উত্তেজিত পটলবাবু বললেন, “উড়ো কী মশাই, এ যে ভিমরুলের চিঠি!”
“সে তো জানি মশাই, কিন্তু ঘটনাটা না ঘটলে তো আর কিছু করতে পারি না। আগে ঘটুক তারপর দেখা যাবে।”
আসলে পুলিশও পটলবাবুকে ভাল চোখে দেখে না।
পটলবাবু তখন এসে ধরলেন গোয়েন্দা বরদাচরণকে। “বাবা বরদা, আমি যে মারা পড়তে চলেছি।”
বরদা একটু হেসে বলল, “শুভস্য শীঘ্রম।”
“তার মানে! তুমি কি আমার মৃত্যু চাইছ?”
“ভোট নিলে দেখবেন জনমত তাই চাইছে। তবে আমি গোয়েন্দা। আর্তকে রক্ষা করাই আমার কাজ। দেখি চিঠিটা।”
বরদা চিঠিটা ভাল করে দেখল। নিজের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে আঙুলের ছাপ খুঁজল। পেল না। পোষা কুকুর টমিকে চিঠি শুকিয়ে খানিক এদিক ওদিক খুঁজে এল। তারপর চিঠিটা ফেরত দিয়ে বলল, “সাতদিন একটু সাবধানে থাকবেন।”
“সাবধানে থাকব! তুমি তো বলেই খালাস। সাবধানে থাকলেই কি ভিমরুল রেহাই দেবে? সে যে ভিমরুলের মতোই সাত হাত জলের তলায় গিয়ে হুল দেয়।”
“কেন আপনার তো একটা গুণ্ডাবাহিনী আছে বলে শুনেছি। তারাই আপনাকে পাহারা দেবে।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পটলবাবু বললেন, “তা তারা দেবে। কিন্তু তারা বেশি বুদ্ধি ধরে না। গায়ের জোর দিয়ে কি আর সব কাজ হয়? শুনেছি ভিমরুল তুখোড় চালাক, কোথা দিয়ে যে তার মৃত্যুবাণ আসবে কে জানে। বাপু বরদাচরণ, তোমাকে মোটা টাকা দেব, আমাকে পাহারা দেওয়ার ভারটা তুমিই নাও।”
বরদাচরণ পটলবাবুকে পছন্দ করে না। তা বলে পটলবাবু খুন হন সেটাও সে চায় না। বলল,”পটলবাবু আমার হাতে এখন অনেক কাজ। চারদিকে অপরাধের সংখ্যা যেমন বাড়ছে গোয়েন্দাদের ব্যস্ততাও তেমনই বাড়ছে। তিনটে দিন কোনওরকমে যদি কাটিয়ে দিতে পারেন তা হলে চতুর্থ দিন থেকে আমি আপনার নিরাপত্তার ভার নেব। আগামী তিনদিন আমি বড়ই ব্যস্ত। তবে আমি বলি কি, ওই বেচারার টাকাগুলো দিয়ে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।”
পটলবাবু খ্যাক করে উঠলেন, “হকের টাকা দিয়ে দিলেই হবে? ধর্ম বলে একটা ব্যাপার আছে না?”
