ওরে ও বিলাস, তোর কেলে গরু যে আমার ক্ষেতে ঢুকে যাচ্ছে, এখনই সব তছনছ করবে। ওটি সাঙ্ঘাতিক দুষ্ট গাই।
বিলাস তাড়াতাড়ি রিমোট তুলে বোতাম টিপতেই কেলে গরুটা থমকে একটু শিং নাড়া দিল। তারপর সুড়সুড় করে আবার ফিরে এসে ঘাস খেতে লাগল। বিলাস বলল, রামরতনদা, তোমার রিমোটটা আমাকে দিয়ে তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি মৃগনয়নীকে সামলে রাখব’খন।
বাঁচালি ভাই, এই নে, বলে রিমোটটা বিলাসকে দিয়ে রামরতন সবে চোখ বুজেছে এমন সময় হঠাৎ মৃগনয়নী কাজ ফেলে দুড়দাড় করে দৌড়ে এল। ও বাবা!
রামরতন বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে বলল, কী বলছিস?
ভূতে ঢেলা মারছে যে!
অ্যাঁ!
এই অ্যাত বড় বড় ঢেলা। এই দেখ। বলে মৃগনয়নী একটা ঢেলা হাতের মুঠো খুলে দেখাল।
আর এই সময়েই আরও দু চারটে ঢেলা ওদিককার ক্ষেত থেকে উড়ে এসে আশেপাশে পড়ল। ব্যাপারটা নতুন নয়, আগেও দু’চারবার হয়েছে। রামরতন শুকনো মুখে বিলাসের দিকে চেয়ে বলে, কি করি বল তো!
বিলাস বলল, কার ভূত?
তা কি করে বলব?
দাঁড়াও, থিওসফিক্যাল ল্যাবরেটরিতে ফোন করে জেনে নিচ্ছি।
বিলাস ডায়াল করে জিজ্ঞেস করল, ও মশাই, হক সাহেবের মাঠে কার ভূত দৌরাত্ম করছে তা জানেন?
ও হলো ষষ্ঠীচরণ সাহার ভূত। ওকে চটাবেন না।
কিছু একটা করুন। ক্ষেতের কাজ যে বন্ধ হওয়ার জোগাড়।
সে আমাদের কম্ম নয়। ভূতের সঙ্গে কে এঁটে উঠবে? তাহলে?
চোখ কান বুজে সয়ে নিন। কিছু করার নেই।
বিলাস ফোন বন্ধ করে বলে, ষষ্ঠী খুড়োর ভূত। কেউ কিছু করতে পারবে না।
রামরতন একটু খিঁচিয়ে উঠে মৃগনয়নীকে বলে, তোর এত আদিখ্যেতা কিসের? ঢেলা পড়ছে তো পড়ুক না। তোর তো আর ব্যথা লাগবার কথা নয়!
মৃগনয়নীর চোখ ভরে জল এল। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, না, লাগেনি। বুঝি! এই দেখ না কনুইয়ের কাছটা কেমন ফুলে আছে।
সত্যিই জায়গাটা ফোলা দেখে রামরতনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বিলাসের দিকে চেয়ে বলল, এ কী রে? রোবটেরও যে ব্যথা লাগছে আজকাল।
বিলাস বলল, শুধু কি তাই? চোখে জল, ঠোঁটে অভিমান, নাঃ, দিনকাল যে কী রকম পড়ল।
রামরতন মৃগনয়নীকে বকবে বলে বড় বড় চোখ করে ধমকাতে যাচ্ছিল, মৃগনয়নী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, তুমি আমাকে একটুও ভালবাস না কেন বাবা?
