রামরতন তার দিকে চেয়ে বিরক্ত মুখে বলল, চার একর জমিতে ধান রুইতে বড় জোর আধঘণ্টা লাগবার কথা। আর ওই বিচ্ছু মেয়ে ঝাড়া দু ঘণ্টায় এক একরও পারেনি।
বিলাস তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে, স্পিডটা একটু বাড়িয়ে দাও না। যন্তর তো তোমার হাতেই রয়েছে।
রামরতন বিরক্ত হয়ে বলে, তাহলে তো কথাই ছিল না। এঁর তো গুণের শেষ নেই। যেই স্পিড বাড়াবো অমনি ফাঁক ফাঁক করে বুনতে শুরু করবে। তাতে কাজ বাড়বে বই কমবে না।
যন্তরটা তাহলে তোমাকে খারাপই দিয়েছে। বদল করে নাও না কেন?
রামরতন এবার তার চেয়ারে লাগানো নম্বরের স্লেটে একটা নম্বর টিপল। তার চেয়ারটা সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে উঠে ভাসতে ভাসতে বিলাসের চেয়ারের পাশে এসে নামল। রামরতন টিসু কাগজে মুখ মুছে বলে, সে চেষ্টা কি আর করিনি নাকি? ও মেয়েকে তুমি চেনো না। যন্ত্রবালিকা হলে কি হয়, মাথায় খুব বুদ্ধি। চার মাস হলো কিনেছি গুচ্ছের টাকা দিয়ে, দু বছরের গ্যারান্টি আছে। কাজে দোষ হলে বদলে দেবে বা টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু এ মেয়েটা বাড়িতে ঢুকেই আমাকে বাবা বলে, আর আমার গিন্নিকে মা বলে ডাকতে শুরু করেছে। চালাকিটা দেখেছ? এখন আমার গিন্নির এত মায়া পড়ে গেছে যে মৃগনয়নীকে ফেরৎ দেওয়ার কথা শুনলেই খেপে ওঠেন।
মৃগনয়নী কি ওর নাম?
আমার গিন্নির দেওয়া। মেয়েটাকে নিয়ে জেরবার হচ্ছি। ওই দেখ, আবার খেলতে লেগেছে।
বাস্তবিকই মৃগনয়নী ধান রোয়া ফেলে একটা স্কিপিং দড়িতে তিড়িং তিড়িং করে লাফাচ্ছিল। মুখে হাসি।
রামরতন রিমোটটা তুলে ধরে বোতাম টিপে মেয়েটাকে ফের কাজে লাগিয়ে দিয়ে বলল, সারাক্ষণ এই করতে হচ্ছে। সকালে পান্তাভাত খেয়ে এসেছি, কোথায় একটু ঝিম মেরে চোখটি বুজে থাকব, তার উপায় নেই।
ফেরত না দাও, রিপ্রোগ্রামিং করিয়ে নিলেই তো পারো। ওরা ডিস্কটা ভাল করে পুঁছে আবার প্রোগ্রাম করে দেবে।
রামরতন বিমর্ষ মুখে বলে, সে চেষ্টাও কি আর করিনি? গিন্নি তাও করতে দিচ্ছে না। বলে, ও যে দুষ্টুমি করে, খেলে তাতেই আমার বেশি ভাল লাগে। এ সময়টায় একটু ভাত-ঘুম ঘুমিয়ে না নিলে আমার শরীরটা বড় ম্যাজম্যাজ করে।
রামরতন গোটা দুই হাই তুলল, দেখে বিলাস সমবেদনার সঙ্গে বলল, একটা হর্ষ-বড়ি খেয়ে নেবে নাকি? তাহলে বেশ চাঙ্গা লাগবে। আমার কাছে আছে।
রামরতন মাথা নেড়ে বলে, না রে ভাই। সেদিন একটা খেয়ে যা অবস্থা হলো, আনন্দের চোটে মন নাচানাচি, লাফালাফি, চেঁচামেচি করেছি যে পরে গা-গতরে ব্যথা হয়ে গলা ভেঙে কাহিল অবস্থা।
মুড়ি চিবোতে চিবোতে বিলাস বলে, তা তোমার তো প্লাস্টিকের হার্ট, তুমি কাহিল হয়ে পড়ো কেন? প্লাস্টিকের হার্টওলা লোকেরা নাকি সহজে কাহিল হয় না।
সে কথা ঠিক। তবে আমার কপালটাই তো ওরকম। যে হার্টটা বসানো হয়েছে সেটা নাকি বাঙালিদের ধাত অনুযায়ী টিউন করা নয়, তখন বাঙালী হার্টের সাপ্লাই ছিল না বলে আমাকে একটা জার্মান হার্ট লাগিয়ে দিয়েছে, সেটা একটু বেশি শক্তিশালী! ফলে আমার শরীরের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। মাস তিনেক বাদে বাঙালি হার্ট এলে এটা বদলে দেবে বলেছে।
দুজনে কথা হচ্ছে এমন সময়ে হঠাৎ আকাশে একটা গোলগোল মেঘ দেখা দিল, আর ছাড় ছাড় করে বৃষ্টি হতে লাগল।
বিলাস চমকে উঠে বলে, আরে! বৃষ্টি হচ্ছে কেন? এখন তো বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়! দেখ তো মুড়িগুলো ভিজে গেল!
