সন্ধ্যেবেলা বরদা এসে বললেন, “কেমন লাগছে নয়নচাঁদবাবু, ভয় পাচ্ছেন না তো?”
‘ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছি বাবা।”
“ভয় পাবেন না। আজ রাত্রে আরও দুখানা পরোটা বেশী খাবেন। কাল সকালে যত ভিখিরি আসবে কাউকে ফেরাবেন না। মনে থাকবে?”
নয়নচাঁদ হাঁপছাড়া গলায় বললেন, “তাই হবে বাবা, তাই হবে। সব বিলিয়ে দিয়ে লেংটি পরে হিমালয়ে চলে যাব, যদি তাতে তোমার সাধ মেটে।”
পরদিন সকালে উঠে নয়নচাঁদের চক্ষু চড়ক গাছ। ভিক্ষে দেওয়া হয় না বলে এ বাড়িতে কখনও ভিখিরি আসে না। কিন্তু সকালে নয়নচাঁদ দেখেন, বাড়ির সামনে শয়ে শয়ে ভিখিরি জুটেছে। দেখে নয়নচাঁদ মূৰ্ছা গেলেন। মূর্ছা ভাঙার পর বেজার মুখে উঠলেন। সিন্দুক খুলে টাকা বের করে চাকরকে দিয়ে ভাঙিয়ে আনলেন। ভিখিরিরা যখন বিদেয় নিল তখন নয়নাদের হাজার খানেক টাকা খসে গেছে।
নয়নচাঁদ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। হাজার টাকা যে অনেক টাকা!
দুপুরে একরকম উপোস করেই কাটালেন নয়নচাঁদ। টাকার শোক তো কম নয়।
নিজের ঘরে শুয়ে থেকে একটু তন্দ্রাও এসে গিয়েছিল। যখন তন্দ্রা ভাঙল তখন চারদিকে অমাবস্যার অন্ধকার। ঘরে কেউ আলোও দিয়ে যায়নি। আতঙ্কে অস্থির হয়ে নয়নচাঁদ চেঁচালেন, “ওরে কে আছিস?”
কেউ জবাব দিল না।
ঘাড়টা কেমন সুড়সুড় করছিল নয়নাদের। বুকটা ছমছম। চারদিকে কিসের যেন একটা ষড়যন্ত্র চলছে অদৃশ্যে। ফিসফাস কথাও শুনতে পাচ্ছেন।
নয়নচাঁদ সভয়ে কাঠ হয়ে জানালাটার দিকে চেয়ে রইলেন। হঠাৎ সেই অন্ধকার জানালায় একটা ছায়ামূর্তি উঠে এল।
নয়নাদ আর সহ্য করতে পারলেন না। হঠাৎ তেড়ে উঠে জানালার কাছে ধেয়ে গিয়ে বললেন, “কেন রে ভূতের পো, আর কোন্ পাপটা আছে আমার শুনি? আর কোন্ কর্মফল বাকি আছে? হোড়াই পরোয়া করি তোর?”
একটা টর্চের আলোয় ঘরটা ভরে গেল হঠাৎ। জানালার বাইরে থেকে বরদাচরণ বললেন, “ঠিকই বলেছেন নয়নবাবু। আপনার আর পাপটাপ নেই। ঘাড়ও কেউ মটকাবে না। অমাবস্যা একটু আগেই ছেড়ে গেছে।”
“বটে?”
“তবে ফের অমাবস্যা আসতে আর কতক্ষণ? এবার থেকে যেমন। চালাচ্ছেন তেমনি চালিয়ে যান। সকালে ভিখিরি বিদেয়, দুপুরে ভরপেট খাওয়া, বিকেলে দানধ্যান সৎচিন্তা, রাত্রে পরোটা, মনে থাকবে?”
