“না বাবা, কৃপণ নই! হিসেবী বলতে পারো।”
“আমার ফিস কত জানেন? পাঁচশো টাকা, আর খরচপাতি যা লাগে।”
নয়নাদ ফের ভিরমি খেলেন। এবার জ্ঞান ফিরতে তার কিছুক্ষণ সময়ও লাগল।
বরদা বিরক্ত হয়ে বললেন, “কৃপণ বা হিসেবী বললে আপনাকে কিছুই বলা হয় না। আপনি যাচ্ছেতাই রকমের কৃপণ। বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে কৃপণ লোক আপনিই।”
নয়নচাঁদ মুখখানা ব্যাজার করে বললেন, “পাড়ার লোক হয়ে তুমি পাঁচশো টাকা চাইতে পারলে? তোমার ধর্মে সইল?”
“আপনার প্রাণের দাম কি তার চেয়ে বেশী নয়?”
“কিছু কমই হবে বাবা। হিসেব করে দেখেছি আমার প্রাণের দাম আড়াইশো টাকার বেশী নয়।”
“তবে আমি বললুম, ভিজিট বাবদ কুড়িটা টাকা আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন।”
নয়নচাঁদ আঁতকে উঠে বললেন, “যেও না বাবা বরদা, ওই পাঁচশো টাকাই দেবোখন।”
বরদাচরণ এবার পাইপ বেয়ে নেমে সিঁড়ি বেয়ে ঘরে এসে উঠলেন। হাত বাড়িয়ে বললেন, “চিঠিটা দেখি।”
চিঠিটা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটা পড়লেন। কালিটা পরীক্ষা করলেন। কাগজটা পরীক্ষা করলেন। আতসকাঁচ দিয়ে অক্ষরগুলো দেখলেন ভাল করে। তারপর নয়নাদের দিকে চেয়ে বললেন, “এটা কি জনার্দনেরই হাতের লেখা?”।
“ঠিক বুঝতে পারছি না। জনার্দন কয়েকটা হ্যাঁণ্ডনোট আমাকে লিখে দিয়েছিল। সেই লেখার সঙ্গে অনেকটা মিল আছে।”
বরদা বললেন, “হুঁ মনে হচ্ছে গামছাটা তেমন টেকসই ছিল না।”
“তবে মানে কী বাবা? এখানে গামছার কথা ওঠে কেন?”
“গামছাই আসল। জনার্দন গলায় গামছা বেঁধে ফঁসে লটকেছিল তো! মনে হচ্ছে গামছা ছিঁড়ে সে পড়ে যায় এবং বেঁচেও যায়। এ চিঠি যদি তারই লেখা হয়ে থাকে তো বিপদের কথা! আপনি বরং কটা দিন একটু ভাল খাওয়া-দাওয়া করুন। আমোদ-আহ্লাদও করে নিন প্রাণভরে।”
“তার অর্থ কী বাবা। কী বলছো সব? আমি জীবনে কখনও ফুর্তি করিনি। তা জানো?”
“জানি বলেই বলছি। টাকার পাহাড়ের ওপর শকুনের মতো বসে থাকা কি ভাল? অমাবস্যার তো আর দেরিও নেই।”
নয়নচাঁদ বাক্যহারা হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “জনার্দন যে মরেছে তার সাক্ষীসাবুদ আছে। লাশটা সনাক্ত করেছিল তার আত্মীয়রাই।”
“তবে তো আরও বিপদের কথা। এ যদি ভূতের চিঠি হয়ে থাকে তবে আমাদের তো কিছুই করার নেই।”
নয়নাদ এবার ভ্যাক করে কেঁদে উঠে বললেন, “প্রাণটা বাঁচাও বাবা বরদা, যা বলো তাই করি।”
বরদা এবার একটু ভাবলেন। তারপর মাথাটা নেড়ে বললেন, “ঠিক আছে, দেখছি।”
এই বলে বরদাচরণ বেরিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন তিন দিন পর। মাথার চুল উসকোখুসকো, গায়ে ধুলো, চোখ লাল। বললেন “পেয়েছি।”
নয়নাদ আশান্বিত হয়ে বললেন, “পেরেছো ব্যাটাকে ধরতে? যাক বাঁচা গেল।”
বরদা মাথা নেড়ে বললেন, “তাকে ধরা অত সহজ নয়। তবে জনার্দনের বউ ছেলে মেয়ের খোঁজ পেয়েছি। এই শহরেরই একটা নোংরা বস্তিতে থাকে, ভিক্ষে-সিক্ষে করে পরের বাড়িতে ঝি চাকর খেটে কোনও রকমে বেঁচে আছে।”
“অ, কিন্তু সে খবরে আমাদের কাজ কী?”
