নিশি কবরেজ আঁতকে উঠে বললেন, তোমরা? ওরে বাবা!
–আজ্ঞে ভয় খাবেন না। আমরা ভারি দুর্বল জিনিস। নিশি কবরেজ কাঁপতে কাঁপতে বললেন, পাঁচনের দোষ নেই বাবা, সবই কপালের ফের। আমাকে তোমরা মাপ কর।
–আজ্ঞে সেজন্য আপনাকে আমি দুষতে আসিনি। ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা একটা দেখা দিয়েছে। ভূত হওয়ার পর আমরা সব কেমন যেন ধোঁয়াটে মার্কা হয়ে গেলুম। শরীর-টরীর নেই, তবু কী করে যেন আছি। তা আমরা অর্থাৎ আমি আর ধনঞ্জয়–মানে আমি আর রামহরিমানে কে যে কোন্ জন তা বলা মুশকিল–তা আমরা দুজন খুব মাখামাখি করি। খুব বন্ধুত্ব ছিল তো দুজনে। এ ওর শরীরে ঢুকে যাই, ও এর শরীরে মিশে যায়। কিন্তু ওই মাখামাখি করতে গিয়েই কে যে কোন্ জন তা গুলিয়ে গেছে।
–বল কী?
— আজ্ঞে সেই কথাটাই তো বলতে আসা। দুজনে প্রায়ই ঝগড়া লেগে যাচ্ছে। কখনও আমি বলি যে, আমি রামহরি, ও ধনঞ্জয়। কখন ও বলে
যে, ও রামহরি আর আমি ধনঞ্জয়।
নিশি কবরেজ এই শীতেও ঘামছিলেন। হাতের হ্যারিকেন আর লাঠি দুই-ই ঠকঠক করে কাঁপছে। পেটের ভেতরে গুড়গুড় করছে। মাথা ঘুরছে। কিন্তু হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, গাঁটের ব্যথার পাঁচনটার জন্য আধ ছটাক ভূত লাগবে।
নিশি কবরেজ এক গাল হাসলেন। তার হাত পায়ের কাপুনি বন্ধ হলো। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, এ আর বেশি কথা কী? তবে এখন তোমার যেমন বেগুন পোড়ার মতো চেহারা হয়েছে তাতে তো কিছু বোঝবার উপায় নেই। একটু ধৌতি দরকার। বেশি কষ্ট হবে না। একটা পাঁচনের মধ্যে মিনিট দশেক সেদ্ধ করে নেব তোমাকে, তাতেই আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসবে।
বটে!–বলে কালো জিনিসটা এগিয়ে এল।
নিশি কবরেজ আর দেরি করলেন না। নিশুতিরাতেই পাঁচনটা উনুনে বসিয়ে কোমর বেঁধে লেগে গেলেন। ভূতটা সেদ্ধ হতে হতে মাঝখানেই মাথা তুলে বলে, হলো?
নিশি কবরেজ অমনি কাঠের হাতাটা দিয়ে সেটাকে ঠেসে দিতে দিতে বলেন, হচ্ছে হে হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করলে কি হয়? তোমার তো আর গায়ে ফোস্কা পড়ছে না হে!
পাঁচনটা ভোররাতে তৈরি হয়ে গেল। আর আশ্চর্যের বিষয় ভূতের ঝুলকালো রংটাও একটু ফ্যাকাসে মারল। নিশি কবরেজ খুব ভাল করে জিনিসটাকে নিরীক্ষণ করে বললেন, আরে, তুমি তো রামহরি!
ভুতটা একথায় ভারি খুশি হয়ে বলল, আজ্ঞে বাঁচালেন, ধনঞ্জয়ের কাছে রামহরি গোটা তিনেক টাকা পেত কিনা। ভারি দুশ্চিন্তা ছিল আমার। পেন্নাম হই আজ্ঞে বলে ভূতটা মিশে গেল।
নিশি কবরেজ পাঁচনটা বোতলে পুরে নিশ্চিন্ত মনে তামাক খেতে বসলেন, বড্ড ধকল গেছে।
পকেটমার
হরবাবুর সঙ্গে কুঞ্জ সেনের বাজারেই দেখা হয়ে গেল। দুজনেই পুরোনো বন্ধু। হরবাবু এখানে ছিলেন না। মঙ্গলগ্রহের মাটিতে চাষবাস নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কুঞ্জ সেন ছিলেন আরও দূরে। নেপচুনের চারদিকে আবহমণ্ডল রচনার গুরুতর কাজে প্রায় ত্রিশ বছর সেখানে থাকতে হয়েছে। গড়িয়াহাট বাজারে দুজনের দেখা হয়ে গেল এক সকালবেলায়।
আরে! হর যে?
