“আমার পোষা কাকাতুয়াটাকে আজ সকালে তার দাঁড় থেকে মৃত অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখা গেছে।”
বরদাচরণ ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “এটা যে অস্বাভাবিক মৃত্যু তা কী করে বুঝলেন?”
“খুবই স্বাভাবিকভাবে।” ভদ্রলোক উদভ্রান্ত মুখে বললেন, “পাখিটার প্রতি আমার প্রতিবেশী রামচন্দ্রের অনেকদিনের লোভ। সে প্রায়ই বলত, অম্বুজাক্ষ, তোমার কাকাতুয়াটা বড় চমৎকার হরির নাম করে হে! তখন থেকেই ওর মতলব আমার ভাল ঠেকেনি। আজ সকালে পাখিটাকে ঝুলতে দেখে আমি দাঁড়ে-রাখা জল আর পাখির খাবার পরীক্ষা করি। আমার মনে হচ্ছে, জলে বা খাবারে বিষ মেশানো আছে।”
বরদাচরণ ডায়েরি বন্ধ করে উঠলেন, পিস্তলটা ড্রয়ার থেকে বের করে পকেটে ভরলেন। আতসকাঁচ, দড়ি, ক্যামেরা, এবং কী ভেবে টেপ রেকর্ডারটাও সঙ্গে নিলেন। চাক্কু এবং ডঙ্কিকেও তৈরি হতে বললেন। তারপর ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে বললেন, “অম্বুজাক্ষবাবু, কেসটা অত সরল নাও হতে পারে। রামচন্দ্রবাবুর যেমন মোটিভ থাকতে পারে, আবার কাকাতুয়াটা সুইসাইডও করতে পারে, কিংবা এর পেছনে হয়তো আরও অনেক গভীর চক্রান্ত হয়েছে।”
বেরোবার সময়ে বরদাচরণের মা ডেকে বললেন, “বরদা, দুটি পান্তাভাত খেয়ে যাবি না?”
কে শোনে কার কথা! বরদাচরণ বেরিয়ে পড়লেন।
অম্বুজাক্ষবাবুর বাড়িটা বেশ বড়। পিছনে একটা ঢাকা দরদালানে অনেকগুলো খাঁচা, আর দাঁড়ে বিস্তর পাখি চেঁচামেচি করছে।
বরদাচরণ কাকাতুয়ার দাঁড়টা ভাল করে দেখলেন। পাখিটা পায়ে বাঁধা শিকলি থেকে তখনো ঝুলছে। দাঁড়ের দুদিকে দুটি বাটিতে জল আর কাবলি ছোলা। একটা ছোলা তুলে নিয়ে পিছনের উঠানে ছুঁড়ে দিলেন বরদাচরণ, একটা কাক সঙ্গে সঙ্গে নেমে এসে সেটা খেয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ বরদাচরণ কাকটাকে লক্ষ করলেন। না, কাকটা মরল না। তার অর্থ, ছোলায় বিষ নেই। জল থেকে খানিকটা ড্রপারে তুলে নিয়ে বরদাচরণ এদিক ওদিক তাকিয়ে অম্বুজাক্ষবাবুদের পোষা কাবলি বেড়ালটাকে একটা কাঠের বাক্সের ওপর বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গিয়ে আচমকা চেপে ধরলেন সেটাকে। অম্বুজাক্ষ হাঁ-হাঁ করে এগিয়ে এসে বাধা দেওয়ার আগেই বরদাচরণ বেড়ালকে অদ্ভুত কৌশলে হাঁ করিয়ে ড্রপারের জল তার মুখগহ্বরে ফেলে দিলেন। বেড়ালটা বার’কয় খুব আপত্তিকর শব্দ করল বটে, কিন্তু মরল না।
বরদাচরণ গম্ভীরভাবে বললেন, “হুঁ।”
ওদিকে অম্বুজাক্ষবাবু একটা হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি থেকে কয়েকটা বড়ি খেয়ে আপনমনেই বললেন, “গায়ে হাতে বড্ড ব্যথা।” ।
ওদিকে চাক্কু ডঙ্কির বকলস ধরে বাড়ির চারদিক ঘুরে ঘুরে কু খুঁজছিল। হঠাৎ সে দৌড়ে এসে বরদাচরণের কানে-কানে বলে গেল, “লাউয়ের খোসা! রামচন্দ্রবাবুর বাড়ির পিছন দিকে লাউয়ের খোসা পড়ে আছে, মামা।”
