বজ্ৰকুণ্ডল সাগ্রহে জিজ্ঞেস করেন, কী বাবা? ঘড়ি, না কু? বরদাচরণ মাথা নেড়ে বললেন, না। ক্লও না, ঘড়িও না। যা পেয়েছি তাতে আমি খুশিও না। তবু লোকজন ডেকে পুকুরের জলটা ঘেঁচে ফেলুন। কাউকে কিছু বলতে যাবেন না। ‘পুকুর ঘেঁচে কী পাওয়া যাবে বাবা?’ ‘ঘড়ি নয়।‘ বলে গম্ভীর মুখে শুকনো জামাকাপড় পরতে লাগলেন বরদা। মাছের লোভেজমিদারদের পুকুর হেঁচতে অবশ্য অনেক লোক জুটল। দিন দুয়েকের মধ্যে মাছ সমেত জল লোপাট। সন্ধ্যের পর বরদাচরণ বাতি হাতে বজ্ৰকুণ্ডল আর কঞ্চিকে সঙ্গে নিয়ে পিছল ঘাট বেয়ে নেমে শ্যাওলা আর কাদায় ঢাকা পাথরের দুটো চাইয়ের মুখে এসে দাঁড়ালেন। বুদ্ধি করে চাই দুটোকে জুড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন বরদা। নইলে জল হেঁচতে এসে লোকে সুড়ঙ্গটার সন্ধান পেত।
সুড়ঙ্গ বেয়ে পাতাল কুঠুরিতে পৌঁছে বরদা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, ‘ঐ সিন্দুক গুলোয় আপনার পূর্বপুরুষদের লুকোনো ধনরত্ন আছে। খুলে দেখুন। ‘বলো কী?’ বজ্রকুণ্ডল মূৰ্ছা যেতে যেতে সামলে নিলেন। তারপর শাবল আর কুন্ডুলের ঘায়ে একে একে বারোটা সিন্দুক খোলা হল। কোনোটায় মোহর, কোনোটায় হীরে জহরত, কোনোটায় চাদির টাকা, কোনোটায় সোনা-রুপোর বাসনপত্র। সে এক কুবেরের ভাণ্ডার। দেখে আত্মহারা হয়ে গেলেন বজ্রকুণ্ডল। আনন্দে কেঁদে ফেলে বললেন, ছেলেবেলা থেকে বড় কষ্টে মানুষ হয়েছি বাবা। জমিদারির ঠাটবাট রাখতে গিয়ে কাছা দিতে কেঁচায় টান পড়ত। এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। বরদাচরণ একটা কাঠের সিন্দুকের ডালার ওপর বসে গভীরভাবে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কভাবে বললেন, হুঁ। কিন্তু বেড়ালটা বাড়ির বাইরে যায়নি। তা হলে ঘড়িটা… বজ্রণ্ডল উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে বললেন, রাখো তোমার ঘড়ি। এই যা পেয়েছি তাতে হাজারটা ওরকম ঘড়ি কেনা যায়।
বরদাচরণ কটমট করে বকুণ্ডলের দিকে একবার চাইলেন। তারপর আবার গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়ে আপনমনে বললেন, ‘শেষবার বেড়ালটাকে দেখা গিয়েছিল পুকুরের ধারে, তার আগে ভাঙা নহবৎখানার ছাদে। কিন্তু সেখানেও ঘড়ি নেই। তা হলে…’।
বজ্ৰকুণ্ডল বরদাচরণের দুখানা হাত ধরে বললেন, আমি তোমাকে দশ লাখ টাকা দেবো। বুঝলে? দশ লাখ; এখন ঘড়ির চিন্তাটা ছাড়ো।’ বরদাচরণ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আপনমনে বলতে লাগলেন, তা হলে পুকুরের ধারেও যদি না এসে থাকে তবে বেড়ালটা গিয়েছিল..বলতে বলতে বরদাচরণ উঠে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে ভাঙা রসুইখানার দিকে হাঁটা দিলেন। পিছনে বজ্ৰকুণ্ডল। তিনি বার বার বলতে লাগলেন, ‘ঘড়ি আর চাই না বাবা বরদাচরণ। তোমাকে খুশি হয়ে দশ লাখ দিচ্ছি।’ বরদাচরণ আনমনে মাথা নেড়ে বললেন, উন্থ। আমার ফি একশো টাকা। তাও ঘড়ি পেলে।