নয়নাদ একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, “থাকবে বাবা থাকবে।”
নিশি কবরেজ
হারানো একটা পুঁথিতে নিশি কবরেজ একটা ভারী জব্বর নিদান পেয়েছেন। গাঁটের ব্যথার যম। তবে মুশকিল হলো পাঁচনটা তৈরি করতে যে পাঁচরকম জিনিস লাগে তার চারটে যোগাড় করা যায়। কিন্তু পাঁচ নম্বরটাই গোলমেলে। পাঁচ নম্বর জিনিসটা হচ্ছে আধ ছটাক ভূত।
নিশি কবরেজ রাতে খাওয়ার পর দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আচমন করছিলেন। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার রাত্রি। চারদিক নিঃঝুম। শীতকালের কুয়াশা আর ঠাণ্ডাটাও জেঁকে পড়েছে। আঁচাতে আঁচাতে নিশি কবরেজ পাঁচনটার কথাই ভাবছিলেন। রাজবল্লভবাবু বিরাট বড়লোক! কিন্তু গাঁটের ব্যথায় শয্যাশায়ী। ব্যথাটা আরাম করতে পারলে রাজবল্লভবাবু হাজার টাকা অবধি দিতে রাজি বলে নিজে মুখে কবুল করেছেন। কিন্তু ভূতটাই সব মাটি করলে। আধ ছটাক ভূত এখন পান কোথায়? হঠাৎ নিশি কবরেজের মনে হলো, উঠোনের ওপাশটায় হাঁসের ঘরের পাশটায় কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
–কে রে? ওখানে কে?
কেউ জবাব দিল না।
নিশি কবরেজ জলের ঘটিটা ঘরে রেখে হ্যারিকেন আর লাঠিগাছাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। দিনকাল ভাল নয়। চোর ছ্যাচড়ের দারুণ উপদ্রব। ঘরে কিছু কাঁচা টাকাও আছে। সোনাদানাও মন্দ নেই।
বাঁহাতে হ্যারিকেনটা তুলে ডানহাতের লাঠিটা নাচাতে নাচাতে কয়েক পা এগোতেই উঠোনের ওপাশ থেকে একটু গলা খাঁকারির বিনয়ী শব্দ হলো। চোরের তো গলা খাঁকারি দেওয়ার কথা নয়।
–কে রে? ওখানে কে? ওপাশ থেকে খোনাসুরে জবাব এল। ইয়ে, আমি হলুম গে রামহরি–না, না, থুড়ি, আমি হলুম ধনঞ্জয়।
নিশি কবরেজ আলোটা ভাল করে তুলে ধরে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করতে করতে বললেন, রামহরি বা ধনঞ্জয় নামে এ গাঁয়ে আবার কে আছে? কোথা থেকে আসা হচ্ছে শুনি? দরকারটাই বা কী? রুগী দেখতে হলে রাতে বিশেষ সুবিধা হবে না বলে রাখছি। দিনেরবেলা এস।
কে যেন বলে উঠল, আজ্ঞে ওসব কিছু নয়।
নিশি কবরেজ লোকটাকে ঠিক ঠাহর করতে পারছেন না। তার চোখের জোর কিছু কম নয়। হ্যারিকেনেও কালি পড়েনি। তবু ভালমতো লোকটাকে দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু বুঝতে পারছেন, হাঁসের ঘরের পাশে খুব কালো একটা লম্বাপানা ছায়া ছায়া কী যেন।
নিশি কবরেজ মনে মনে ভাবলেন, এঃ চোখের বোধহয় বারটা বাজল এতদিনে। না, কাল থেকে চোখে তিন বেলা ত্রিফলার জল দিতে হবে।
নিশি কবরেজ বললেন, রুগীর ব্যাপার নয় তো এত রাতে চাও কি? চোরটোর নও তো বাপু?
–আজ্ঞে না, চোর-ডাকাত হওয়ার উপায়ও নেই কিনা। একটা সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এসেছিলুম আজ্ঞে।
–সমস্যাটা কী?
–আজ্ঞে বলে দিতে হবে যে আমি রামহরি, না ধনঞ্জয়। নিশি কবরেজ খ্যাক করে উঠে বললেন, ইয়ার্কি হচ্ছে? তুমি রামহরি ধনঞ্জয় তা আমি কি করে বলব? আমি তোমাকে চিনিই না।
–আজ্ঞে আপনি আমাদের চেনেন–থুড়ি-চিনতেন! আমরা দুজনেই গেলবার ওলাউঠায় মরলুম, মনে নেই? আপনার পাঁচন ফেল মারল।
