কে?
তা দিয়ে আপনার কী দরকার? যান না গিয়ে শুয়ে থাকুন। আমাদের কাজ করতে দিন।
মদনবাবু একটু কঁপা গলায় বললেন, তোমরা কারা বাবারা?
সে কথা শুনলে আপনি ভয় পাবেন।
ইয়ে তা আমি একটু ভীতু বটে। কিন্তু বাবারা, এসব কী হচ্ছে, একটু জানতে পারি না।
খারাপ তো কিছু হয়নি মশাই। আপনার তো লাভই হচ্ছে।
তা হচ্ছে, তবে কিনা চুরির দায়ে না পড়ি। তোমরা কি চোর?
লোকটা এবার রেগে গিয়ে বলল, কাল থেকে চোর-চোর করে গলা শুকোচ্ছেন কেন? আমরা ফালতু চোর নই।
তবে?
আমরা ম্যাকফারলন সাহেবের সব চেলা-চামুণ্ডা। আমি হলুম গে সর্দার, যাকে আপনি কিনেছেন একুশ হাজার টাকায়।
আলমারি?
আজ্ঞে। আমরা সব ঠিক করেই রেখেছিলুম, যে খুশি আমাদের কিনুক কেন আমরা শেষ অবধি সবাই মিলেমিশে থাকব, তাই—
তাই কি?
তাই সবাই জোট বাঁধছি, তাতে আখেরে আপনারই লাভ।
মদনবাবু বেশ খুশিই হলেন। তবু মুখে একটু দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বললেন, কিন্তু বাবারা, দেখো যেন চুরির দায়ে না পড়ি।
মেলা ফ্যাচফ্যাচ না করে, যান না নাকে তেল দিয়ে শুয়ে থাকুন গে। কাজ করতে দিন।
মদনবাবু তাই করলেন। শুয়ে খুব ফিচিক-ফিচিক হাসতে লাগলেন, হলঘরটা ভরে যাবে, দোতলা-তিনতলায় যা ফাঁকা আছে তাও আর ফাঁকা থাকবে না। এবার চারতলাটা না তুললেই নয়।
ফটিকের কেরামতি
মাঝরাত্তিরে শিয়রের জানালাটায় মৃদু ঠুকঠুক শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল ফটিকের। ঘুম তার খুব পলকা। সে উঠে হ্যারিকেনের আলোটা উসূকে দিয়ে জানালাটার দিকে সভয়ে চেয়ে রইল। আঁট করে বন্ধ রয়েছে পাল্লা। এত রাতে কারও আসার কথা তো নয়। চোর-ডাকাত যে নয় তা ফটিক জানে। কারণ, চোরের বাড়িতে চোর আসে না। তবে কে হতে পারে?
ফটিক গলাখাঁকারি দিয়ে খুব বিনীতভাবেই জিজ্ঞেস করল, “কে আজ্ঞে? কী চাইছেন?”
ওপাশ থেকে একটা ভারী গলা চাপা স্বরে বলল, “জানালা খোলো। দরকার আছে।”
“কী দরকার?”
“তোমার কিছু রোজগার হবে।”
রোজগার জিনিসটা ফটিক বড় ভালবাসে। রোজগারের মতো জিনিস নেই। গত দিন দশেক তার এক পয়সাও রোজগার হয়নি। দিনের বেলা সে বেড়া বেঁধে বেড়ায়। রাতের বেলা একটু-আধটু চুরিটুরির চেষ্টা করত। দুটোর কোনওটাতেই তার সুবিধে হচ্ছে না। কচু-ঘেঁচু খেয়ে দিন কাটছে। একা-বোকা মানুষ বলে চলে যায়।
ফটিক বুকে একটু সাহস এনে জানলাটা খুলল। কিন্তু বাইরে অন্ধকারে কাউকে দেখা গেল না। ফটিক একটু ভয়ে-ভয়ে উঁকিঝুঁকি দিল। হঠাৎ দস্তানা-পরা একখানা হাত তলার দিক থেকে উঠে এসে কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট ছুঁড়ে দিল তার পায়ের কাছে। ফটিক চমকে উঠে নীচু হয়ে প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিল। বেশ ভারী জিনিস।
বাইরে থেকে ভারী গলাটা বলল, “ওটা একটা পিস্তল। গুলি ভরা। সঙ্গে পাঁচশো টাকা আছে। কাজটা করতে পারলে আরও পাঁচশো।“
পিস্তল! ফটিকের হাত-পা কাঁপতে লাগল। বলল, “আজ্ঞে এ যে ভয়ঙ্কর জিনিস।”
“শুনতে ভয়ঙ্কর, ব্যবহার করা খুব সোজা।”
“কাজটা কী বলবেন?”