“ওঃ তাই তো! ধর্ম বলেও তো একটা কথা আছে।”
পটলবাবু বরদাচরণের ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু বুকের ধুকধুকুনিটা যাচ্ছে না। রাতে ঘুম আসে না, খিদে পায় না, কাজে মন দিতে পারেন না। তাঁর তিনজন বিশ্বস্ত দেহরক্ষীর মধ্যে ন্যাপা হল প্রাক্তন ব্যাটরাশ্রী। বিশাল চেহারা, যার গায়ে পেশি কিলবিল করছে। দ্বিতীয় দেহরক্ষী হল কুংফু ক্যারাটের ওস্তাদ গুলে। তিন নম্বর দেহরক্ষী স্বর্ণপদকজয়ী মুষ্টিযোদ্ধা হারু। তারা পটলবাবুর কাছ থেকে মোটা বেতন পায়। ষণ্ডা-গুণ্ডার কাজে তারা খুবই দড়। তবে বুদ্ধির ব্যাপারে তাদের খামতি আছে। কিন্তু ভিমরুল অতি বুদ্ধিমান। সে মোটা দাগের কাজ করে না। পটলবাবু খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে রইলেন। স্থির করলেন, তিনদিন আর ঘরের বাইরে যাবেন না ।
দ্বিতীয় দিন সকালে মহীতোষ নামে এক মহাজন এল। মোটা সুদে লাখ টাকা ধার নিয়েছিল। সুদে-আসলে দু’লাখ টাকা শোধ দিতে এসেছে। সঙ্গে দু’জন পাইক।
টাকা-পয়সার লেনদেন হয় নীচের বৈঠকখানার পাশের ঘরে। এ-ঘরে সিন্দুক-টিন্দুক আছে। পটলবাবু তাঁর দেহরক্ষীদের কক্ষনো এ ঘরে ঢুকতে দেন না। লেনদেনের সময় তিনি সবসময়েই একা থাকেন, মক্কেলরাও একাই সে ঘরে ঢুকতে পায়।
পটলবাবু ঘরে ঢুকে মহীতোষকে ডেকে পাঠালেন। কিন্তু মহীতোষ যখন ঘরে ঢুকল তখন পটলবাবুর একগাল মাছি। লোকটা মোটেই মহীতোষ নয়।
পটলবাবু শুধু আঁ-আঁ করে দু’বার চিৎকার করার অবকাশ পেয়েছিলেন। তারপর যে কী হল, তা কেউ জানে না। ঘণ্টাখানেক পরেও ঘর থেকে কেউ বেরোচ্ছে না দেখে বাড়ির লোকজন জড়ো হল। বিস্তর ডাকাডাকি আর চেঁচামেচির পর দরজা ভেঙে দেখা গেল, মহীতোষ নামে আগন্তুক এবং পটলবাবু, কারও চিহ্ন নেই। গণ্ডগোলের সুযোগে মহীতোষের পাইক দু’জনও পালিয়েছে।
ঘরের মোটা গরাদের একটা জানলা ভেঙে। কিন্তু জানলা দিয়ে পটলবাবুকে নিয়ে যদি আততায়ী বেরিয়েও গিয়ে থাকে তা হলেই বা সে কী করে বাড়ির উঁচু পাঁচিল ডিঙোল কিংবা কী করেই বা দারোয়ানের চোখ এড়িয়ে ফটক দিয়ে বেরোল?
পুলিশ এসে সর্বত্র তন্নতন্ন করে খুঁজে বলল, “এটা গুম কেস। খুনের কেস বলা যাবে না।”
যাই হোক, সবাই ধরে নিল শুধু গুম নয়, গুম করে পটলবাবুকে খুনও করা হয়েছে। কারণ ভিমরুলের যেই কথা সেই কাজ। লাশটা অবশ্যই দু চারদিনের মধ্যে পাওয়া যাবে।
কিন্তু একদিন-দু’দিন করে সাতদিন কাটতে চলল। পটলবাবুর লাশের কোনও হদিশ হল না।
পটলবাবুর চার ছেলে গিয়ে বরদাচরণকে ধরে পড়ল, “বাবা আপনার ওপর খুব ভরসা করেছিলেন, কিন্তু আপনি তো বাবাকে রক্ষা করতে পারলেন না। এখন কী হবে?”
বরদাচরণ নানারকম কেস নিয়ে সর্বদাই ভাবিত। গম্ভীর মুখে শুধু বলল, “হুঁ।”
“বাবার লাশটাও যে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“হুঁ।”
“ভিমরুলকে ধরার ব্যাপারেও তো কিছু হচ্ছে না।”
“হুঁ।”
বিরক্ত হয়ে পটলবাবুর ছেলেরা ফিরে এল।
গভীর রাত। বরদাচরণ তার দোতলার ঘরে একটা কেস হিস্ট্রি লিখছে। গভীর চিন্তামগ্ন হঠাৎ খোলা জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে একটা ঢিল এসে পড়ল। ঢিলে বাঁধা একটা কাগজ।
বরদাচরণ ঢিলটা কুড়িয়ে নিয়ে কাগজটা খুলে দেখল, তাতে লেখা? “কাহারপাড়ায় মজাপুকুরের ধারে পটলের লাশ পড়ে আছে।–ভিমরুল।”