বরদা কটমট করে চেয়ে থেকে বললেন, “চিঠিটা যদি ভাল করে পড়ে থাকেন তবে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, ভূতটার কেন আপনার ওপর রাগ! তার বউ ছেলে মেয়ে ভিখিরি হয়ে যাওয়াটা সে সহ্য করতে পারছে না।”
“তা বটে।”
“যদি বাঁচতে চান তো তাদের আগে ব্যবস্থা করুন।”
“কী ব্যবস্থা বাবা বরদা?”
“তাদের বাড়ি ঘর ফিরিয়ে দিন। আর যা সব ক্রোক করেছিলেন তাও।”
“ওরে বাবা! তার চেয়ে যে মরাই ভাল।”
“আপনি চ্যাম্পিয়ন।”
“কিসে বাবা বরদা!”
“কিপটেমিতে। আচ্ছা আসি, আমার কিছু করার নেই কিন্তু।”
“দাঁড়াও দাঁড়াও। অত চটো কেন? জনার্দনের পরিবারকে সব ফিরিয়ে দিলে কিছু হবে?”
‘মনে হয় হবে। তারপর আমি তো আছিই।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নয়নচাঁদ বললেন, “তাহলে তাই হবে বাবা।”
অমাবস্যার আর দেরী নেই। মাঝখানে মোটে সাতটা দিন। নয়নচাঁদ জনার্দনের ঘরবাড়ি, জমিজমা, ঘটিবাটি এবং সোনাদানা সবই তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। জনার্দনের বউ আনন্দে কেঁদে ফেলল। ছেলেমেয়েগুলো বিহ্বল হয়ে গেল।
বরদা নয়নচাঁদকে বললেন, “আজ রাতে রুটির বদলে ভাল করে পরোটা খাবেন। সঙ্গে ছানার ডালনা আর পায়েস।”
“বলো কী?”
“যা বলছি তাই করতে হবে। আপনার প্রেশার খুব লো। শক টক খেলে মরে যাবেন।”
“তাই হবে বাবা বরদা। যা বলবে করব। শুধু প্রাণটা দেখো।”
নয়নচাঁদ পরোটা খেয়ে দেখলেন, বেশ লাগে। কোনোদিন খাননি। ছানার ডালনা খেয়ে আনন্দে তার চোখে জল এসে গেল। আর পায়েস খেতে খেতে পূর্বজন্মের কথাই মনে পড়ে গেল তার। না, পৃথিবী জায়গাটা বেশ ভালই।
সকালবেলাতেই বরদা জানালা দিয়ে উঁকি মারলেন।
“এই যে নয়নচাঁদবাবু, কেমন লাগছে?”
“গায়ে বেশ বল পাচ্ছি বাবা। পেটটাও ভুটভাট করছে না তেমন।”
“আপনার কাছারিঘরে বসে কাগজপত্র সব দেখলাম। আরও দশটা পরিবার আপনার জন্য পথে বসেছে। তাদের সব সম্পত্তি ফিরিয়ে না দিলে কেসটা হাতে রাখতে পারব না।”
“বলো কী বাবা বরদা? এরপর যে আমিই পথে বসব।”
“প্রাণটা তো আগে।”
কী আর করেন, নয়নাদ বাকি দশটা পরিবারের যা কিছু দেনার দায়ে দখল করেছিলেন তা সবই ফিরিয়ে দিলেন। মনটা একটু দমে গেল বটে, কিন্তু ঘুমটা হলো রাত্রে।
অমাবস্যা এসে পড়ল প্রায়। আজ রাত কাটলেই কাল অমাবস্যা লাগবে।