“বঙ্কুবাবুর মেয়ের বিয়ে পরশুদিন। হাজার লোকের নেমন্তন্ন। দেড়শো বরযাত্রী আসবে। বাজি-টাজি ফাটবে। তোমার কাজটা হলা, গোলেমালে হরিবোল। ভিড়ের মধ্যে এক ফাঁকে বঙ্কুবাবুর কাছাকাছি চলে যাবে। নলটা পিঠের বাঁ দিকে ঠেকাবে, ঘোড়াটা টেনে দেবে, বাস।”
“ওরে বাবা!” ফটিক ঘামতে লাগল।
“কোনও ভয় নেই। সন্ধ্যে সাতটা থেকে বাজি ফাটবে। শব্দটা কেউ লক্ষ্যই করবে না। কাজ সেরে পিস্তলটা কোমরে গুঁজে ফেলবে। তাড়াহুড়ো না করে ভিড়ে মিশে দাঁড়িয়ে থাকবে, আহা-উঁহু করবে। থানা থেকে পুলিশ আসতে অনেক দেরি হবে। ততক্ষণে বেরিয়ে নদীর ধারে বটতলার বাঁধানো চাতালের কাছে গিয়ে দেখবে ইট চাপা দেওয়া আরো পাঁচশো টাকা রয়েছে। টাকাটা নিয়ে পিস্তলটা ওখানেই রেখে চলে আসবে। তোমার কিছু হবে না। কোনও ভয় নেই। কিন্তু আমাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে তিনদিনের মধ্যে তোমাকে খুন করা হবে।”
ফটিক আঁতকে উঠে বলল, “তা বঙ্কুবাবুকেও কেন আপনারাই সাবাড় করছেন না? আমি যে জীবনে খুনখারাপি করিনি।”
“আমাদের অসুবিধে আছে। কাজটা তোমাকেই করতে হবে।”
“আমি কী পারব আজ্ঞে?”
একটা পায়ের শব্দ দূরে চলে গেল। কেউ কোনও জবাব দিল না।
ফটিক ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। তার মাথা ঘুরছে, গলা শুকিয়ে কাঠ, বুক এমন ধড়ফড় করছে যেন তবলার লহরা, খানিকক্ষণ বসে থেকে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল। তারপর মোড়কটা খুলে পিস্তলটা দেখল। এসব জিনিস সে চোখেও দেখেনি আগে। বিদঘুঁটে চেহারা, তাকালেই ভয় হয়।
রাতে আর ফটিকের ঘুম হলো না। সারা রাত আকাশ-পাতাল ভেবে মাথাটাই গরম হয়ে গেল। খুনখারাপি তার লাইন নয়। রক্ত দেখলে সে এখনও ভিরমি খায়। সে সামান্য চুরিটুরির চেষ্টা করে বটে, কিন্তু তাতেও তার হাত যশ নেই। নিতান্ত অভাবে পড়েই চেষ্টা করতে হয়, নইলে চুরিও তার লাইন নয়। দুটো পেটের ভাতের জোগাড় হলে সে কস্মিনকালেও চুরি করত না। কিন্তু এরা যে তাকে খুনোখুনিতে কেন নামাতে চাইছে তা সে বুঝতে পারছে না। খুন না করতে পারলে খুন হতে হবে–কী সব্বোনেশে কথা! ঘন ঘন জল খেতে খেতে তার পেট জয়ঢাক হয়ে গেল, তবু বারবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।
সকালবেলা মাথায় হাত দিয়ে অনেকক্ষণ দাওয়ায় বসে রইল ফটিক। তার বাটিভর্তি পান্তা পড়ে রইল। খিদেটা চাগাড় দিচ্ছে না। কাল বঙ্কুবাবুর মেয়ের বিয়ে। আর কালকেই তাকে খুন করতে হবে।