বরদাচরণ বিদ্যুৎবেগে উঠে পড়লেন।
বুড়ো মানুষ রামচন্দ্রবাবু ঘরে বসে রামায়ণ পড়ছিলেন। বরদাচরণকে দেখে যেন একটু চমকে উঠে বললেন, “আরে, আসুন আসুন বরদাবাবু! বিখ্যাত লোকদের দেখা পাওয়া এক মস্ত সৌভাগ্য।”
বরদাচরণ বসলেন। স্থির চোখে কিছুক্ষণ রামচন্দ্রবাবুকে স্টাডি করে দেখলেন তিনি।
রামচন্দ্রবাবু রামায়ণ বন্ধ করে বললেন, “ভাবছিলাম, আজই আপনার কাছে একবার যাব। আমার উঠোনের নারকোল গাছ থেকে কাল রাতে ছটা নারকেল কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। খুবই রহস্যময় ব্যাপার। বাইরে থেকে কারো পক্ষে উঠোনে আসা খুবই শক্ত। তবে
বলে রামচন্দ্রবাবু খুবই ইংগিতপূর্ণভাবে চুপ করে গেলেন।
বরদাচরণ ডায়েরিতে সেটা লিখে নিতে-নিতে বললেন–”কিছু গোপন করবেন না রামচন্দ্রবাবু।”
রামচন্দ্রবাবু লাজুক হাসি হেসে বললেন, “না, গোপন করে লাভ নেই। আপনার চোখকে কি ফাঁকি দেওয়া সম্ভব! বলেই ফেলি।” বলে গলাটা নিচু করে বললেন, “পাশের বাড়ির অম্বুজটা মহা নারকোল-খোর। দুবেলা নারকোল খায়। বড়া করে খাচ্ছে, নাড় বানিয়ে খাচ্ছে, মুড়ি দিয়ে খাচ্ছে, অমন নারকোল খেতে কাউকে দেখিনি। প্রায় সময়েই আমাকে বলে, রামচন্দ্রবাবু, আপনার গাছে বিস্তর নারকোল হয়েছে দেখছি! আমার সন্দেহ, কাল রাতে”
‘হুঁ।” বরদাচরণ খুবই গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু আগেই তিনি অম্বুজাক্ষবাবুকে গায়ের ব্যথার জন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খেতে দেখেছেন। গায়ের ব্যথা তো হবেই। এই বয়সে যদি অত উঁচু নারকোল গাছে কেউ ওঠে তবে ব্যথা হওয়াই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু খুঁজেপেতেও অম্বুজাক্ষবাবুর বাড়িতে নারকোল বা নারকোলের ছোবড়া পাওয়া গেল না। এটাও রহস্যজনক। কারণ, নারকোল খাওয়া যার নেশা, তার বাড়িতে নারকোলের চিহ্নও খুঁজে না-পাওয়াটা খুবই অস্বাভাবিক।
কিন্তু রামচন্দ্রবাবুর বাড়ির পিছনে চাক্কুর কথামত লাউয়ের খোসা ঠিকই পাওয়া গেল। পরিষ্কার ক্ল।
কিন্তু বরদাচরণ চট করে কিছু করেন না। অপরাধীকে সময় দেন। তাকে যে সন্দেহ করা হচ্ছে, তা টেরও পেতে দেন না।
মোক্ষদা দিদিমাকে লাউয়ের ব্যাপারে আরও কয়েকটা প্রশ্ন করবেন বলে বরদাচরণ ভরদপুরে দিদিমার বাড়ি এলেন। প্রশ্নগুলো এরকম, লাউয়ের রংটা কীরকম ছিল, গাঢ় সবুজ না সাদাটে? লাউয়ের গায়ে এক জায়গায় একটা পোকার গর্ত ছিল কিনা! বোঁটার কাছে এক জায়গায় একটা নখ বসানোর দাগও পাওয়া যাচ্ছে। রামচন্দ্রবাবুর বাড়ির পিছনের আস্তাকুঁড় থেকে সবকটা লাউয়ের খোসা কুড়িয়ে এনে বরদাচরণ তার মধ্যে এইসব অকাট্য চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন।
