দোকানটা বেশ বড়, ছিমছাম। পলিপ্যাকে সাজানো সব জিনিস। ভীড়টা একটু পাতলা হতেই দু’জনে জিনিস কিনে দাম মেটাতে গেলেন।
দাম দিতে গিয়েই হরবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন, এই রে! আমার মানিব্যাগ! সর্বনাশ, আমার যে পকেটমার হয়ে গেছে!
কুঞ্জবাবু তাড়াতাড়ি নিজের পকেটে হাত দিয়ে বলে উঠলেন, আরে! আমারটাও যে গেছে হে!
ক্যাশ রোবট বিরক্ত হয়ে বলল, ক্রেডিট কার্ডে দাম দিয়ে জিনিস ডেলিভারি নিন না! কাউন্টার আটকে রাখবেন না, পিছনে ভীড় হয়ে যাচ্ছে।
দু’জনে চাওয়া-চাওয়ি করলেন। কুঞ্জবাবু বললেন, ক্রেডিট কার্ড করা ই হয়নি। দু-চারদিনের জন্য আসা, ওসব ঝামেলা কে করে?
দু’জনেই দোকানের প্রবেশপথের পাশে “পুলিশ” লেখা কোন যন্ত্রে বার্তা পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উড়ন্ত পুলিশের দু’জন কনস্টেবল আকাশ থেকে নেমে এল। জিজ্ঞাসাবাদের পর সব টুকে নিয়ে বলল, পাকা হাতে কাজ।
কুঞ্জবাবু উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, পাওয়া যাবে তো!
একজন কনস্টেবল বলে, পাওয়া যেত, যদি পকেটমার মানুষ হত। আজকাল মানুষের ছদ্মবেশে কত রোবট পকেটমার ঘুরে বেড়াচ্ছে তার হিসেব নেই। দেখলে বুঝতেও পারবেন না। এদের কাজ এত পাকা যে কোনও সূত্রই রেখে যায় না। তবে আমরা চেষ্টায় আছি।
দুই বন্ধুতে একটু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন।
কুঞ্জবাবু মুখটা বিকৃত করে বললেন, পৃথিবীটা দিনদিন উচ্ছন্নে যাচ্ছে! এই পঁয়ত্রিশশো পঁচাশি সালেও পকেটমারি চলছে ভাবতে পারো?
হরবাবুও সায় দিয়ে বললেন, যা বলেছো।
পটকান যখন পটকালো
পটকান পালোয়ান ছিল শেরপুরের গর্ব। সে চেহারা না দেখলে বিশ্বাস হয় না। ষাট ইঞ্চি বুক, আশি ইঞ্চি পেট, গরিলার মতো হাত পা। শরীরটার কোথাও কোনোও ভেজাল নেই। ভুঁড়িখানা ঢালের মতো শক্ত। পটকান পালোয়ান ভূঁড়ি দিয়ে বিস্তর কুস্তিগিরকে চেপে দমসম করে
তিন কুলে পটকান পালোয়ানের কেউ ছিল না। খুব অল্পবয়স থেকে ভীষণ খাই খাই ছিল বলে খিটখিটে বাপ তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। সেই থেকে পটকান বিবাগী। অবশ্য সে বাপ এখন নেই, মাও গত হয়েছেন। পটকান তাই একা আনন্দে থাকে। সকালে দঙ্গলে গিয়ে তেল মাটি মাখে, কসরৎ করে, মুগুর ভঁজে। অসংখ্য ডন-বৈঠক দেয়। একসের ছোলা দিয়ে সকালে জল খায়। বেলা পড়লে রুটির পাহাড় মাংসের পর্বত দিয়ে শেষ করে। বিকেলে একপুকুর দুধ আর এক গামলা বাদাম বাটা খায়, রাতে ফের ঘিয়ের পরোটার বংশ লোপ করে চারটে মুরগি দিয়ে। এর ফাঁকে ফাঁকে এন্তার ডিম, সবজি, মিছরি, শরবৎ চালান হয়ে যায় তার অজান্তে। এসব ছোটোখাটো খাবারগুলো সে খাওয়ার মধ্যে ধরে না।
পটকানের সঙ্গে সেবার লড়তে এল পাঞ্জাবের ভীম সিং, তারও বিশাল চেহারা। খাওয়াদাওয়াও প্রায় পটকানের সমান। জমিদারের কাছারি বাড়িতে লোক ভেঙে পড়ল কুস্তি দেখতে। পটকান ভীম সিংকে তিন মিনিটে চিৎ করে হাত ঝেড়ে বলল–ছেঃ! জমিদারের দিকে চেয়ে হাতজোড় করে বলল–হুজুর, বেয়াদবি মাপ করবেন। কিন্তু এসব চ্যাংড়া প্যাংড়ার সঙ্গে লড়ার জন্য আমাকে ডাকা কেন?