আমারও আবার সর্দির ধাত। বলে রামরতন হাতের রিমোটটা উলে নম্বর ডায়াল করতে লাগল। রিমোটটার উল্টো পিঠটা টেলিফোনের কাজ করে।
রামরতন বলল, হাওয়া অফিস? তা ও মশাই, হক সাহেবের মাঠে এখন বৃষ্টি হওয়াচ্ছেন কেন? আমরা তো বৃষ্টি চাইনি।
হাওয়া অফিস খুব লজ্জিত হয়ে বলে, এঃ হেঃ সরি, একটু ভুল হয়ে গেছে। আসলে ওটা হওয়ার কথা সাহাগঞ্জের মাঠে। ঠিক আছে আমরা মেঘটাকে সরিয়ে দিচ্ছি।
মেঘটা হঠাৎ একটা চক্কর খেয়ে ভো করে মিলিয়ে গেল। আবার রোদ দেখা দিল।
বিলাস ক্ষুব্ধ গলায় বলে, হাওয়া অফিসটা আর মানুষ হলো না। সব সময়ে ক্যালকুলেশনে ভুল করে যা নয় তাই ঘটিয়ে দিচ্ছে। এ হলো ফিনল্যান্ডের বাবু-মুড়ি, জল লাগলেই গলে যায়। ওই তো কত ফিরিওলা চরে বেড়াচ্ছে। একটাকে ডেকে মুড়ি কিনে নে না।
বাস্তবিকই আকাশে ইতস্তত কয়েকটা বাটির মতো আকারের জিনিস শ্লথ গতিতে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের তলায় কোনোটায় লেখা জলখাবার, কোনোটায় লেখা প্রসাধন সামগ্রী, কোনোটায় লেখা বৈদ্যুতিক সামগ্রী মেরামত ইত্যাদি।
বিলাস বাঁশিটা মুখে নিয়ে বাঁশির গায়ে একটা বোতাম টিপে ফুঁ দিল। কোনো শব্দ হলো না। কিন্তু আকাশ থেকে একখানা বাটি নেমে এসে তার সামনে থামল। বাটিতে মেলা খাবার জিনিস সাজানো। দোকানি একজন বুড়ো মানুষ। বলল, কী চাই?
ফিনল্যান্ডের বাবু-মুড়ি আছে নাকি?
ফিনল্যান্ডের মুড়ি আবার মুড়ি নাকি?
যন্তরে মুড়ি আছে, একবার খেলে জীবনে আর স্বাদ ভুলতে পারবে না। নাম হলো উড়ুক্কু মুড়ি।
আজকাল নিত্যি নতুন জিনিস বেরোচ্ছে। উড়ুক্কু মুড়ি বিলাস খায়নি। নিল এক প্যাকেট। দাম নিয়ে বুড়ো বাটি সমেত ফের আকাশে উঠে গেল।
বিলাস একমুঠো মুখে দিয়ে দেখল, চমৎকার, চিবোতে না চিবোতেই যেন মুখে মিলিয়ে যায়। স্বাদটাও ভাল।
