শেরপুরের লোকেরা ভীষণ বিমর্ষ। পটকানের সঙ্গে কেউ লড়ে পারে না সে ঠিক, কিন্তু তা বলে একটু লড়াই হবে তো, কিছুক্ষণ কোস্তাকুস্তি করে তবে চিৎ হবি। এ যেন সব হেরোর দল মাটি নেওয়ার জন্যই আসে। এইসব হেরোর দলকে শেরপুরের লোকেরা হারু বলে উল্লেখ করে। জেতে বলে পটকানের নাম তারা দিয়েছে জিতেন। সবাই বলাবলি করে–জিতেনের সঙ্গে এবার কোন্ হারু লড়তে আসছে রে?
তা এল এবার। সারা দেশে লোক পাঠিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে মানুষের চেহারার দশজন দানবকে ধরে আনা হলো। তিনদিনে তারা শেরপুরের সব খাবার খেয়ে ফেলল প্রায়। চারদিকে দুর্ভিক্ষের অবস্থা। দশ পালোয়ান বাঘের মতো গর-র-আওয়াজ ছাড়ে, মানুষের ভাষায় কথাই বলে না। দিনমানে তারা নিজেদের সামলাবার জন্য নিজেরাই নিজেদের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে। ভীষণ রাগী, কখন কার ঘাড় মটকে দিয়ে জেল হয়। তবু শেষ রক্ষা হয় না বুঝি। তাদের যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তা মজবুত পাকা ঘর। তবু দশ পালোয়ানের নড়াচড়ায় মেঝে দেবে গেল, দেওয়াল ভেঙে গেল একধারের। হাঁকডাকে চারধারে ভূমিকম্প হলো কয়েকবার।
লড়াইয়ের দিন চারটে রথযাত্রার ভীড় ভেঙে পড়ল কাছারি বাড়িতে। হুলুস্থুল কাণ্ড। দশ দানব দঙ্গলের মাটি কাঁপিয়ে এসে ঢুকল একসঙ্গে। দশজনের সঙ্গে একা লড়বে পটকান।
চোখে দেখেও কারো বিশ্বাস হচ্ছিল না ব্যাপারটা। পটকান দঙ্গলে ঢুকে গুরু প্রণামটা সেরে নিল কেবল। তারপরই দেখা গেল সে এক একটা দানবকে ধরে পটাপট ভীড়ের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে, ঠিক যেমন গদাই মালি বাগানের আগাছা তুলে ছুঁড়ে দেয় বেড়ার বাইরে। দু মিনিটে দশ পালোয়ান সাবাড় করে ঠিক দশবার ছোঃ দিল পটকান। তারপর ভীষণ অভিমানের চোখে তাকাল জমিদারমশাইয়ের দিকে। বলল–হুজুর–
রোগা-ভোগা জমিদারমশাইয়ের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে অপমানে। তিনি কয়েকবার গলা খাকারি দিলেন।
পটকান বলল, হুজুর, এরা সব কারা এসেছিল হুজুর? এসব রোগা দুবলা তোক কোত্থেকে আনলেন?
হঠাৎ জমিদারমশাই চেঁচিয়ে উঠলেন–চোপরাও বেয়াদব। রোগা দুবলা লোক? আঁ? রোগা দুবলা লোক এরা সব!
বলতে বলতে রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে জমিদারমশাই বাত ব্যাধির কথা ভুলে, হার্টের ব্যামোর কথা বিস্মরণ হয়ে, রক্তচাপকে পরোয়া না করে, পেটের ভুটভাটকে উপেক্ষা না করে এক লাফে এগিয়ে এলেন দঙ্গলের মাটির ওপর।
কিছুতেই তোমার শিক্ষা হয় না, অ্যাঁ–বলতে বলতে জমিদারমশাই পটকানের ঘাড়টা ধরে এক ঝটকায় তুলে ফেললেন মাথার ওপরে। তারপর সে কী বাই বাই করে ঘোরাতে লাগলেন, না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
পটকান প্রাণভয়ে চেঁচাচ্ছে তখন–বাবা গো! গেলাম গোয় মেরে ফেললে গো! কে কোথায় আছো ছুটে এসো!