রামরতনের রাগ জল হয়ে গেল। ঠিক বটে, সে মানুষ আর মৃগনয়নী নিতান্তই যন্ত্র-বালিকা। কিন্তু সবসময়ে কি আর ওসব খেয়াল থাকে? রামরতন হাত বাড়িয়ে মৃগনয়নীকে কাছে টেনে এনে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, কঁদিসনে মা, তোকে খুব সুন্দর একটা ডলপুতুল, কিনে দেবো।
বিলাস মুখটা ফিরিয়ে একটু হাসল।
দুই পালোয়ান
পালোয়ান কিশোরী সিং-এর যে ভূতের ভয় আছে তা কাক পক্ষিতেও জানে না। কিশোরী সিং নিজেও যে খুব ভাল জানত এমন নয়।
আসলে কিশোরী ছেলেবেলা থেকেই বিখ্যাত লোক। সর্বদাই চেলাচামুণ্ডারা তাকে ঘিরে থাকে। একা থাকার কোন সুযোগই নেই তার। আর একথা কে না জানে যে একা না হলে ভূতেরা ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারে না। জো পায় না।
সকালে উঠে কিশোরী তার সাকরেদ আর সঙ্গীদের নিয়ে হাজার খানেক বুকডন আর বৈঠক দেয়। তারপর দঙ্গলে নেমে পড়ে। কোস্তাকুস্তি করে বিস্তর ঘাম ঝরিয়ে দুপুরে একটু বিশ্রাম। বিকেলে প্রায়ই কারও
কারও সঙ্গে লড়াইতে নামতে হয়। সন্ধ্যের পর একটু গানবাজনা শুনতে ভালবাসে কিশোরী। রাতে সে পাথরের মতো পড়ে এক ঘুমে রাত কাবার করে। তখন তার গা হাত পা দাবিয়ে দেয় তার সাকরেদরা। এই নিচ্ছিদ্র রুটিনের মধ্যে ভূতেরা ঢুকবার কোনও ফঁকই পায় না।
গণপত মাহাতো নামে আর একজন কুস্তিগীর আছে। সেও মস্ত পালোয়ান। দেশ বিদেশের বিস্তর দৈত্য দানবের মতো পালোয়ানকে সে কাৎ করেছে। কিন্তু পারেনি শুধু কিশোরী সিংকে। অথচ শুধু কিশোরী সিংকে হারাতে পারলেই সে সেরা পালোয়ানের খেতাবটা জিতে নিতে পারে।
কিন্তু মুস্কিল হল নিতান্ত বাগে পেয়েও নিতান্ত কপালের ফেরে সে কিশোরীকে হারাতে পারেনি। সেবার লক্ষ্ণৌতে কিশোরীকে সে যখন চিৎ করে প্রায় পেড়ে ফেলেছে সেই সময়ে কোথা থেকে হতচ্ছাড়া এক মশা এসে তার নাকের মধ্যে ঢুকে এমন পন পন করতে লাগল হাঁচি না দিয়ে আর উপায় রইল না তার। আর সেই ফাঁকে কিশোরী তার প্যাঁচ কেটে বেরিয়ে গেল। আর দ্বিতীয় হচিটার সুযোগে তাকে রদ্দা মেরে চিৎ করে ফেলে দিল।
পাটনাতেও ঘটল আর এক কাণ্ড। সেবার কিশোরীকে বগলে চেপে খুব কায়দা করে স্ক্রু প্যাঁচ আঁটছিল গণপত। কিশোরীর তখন দমসম অবস্থা। ঠিক সেই সময়ে একটা ষাঁড় ক্ষেপে গিয়ে দঙ্গলের মধ্যে ঢুকে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড বাধিয়ে দিল। কিন্তু গণপত দেখল এই সুযোগ হাতছাড়া হলে আর কিশোরীকে হারানো যাবে না। সুতরাং সে প্যাঁচটা টাইট রেখে কিশোরীকে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার ফিকির খুঁজছিল। সেই সময় ষাঁড়ের তাড়া খেয়ে দর্শকরা সব পালিয়েছে আর ষাঁড়টা আর কাউকে পেয়ে দুই পালোয়নের দিকেই তেড়ে এল।
কিশোরী তখন বলল, গণপত, ছেড়ে দাও। ষাঁড় বড় ভয়ঙ্কর জিনিস।
গণপত বলল, ষাঁড় তো ষাঁড়, স্বয়ং শিব এলেও ছাড়ছি না। ষাঁড়টা গুতোতে এলে গণপত অন্য বগলে সেটাকে চেপে ধরল। সে যে কী সাংঘাতিক লড়াই হয়েছিল তা যে না দেখেছে সে বুঝবে না। দেখেছেও অনেকে। গাছের ডালে ঝুলে, পুকুরের জলে নেমে, বাড়ির ছাদে উঠে যারা আত্মরক্ষা করছিল তারা অনেকেই দেখেছে। গণপত লড়াই করছে দুই মহাবিক্রম পালোয়ানের সঙ্গে-ষাঁড় এবং কিশোরী সিং। গাছের ডালে ঝুলে, পুকুরে ডুবে থেকেও সে লড়াই দেখে লোকে চেঁচিয়ে বাহবা দিচ্ছিল গণপতকে।
