বরদাচরণ কাগজটা মুড়ে পকেটে রাখল। তাড়া নেই! লাশ তো আর উঠে পালাবে না। সকালে গিয়ে দেখলেই হবে।
সকালেই দেরিতে ঘুম থেকে উঠে একটু গড়িমসি করে যখন বরদা মজাপুকুরের কাছে পৌঁছল তখন সেখানে লাশটাশ দেখা গেল না। মজাপুকুর, খুব নির্জন জায়গা। চারদিকে ঘন কসাড় বন। দিনেদুপুরেও এখানে কেউ বড় একটা আসে না। একসময়ে ডাকাতের আড্ডা ছিল। ডাকাতে-কালীবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। চারদিকটা ঘুরে দেখে বরদা পুকুরের ধারে এসে দেখল একটা রোগামতো ছোটখাটো চেহারার লোক পুকুরের একধারে বসে ছিপ দিয়ে নিবিষ্টমনে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। একটু আগেও লোকটা এখানে ছিল না।
বরদাচরণ লোকটার দিকে অবহেলার চোখে একটু চেয়ে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে খুব আলগা গলায় বলল, “কটা মাছ পেলেন?”
লোকটা বরদাচরণের দিকে ফিরেও তাকাল না। কিন্তু একটু চাপা গলায় বলল, “একটা মাছ ধরব বলেই বসে আছি। বড় মাছ। খুব লেজে খেলাচ্ছে।”
বরদাচরণ একটু হেসে বলল, “বড় মাছ ধরতে হলে উপযুক্ত টোপ চাই তো। তা টোপটা কী?” সেইটেই বড় মাছটার কাছে জানতে চাইছি।
বরদাচরণ একটু ভেবে বলল, “বড় মাছটা টোপ গিলবে না। তবে আপস করতে রাজি আছে।”
লোকটা ছিপ গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। নিতান্তই হেঁটো ধুতি আর কামিজ গায়ে একটা গেঁয়ো লোক। বয়স ত্রিশের আশেপাশে। মুখখানা একদম ভাবলেশহীন। বরদাচরণের দিকে না তাকিয়ে মাথাটা নিচু রেখে বলল, “আপসটা কিরকম?”
“পটলবাবুকে মহীতোষ সেজে আমিই সরিয়েছি বটে, তা বলে আমি তার সমর্থক নই। লোকটা আমার মক্কেল, তাকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য।”
রোগাভোগা লোকটা নিচু গলাতেই বলল, “ভিমরুলের চাকে খোঁচা দিয়েছেন। আপনার সাহস আছে বটে!”
“আমি ভিমরুলের শত্রু নই।”
পটলকে না মারলে এলাকায় শান্তি থাকবে না। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দিন।”
মাথা নেড়ে বরদা বলল, “তা হয় না। তাকে মারলে আমার শর্ত ভঙ্গ হবে।”
“তা হলে তো ভিমরুলের সঙ্গে শত্রুতাই আপনি চান। আমার যে কথা সেই কাজ।”
“না, ভিমরুলের মুখরক্ষার ব্যবস্থাও ভেবে রেখেছি।”
“কী ব্যবস্থা?”
“পটলকে বলেছি, প্রাণ বাঁচাতে গেলে তাকে দেশত্যাগ করতে হবে এবং অন্য জায়গায় অন্য নামে বেঁচে থাকতে হবে। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা চলবে না। সে যে বেঁচে আছে এ-কথা কেউ জানবে না।”
“সে যদি আর কখনও এ-তল্লাটে আসে–”
“না, সে-ভয় আর নেই। আপনার ভয়ে সে আধমরা।”
“আর শ্ৰীমন্তর টাকাটা?”
“পটল আমার সঙ্গে পালানোর সময় নগদ পাঁচ লাখ দশ হাজার আলাদা করে শ্ৰীমন্তর জন্য নিয়ে নিয়েছিল। টাকাটা কাল রাতেই শ্ৰীমন্ত পেয়ে গেছে।”
ভিমরুল এবার একটু হাসল। বলল, “চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছেন, তবু আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। আপনি একজন দক্ষ গোয়েন্দা।”
“ধন্যবাদ।”
ছোটোখাটো লোকটা ছিপটা হাতে নিয়ে কসাড় বনের মধ্যে ঢুকে কোথায় চলে গেল কে জানে!
