ষাঁড়ের গুঁতো, কিশোরীর হুড়ো এই দুইকে সামাল দিতে গণপত কিছু গণ্ডগোল করে ফেলেছিল ঠিকই। আসলে কোন্ বগলে কে সেইটেই গুলিয়ে গিয়েছিল তার। হুড়যুন্ধুর মধ্যে যখন সে এক বগলের আপদকে যুৎসই একটা প্যাঁচ মেরে মাটিতে ফেলেছে তখনও তার ধারণা যে চিৎ হয়েছে কিশোরীই।
কিন্তু নসিব খারাপ। কিশোরী নয়, চিৎ হয়েছিল ষাঁড়টাই। আর সেই ফাঁকে কিশোরী তার ঘাড়ে উঠে লেংগউটি প্যাঁচ মেরে ফেলে দিয়ে জিতে গেল।
তৃতীয়বার তালতলার বিখ্যাত আখড়ায় কিশোরীর সঙ্গে ফের মোলাকাৎ হল। গণপত রাগে দুঃখে তখন দুনো হয়ে উঠেছে। সেই গণপতের সঙ্গে সুন্দরবনের বাঘ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালাবে। তার হুংকারে তখন মেদিনী কম্পমান।
লড়াই যখন শুরু হল তখনই লোকে বুঝে গেল, আজকের লড়াইতে কিশোরীর কোনও আশাই নেই। কিশোরী তখন গণপতের নাগাল এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াতে ব্যস্ত।
ঠিক এই সময়ে ঘটনাটা ঘটল। ভাদ্র মাস। তালতলার বিখ্যাত পাঁচসেরী সাতসেরী তাল ফলে আছে চারধারে। সেই সব চ্যাম্পিয়ন তালদের একজন সেইসময়ে বোঁটা ছিঁড়ে নেমে এল নীচে। আর পড়বি তো পড় সোজা গণপতের মাথার মধ্যিখানে।
গণপতের ভাল করে আর ঘটনাটা মনে নেই। তবে লোকে বলে, তালটা পড়ার পরই নাকি গণপত কেমন স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে গালে হাত দিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল। সে যে লড়াই করছে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী যে কিশোরী, এবং সতর্ক না হলে যে বিপদ তা আর তার মাথায় নেই তখন। সে নাকি গালে হাত দিয়ে হঠাৎ বিড়বিড় করে তুলসীদাসের রামচরিতমানস মুখস্থ বলে যাচ্ছিল। কিশোরী যখন সেই সুযোগে তাকে চিৎ করে তখনও সে নাকি কিছুমাত্র বাধা দেয়নি। হাতজোড় করে রামজীকে প্রণাম জানাচ্ছিল।
গণপতের বয়স হয়েছে। শরীরের আর সেই তাগদ নেই। কিশোরী সিংকে হারিয়ে যে খেতাবটা সে জিততে পারল না এসব কথাই সে সারাক্ষণ ভাবে।
ভাবতে ভাবতে কী হল কে জানে। একদিন আর গণপতকে দেখা গেল না।
ওদিকে কিশোরীর এখন ভারী নামডাক। বড় বড় ওস্তাদকে হারিয়ে সে মেলা কাপ মেডেল পায়। লোকে বলে, কিশোরীর মতো পালোয়ান দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই।
তা একদিন ডাকে কিশোরীর নামে একটা পোস্টকার্ড এল। গণপতের আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষরে লেখা, ভাই কিশোরী, তোমাকে হারাতে পারিনি জীবনে এই আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ। একবার মশা, একবার ষাঁড়, আর একবার তাল আমার সাধে বাদ সেধেছে। তবু তোমার সঙ্গে আর একবার লড়বার বড় সাধ। তবে লোকজনের সামনে নয়। আমরা দুই পালোয়ান