কুঞ্জ না? কী খবর?
ভারী খুশি হলেন দু’জনে। পুরোনো দিনের কথাবার্তা হল খানিকক্ষণ। কুঞ্জ সেন বললেন, সবই পাল্টে গেছে হে! এই গড়িয়াহাটে মার্কেট মাত্র ত্রিশ বছর আগেও ছিল একশ তিনতলা একটা ছোটো বাড়ি। এখন দেখ তো কেমন তিনশ তলা অবধি তুলে ফেলেছে।
হরবাবু বললেন শুধু কী তাই! আগে দু’চারটে রোবট দোকানদার ছিল। এখন সবকটাই রোবট। আর এরা ভারী বেরসিক। সবজি বাজারে একটা রোবটকে ডাঁটার দর দু’টাকা কমাতে বলেছি। অমনি মুখখানা এমন আঁশটে করে ঘসকে ছিল যে অপমান বোধ করলুম।
কুঞ্জ যেন একটা শ্বাস ফেলে বললেন, দর বেশ চড়া। ত্রিশ বছর আগে কুঁচো চিংড়ির দর ছিল আড়াই হাজার টাকা কিলো। এখন পাঁচ হাজারের নীচ পাবে না। নেপচুনে তো এখনও চাষবাস ইত্যাদি শুরু হয়নি। ভ্যাকুয়াম প্যাকের খাবার খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেল। তাই ভাবছিলুম একটু পালং-চিংড়ির ঘণ্ট খাবো।
হরবাবু একগাল হেসে বললেন, আমাদের মঙ্গলে ভায়া, সমস্যা নেই। গ্রিণ হাউসে দিব্যি সবজির চাষ হয়। মাছের ব্যবস্থাও হয়েছে। সব টাটকা।
তোমার কপাল ভাল। তা কদিন থাকবে এখানে?
দেখি। মঙ্গল থেকে বৃহস্পতি বা অন্য কোথাও পাঠাতে পারে। তোমার নেপচুনে থাকার মেয়াদ আর কত দিনের?
হয়ে এল। সামনের বছরেই চাদে চলে আসছি। ওখানে একটু জমি কিনে বাড়িও করে রেখেছি আগে থেকে।
ভালো করেছে। থাকার পক্ষে চাঁদই এখন ভাল। পৃথিবীর পলিউশনটা ওখানে নেই। দিব্যি গাছপালা হয়েছে। রাস্তাঘাট ভাল। পৃথিবীর সব জিনিসই পাওয়া যায়। আমিও ভাবছি একটু জমি কিনে রাখব।
চলে এসো চাঁদে। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে রোজ।
গল্প করতে করতে দুই বন্ধুতে একটা দোকানে গিয়ে ঢুকলেন। বড় মুদির দোকান। খদ্দের গিজগিজ করছে। চারটে রোবট হিমশিম খাচ্ছে খদ্দের সামলাতে।
হরবাবু বললেন, ভীড় দেখেছো? পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়ে গেল নাকি?
না হে। এসবই গ্রহান্তর থেকে আসা প্রবাসী। যাওয়ার আগে জিনিসপত্র কিনে নিচ্ছে। তা তুমি কী নেবে?
হরবাবু বললেন, দুশো গ্রাম পোস্ত নেবো, একটু ছুঁড়ো হলুদ আর গরম মশলা।
আমি নেবো ধনে, জিরে, আদা, নুন আর সর্ষের তেল। ওহে ও রোবট ভায়া, এই আমার ফর্দখানা নেবে নাকি?
রোবট গম্ভীর গলায় বলে, একটু দাঁড়াতে হবে।