কে শোনে কার কথা! কয়েকবার আচ্ছাসে ঘুরিয়ে জমিদারমশাই পটকানকে এক বেদম আছাড় মারলেন। তারপর হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন–ছোঃ!
পটলবাবুর বিপদ
পটলবাবু খুন হয়েছেন, অথচ তার লাশ পাওয়া যাচ্ছে না, এইটেই সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। খুন হওয়া ব্যাপারটা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ নেই। কারণ তাকে খুন করার হুমকি দিয়েছিল ভিমরুল। আর ভিমরুল যদি কাউকে খুন করার হুমকি দেয় তবে সেই লোক নিজেকে নিহত হবে বলে ধরেই নিতে পারে। কারণ, ভিমরুল হল এক সাঙ্ঘাতিক আততায়ী। পুলিশ-টুলিশ তার টিকিরও নাগাল পায় না। অথচ সে বহাল তবিয়তেই তার পছন্দমতো লোককে খুন করে বেড়ায়। তাও আবার আগে থেকে তাকে সতর্ক করে দিয়ে।
পটলবাবু অবশ্য তোক সুবিধের নন। সোনা রুপোর ব্যবসায় তার লাখো-লাখো টাকা আয়। সুদের কারবারও আছে। তা ছাড়া তার আবার একটি পোষা গুণ্ডাবাহিনীও আছে। পটলবাবুর হয়ে এই গুণ্ডাগুলোই আদায় উশুল করে। রথতলা এবং আশপাশের অঞ্চল পটলবাবুর ভয়ে তটস্থ। মাসকয়েক আগে শ্ৰীমন্ত নামে একটা গরিব লোক বউয়ের গয়না বাঁধা রেখে পটলবাবুর কাছ থেকে পাঁচশো টাকা ধার নিয়েছিল। শোধ দিতে না পারায় কয়েক মাসেই পটলবাবুর নিজস্ব সুদের হারে ধার বেড়ে সুদে আসলে দাঁড়াল পাঁচ হাজার। শ্ৰীমন্তর তো মাথায় হাত। যাই হোক, হঠাৎ শ্ৰীমন্ত একটা লটারিতে পাঁচ লাখ টাকা প্রাইজ পেয়ে গেল। আনন্দে সে তখন আত্মহারা। ঠিক সেই সময়ে পটলবাবুর গুণ্ডারা গিয়ে হাজির। তারা বলল, সুদে-আসলে পটলবাবুর পাওনা ওই পাঁচ লাখই দাঁড়িয়েছে। শ্রীমন্তকে মারধর করে তারা লটারির টিকিটটা কেড়ে নিয়ে এল। পটলবাবু দিব্যি হাসতে-হাসতে প্রাইজের টাকাটা বাগিয়ে নিলেন। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই ভিমরুলের চিঠি এল। সেই মার্কামারা নীল রঙের খামের ওপর একটা ভিমরুলের ছবি। ভেতরে নীল চিরকুটে পরিষ্কার হাতের লেখায় কয়েকটি কথা, “তোমার পাপের সীমা ছাড়িয়েছে। মরার জন্য প্রস্তুত হও। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে শ্ৰীমন্তর পাঁচ লাখ টাকা ও তৎসহ ক্ষমাভিক্ষার মূল্যস্বরূপ আরও দশ হাজার টাকা তাকে প্রত্যর্পণ করতে পারলে ভাল, নইলে আর সাতদিনের মধ্যেই তোমাকে খুন করা হবে।–তোমার যম ভিমরুল।”
ভিমরুলের চিঠি ইয়ার্কির ব্যাপার নয়। সুতরাং উদ্বিগ্ন পটলবাবু পুলিশের কাছে গেলেন।
দারোগাবাবু চিঠিটা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে হাই তুলে বললেন, “আমাদের কিছু করার নেই মশাই। উড়ো চিঠির পিছনে ছোটা আমাদের কর্ম নয়।”
