ভাল। মাথার ওপর তুলে দোলগোবিন্দ ছাতাটা খুলবার জন্য হাত বাড়াতেই সেটা আপনা থেকেই নিঃশব্দে এবং বেশ বিনীতভাবে খুলে গেল। আজকালকার অটোমেটিক ছাতা যেমন অভদ্র ভাবে ফটাং করে খোলে সেরকমভাবে নয়।