বরদাচরণ বাড়িতে ফিরে এসে তার দোতলার ঘরের পাশে পুরনো লেপতোশকের মস্ত কাঠের বাক্স খুলে পটলবাবুকে বের করল। পটলবাবু তখন চিচি করছেন।
“তা পটলবাবু, এবার কী করবেন?”
“প্রাণরক্ষা করো বরদা, তারপর কী করব ভাবা যাবে।”
“প্রাণের ভয় আর নেই। ভিমরুল শর্তাধীনে আপনাকে রেহাই দেবে। কিন্তু আপনি যাবেন কোথায়?”
“হিমালয়ে।”
“সাধু হবেন নাকি?”
“না, না, ব্যবসা আমার রক্তে। হিমালয়ে মেলা সাধু। আমি ঠিক করেছি সাধুদের চাল, ডাল, আটা, লোটা-কম্বল, কৌপীন ইত্যাদি সাপ্লাই দেওয়ার ব্যবসা করব।”
“সাধুদের সাপ্লাই দেবেন? টাকা দেবে কে?”
“ভক্তরা দেবে বাবা। ওসব আমার ছক করা আছে।” পটলের ব্যবসাবুদ্ধি দেখে বরদা অবাক হয়ে গেল।
পাগলা গণেশ
মাধ্যাকর্ষণ প্রতিরোধকারী মলম আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে পৃথিবীতে নানারকম উড়ান যন্ত্র আবিষ্কারের একটা খুব হিড়িক পড়ে গেছে। কেউ ডাইনিদের বাহন ডাণ্ডাওলা বঁটার মতো, কেউ নারদের পেঁকির মতো, কেউ কার্পেটের মতো, কেউ কার্তিকের বাহন ময়ূরের মতো উড়ান যন্ত্র আবিষ্কার করে তাতে চড়ে বিষয়কর্মে যাতায়াত করছে।
আকাশে তাই সবসময়েই নানারকম জিনিস উড়তে দেখা যায়।
এমনকি কৃত্রিম পাখনাওলা মানুষকেও।
সালটা ৩৫৮৯। ইতিমধ্যে চাঁদ, মঙ্গল এবং শুক্রগ্রহে মানুষ ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে, সূর্যের আরও দুটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং জানা গেছে আর কোনও গ্রহ নেই, মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে হাজার হাজার মানুষ আলোর চেয়েও গতিবেগসম্পন্ন মহাকাশযানে রওনা হয়ে গেছে এক দেড়শো বছর আগে থেকে এবং এখনও অনেকে যাচ্ছে। কাছেপিঠে যারা গেছে তাদের ফেরার সময় হয়ে এল। তবে সেটা এক মিনিট পর না একশো বছর পর তা জানবার উপায় নেই।
তা বলে পৃথিবীর মানুষেরা হাল ছাড়েনি।
সেই এক দেড়শো বছর আগে যারা জন্মেছিল তারা সকলেই সশরীরে বর্তমান। আজকাল পৃথিবীতে মানুষ মরে না। যারা মহাকাশে গেছে তারা ফিরে এসে সেই আমলের লোকেদের দেখতে পাবে। তবে সব মানুষই বেঁচে আছে বলে নতুন মানুষের জন্মও আর হচ্ছে না। গত দেড়শো বছরের মধ্যে কেউ পৃথিবীতে শিশুর কান্না শোনেনি।
এদিকে ঘরে ঘরে মানুষ এত বেশি বিজ্ঞান নিয়ে কুঁদ হয়ে আছে। যে, প্রতিঘরের প্রত্যেকেই কোনও না কোনও বিজ্ঞানের বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনও চর্চাই নেই। কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমা এসব নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না। ওসব অনাবশ্যক ভাবাবেগ কোনও কাজেই লাগে না।