সবাই ভাবে, ঠিক কথা, কিন্তু মুশকিল হলো পটকান লড়বেই বা কার সঙ্গে? দেশ বিদেশ থেকে যারাই লড়তে আসে, সে যত বড় ওস্তাদই হোক, পটকান তিন মিনিটের বেশি সময় নেয় না। লড়াইয়ের শেষে আবার বলে–ছছাঃ! জমিদারের দিকে চেয়ে অভিমানের সঙ্গে বলে– আনাড়িদের সঙ্গেই কি আমাকে বরাবর লড়তে হবে হুজুর?
জমিদারমশাই মহা সমস্যায় পড়ে বললেন–তা বাপু, তোমার যোগ্য কুস্তিগির পাই কোথায়? এঁরা যারা আসছেন লড়তে তারাও সব নাম ডাকের লোক, কিন্তু তোমার কাছে কেউই ধোপে টেকে না দেখি।
–তার চেয়ে হুজুর বন্দোবস্ত করুন ওরা দুজন করে আসুক লড়তে, আমি একা।
তাই হলো। লড়তে এল বচন পাণ্ডে আর হরি দোসাদ। দুজনকে দু বগলে নিয়ে হা হা করে হেসে ওঠে পটকান। তারপর তাদের মাটিতে ফেলে দিয়ে বলেছেঃ ছেঃ! বলে জমিদারবাবুর দিকে তাকায়–হুজুর, দেশে কি আর মানুষ পাওয়া গেল না!
জমিদারমশাই মিইয়ে গিয়ে বললেন–তাই তো! এরা তো দেখছি তেমন কিছু নয়। অথচ শুনেছিলাম এরা কিলিয়ে পাথর ভাঙে, পাঁচ মন ওজন তোলে এক এক হাতে, হাতি বুকে নেয়। সে সব তো গল্প কথা নয় বাপু, নিজের চোখে দেখেই এনেছি। আচ্ছা দেখি তোমার উপযুক্ত যদি কাউকে পাই।
এরপর তিন পালোয়ান লড়তে এল একসঙ্গে। ভীষণ ভীষণ তাদের চেহারা। গোল্লা গোল্লা করে চায় আর দাঁত কিড়মিড় করে। তা সেই তিনজন যখন লড়তে নামল তখন বেলুন চুপসে আমসত্ত্ব হয়ে গেল ফের। তিনটেকে নিয়ে খানিক লোফালুফি খেলল পটকান, চেঁচিয়ে জমিদার মশাইকে বলল–হুজুর, যখন বলবেন তখনই তিনজনকে মাটিতে ফেলব।
ফেললও তাই, তিনবার ছোঃ দিয়ে জমিদারমশাইয়ের দিকে তাকাতেই জমিদারমশাই বেজায় ভয়-খাওয়া মুখ করে মিন মিন করলেন–তাই তো বাপু, এ তো বড় মুশকিলে ফেললে তুমি। খুব বড় একটা শ্বাস ফেলে পটকান বলল–এরকম চললে আমাকে সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে যেতে হবে দেখছি।
এই কথায় সবাই ভারী চিন্তিত হয়ে পড়ে। জমিদারমশাইযের একেই হার্টের ব্যামো, বাঁ পায়ে বাত ব্যাধি, রক্তচাপের রোগ, রাত্রে ভাল ঘুম হয় না, পেটটা ভুটভাট করে সব সময়ে। তার ওপরে পটকানের এই কথা শুনে তিনি প্রায় অন্নজল ছাড়েন আর কি! শেরপুরের গর্ব পটকান পালোয়ান সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে গেলে লজ্জার সীমা থাকবে না।