‘কিন্তু এ টাকায় যে লাখ ঘড়ি কেনা যায়। বরদাচরণ ঠোঁট উল্টে বললেন, ‘ওসব মোহর সোনা হীরে এই তদন্তে অবান্তর। ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই। বলে আপনমনে বরদাচরণ বিড়বিড় করতে করতে চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে থাকেন, বেড়ালটা আর ঘড়িটা এক সূত্রে বাঁধা। বেড়ালটা বাড়ির বাইরে না গেলে ঘড়িটারও স্বাভাবিক অবস্থায় যাওয়ার কথা নয়। তা হলে…
দিনকাল
বিলাস গরু চরাতে হক সাহেবের মাঠে এসেছে। কোচড়ে মুড়ি, এক হাতে বাঁশি, অন্য হাতে রিমোট কন্ট্রোল। গরুদের প্রত্যেকটির কানের কাছে একটি করে রিসিভার যন্ত্র আছে। পাঁচনবাড়ির দরকার হয় না, রিমোটের বোতাম টিপেই ব্যাদড়া গরুকে বশে রাখা যায়।
হক সাহেবের মাঠটি চমৎকার। সবুজ দেড় বিঘা লম্বা পুষ্টিকর ঘাসে ছাওয়া। একসময়ে অবশ্য ন্যাড়া বালিয়াড়ি ছিল। প্রায় দুশো বছর আগে অর্থাৎ বাইশ শো তেষট্টি সালে অজিত কুণ্ডু নামে এক বৈজ্ঞানিক তার বিখ্যাত যান্ত্রিক ইঁদুর আবিষ্কার করলেন। ছোটো ছোটো যন্ত্রের ইঁদুর মাটিতে গর্ত করে দশ পনেরো বিশ মিটার নীচে নেমে যায় আর সেখান থেকে তুলে এনে ওপরে ছড়িয়ে দেয়। এইভাবে বালিয়াড়ি, সাহারা বা কালাহারির মতো মরুভূমি সব অদৃশ্য হয়ে এখন উর্বর মাটি, শস্যক্ষেত্র আর বনে জঙ্গলে সেসব জায়গা ভরে গেছে। মাটিকে উর্বর আর সরস রাখতে কেঁচো ও জীবাণুদের কাজে লাগানো হয়েছে। ফলটা হয়েছে চমৎকার! হক সাহেবের মাঠটি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।
পাশেই রামরতন ঘোষের মস্ত ধানক্ষেত। ক্ষেতের পাশে একটা বেলুন চেয়ারে বসে রামরতন তার রিমোট কন্ট্রোলে ক্ষেতে ধান রুইছে। রামরতনের রোবট যন্ত্রটি দেখতে অবিকল একটা বাচ্চা মেয়ের মতো। প্রোগ্রাম করে দেওয়া আছে। যন্ত্র-বালিকা ঠিকমতোই ধান রুইবে। তবে রামরতনের যন্ত্র-বালিকাটির দোষ হলো, চোখের আড়াল হলেই খানিকটা এক্কা দোক্কা খেলে নেয়। হয়তো আগে অন্যরকম প্রোগ্রাম করা ছিল, সেটা পুরোপুরি তুলে না দিয়েই নতুন প্রোগ্রাম বসিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য রামরতনের একটু ঝামেলা হচ্ছে।
বিলাস তার নাইলনের ব্যাগ থেকে চোপসানো একটা বেলুনের মতো জিনিস বের করল। একটা খুদে সিলিন্ডারের নজুল বেলুনের মুখে চেপে ধরতেই লহমায় বেলুনটা ফুলে একটা ভারী সুন্দর আরামের চেয়ারে পরিণত হলো। বিলাস চেয়ারে বসে কেঁচড় থেকে মুড়ি খেতে খেতে হাঁক মারল, ও রামরতনদাদা, বলি করছেটা কি?