নির্জনে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করব। আমি হারালে তোমাকে গুরু বলে মেনে নেবো। তুমি হারালে আমাকে গুরু বলে মেনে নেবে। কে হারল, কে জিতল তা বাইরের কেউ জানবে না। জানব শুধু আমি, আর জানবে তুমি। যদি রাজি থাকো তবে আগামী অমাবস্যায় খেতুপুরের শ্মশানের ধারে ফাঁকা মাঠটায় বিকেলবেলায় চলে এসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।
চিঠিটা পড়ে কিশোরী একটু ভাবিত হল। সত্যি বটে, গণপত খুব বড় পালোয়ান। এবং কপালের জোরেই তিন তিনবার কিশোরীর কাছে জিততে জিততেও হেরে গেছে। অত বড় একটা পালোয়নের এই সামান্য আব্দারটুকু রাখতে কোনও দোষ নেই। হারলেও কিশোরীর ক্ষতি নেই। সাক্ষীসাবুদ তো থাকবে না। কিন্তু হারার প্রশ্নও ওঠে না। কিশোরী এখন অনেক পরিণত, অনেক অভিজ্ঞ। তাছাড়া গণপতকে যে সে খুব ভালভাবে হারাতে পারেনি সেই লজ্জাটাও তার আছে। সুতরাং লজ্জাটা দূর করার এই-ই সুযোগ। এবার গণপতকে ন্যায্যমতো হারিয়ে সে মনের খচখচানি থেকে মুক্ত হবে।
নির্দিষ্ট দিনে কিশোরী তৈরি হয়ে খেতুপুরের দিকে রওনা হল। জায়গাটা বেশি দূরেও নয়। তিন পোয়া পথ। নিরিবিলি জায়গা।
শ্মশানের ধারে মাঠটায় গণপত অপেক্ষা করছিল। কিশোরীকে দেখে খুশি হয়ে বলল, এসেছো! তাহলে লড়াইটা হয়েই যাক।
কিশোরীও গোঁফ মুচড়ে বলল, হোক।
দুজনে ল্যাঙট এঁটে, গায়ে মাটি থাবড়ে নিয়ে তৈরি হল।
তারপর দুই পালোয়ান তেড়ে এল দুদিক থেকে। কিশোরী ঠিক করেছিল, পয়লা চোটেই গণপতকে মাটি থেকে শূন্যে তুলে ধধাবিপাট মেরে কেল্লা ফতে করে দেবে।
কিন্তু সাপটে ধরার মুহূর্তেই হঠাৎ পো করে একটা মশা এসে নাকে ঢুকে বিপত্তি বাধালে। হাচ্চো হ্যাঁচুঠো হাঁচিতে গগন কেঁপে উঠল। আর কিশোরী দেখল, কে যেন তাকে শূন্যে তুলে মাটিতে ফেলে চিৎ করে দিল।
গণপত বলল, আর একবার।
কিশোরী লাফিয়ে উঠে বলল, আলবাৎ।
দ্বিতীয় দফায় যা হওয়ার তাই হল! লড়াই লাগতে না লাগতেই একটা ষাঁড় কোথা থেকে এসে যে কিশোরীর বগলে ঢুকল তা কে বলবে। কিশোরী আবার চিৎ।
গণপত বলল, আর একবার হবে?
কিশোরী বলল, নিশ্চয়ই।
কী হবে তা বলাই বাহুল্য। লড়াই লাগতে না লাগতেই দশাসই এক তাল এসে পড়ল কিশোরীর মাথায়। কিশোরী ‘পাখি সব করে রব’ আওড়াতে লাগল। এবং ফের চিৎ হল।
হতভম্বের মতো যখন কিশোরী উঠে দাঁড়াল তখন দেখল, গণপতকে ঘিরে ধরে কারা যেন খুব উল্লাস করছে। কিন্তু তারা কেউই মানুষ নয়! কেমন যেন কালো কালো, ঝুলকালির মতো রং, রোগা, তেঠেঙে লম্বা সব অদ্ভুত জীব।
জীব? না কি অন্য কিছু?
কিশোরী হাঁ করে দেখল, গণপতও আস্তে আস্তে শুকিয়ে, কালচে মেরে, লম্বা হয়ে ওদের মতোই হয়ে যেতে লাগল।
কিশোরী আর দাঁড়ায়নি, বাবা রে, মা রে’ বলে চেঁচিয়ে দৌড়াতে লেগেছে।
