একশো বছর আগে এ বাড়িটা তো তারই ছিল কিনা। বড্ড ভালো মানুষ। সাদা ধবধবে দাড়ি, সাদা চুল, হেঁটো ধুতি পরা, আদুর গা, রং যেন দুধে-আলতা। খুঁজে-খুঁজে যখন হয়রান হচ্ছি তখনই যেন দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন।
একটা হাই তুলে ভূতনাথবাবু বললেন, তুমি নিজে তো পাগল বটেই এবার আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে দেখছি। যাও গিয়ে শুয়ে একটু ঘুমোও বাপু।
বিশ্বাস হল না তো বাবু। আসুন তাহলে, নিজের চোখেই দেখবেন।
বিরক্ত হলেও ভূতনাথবাবুর একটু কৌতূহলও হল।
পরাণ দাসের পিছু পিছু বাড়ির পিছন দিকে রান্নাঘরের পাশের এঁদো ঘরখানায় ঢুকে থমকে গেলেন। মেঝের ওপর স্তূপাকার ইট, মাটি ছড়িয়ে আছে, তার মাঝখানে একটা গর্ত।
এসব কী করেছ হে পরাণ? মেঝেটা যে ভেঙে ফেলেছ।
যে আজ্ঞে, এবার গর্তে একটু উঁকি মেরে দেখুন।
হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় ভূতনাথবাবু গর্তের মধ্যে উঁকি মেরে দেখলেন একটা কালোমতো কলসি জাতীয় কিছু।
আসুন বাবু, নেমে পড়ুন। বড্ড ভারী। দুজন না হলে টেনে তোলা যাবে না।
ভূতনাথবাবুর হাত-পা কাঁপতে লাগল উত্তেজনায়।
বললেন, কী আছে ওতে?
তুললেই দেখতে পাবেন। আসুন বাবু, একটু হাত লাগান।
ভূতনাথবাবু নামলেন। তারপর মুখ ঢাকা ভারী কলসিটা দুজনে মিলে হাতি কষ্টে তুললেন ওপরে। পরাণ একগাল হেসে বলল, এবার খুলে দেখুন বাবু আপনার জিনিস।
বেশ বড় পিতলের কলসি। মুখটায় একটা ঢাকনা খুব আঁট করে বসানো। শাবলের চাড় দিয়ে ঢাকনা খুলতেই চকচকে সোনার টাকা এই হ্যারিকেনের আলোতেও ঝকমক করে উঠল।
বলেছিলুম কিনা বাবু! এখন দেখলেন তো, যান আপনার আর কোনও দুঃখ থাকল না। দু-তিন পুরুষ হেসে খেলে চলে যাবে।
ভূতনাথবাবু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এরকমও হয়! পরাণের দিকে চেয়ে বললেন, এসব সত্যি তো-স্বপ্ন নয় তো!
না বাবু, স্বপ্ন নয়। বুড়ো কর্তার সবকিছু এর মধ্যে! এত দিনে গতি হল।
ভূতনাথবাবু পরাণকে জড়িয়ে ধরে বললেন, পাগল হলেও তুমি খুব ভালো লোক। এর অর্ধেক তোমার।
পরাণ সভয়ে পিছিয়ে গিয়ে বলল, ওরে বাবা, ও কথা শুনলেও পাপ। টাকা-পয়সায় আমার কী হবে বাবু?
তার মানে? এত মোহর পেয়েও নেবে না?
না বাবু, আমার আছেটা কে যে ভোগ করবে? একা বোকা মানুষ, ঘুরে-ঘুরে বেড়াই, বেশ আছি। টাকা-পয়সা হলেই বাঁধা পড়ে যেতে হবে।
ভূতনাথবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, তাহলে গুপ্তধন খুঁজে বেড়াও কেন?
আজ্ঞে, ওইটেই আমার নেশা। খুঁজে বেড়ানোতেই আনন্দ। লুকোচুরি খেলতে যেমন আনন্দ হয় এও তেমনি। আচ্ছা আসি বাবু। ভোর হয়ে আসছে, অনেকটা পথ যেতে হবে।
পরাণ দাস চলে যাওয়ার পর ভূতনাথবাবু অনেকক্ষণ বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ভাবলেন, একটা সামান্য লোকের কাছে হেরে যাব? ভেবে কলসিটা আবার গর্তে নামিয়ে মাটি চাপা দিলেন। ওপরে ইটগুলো খানিক সাজিয়ে রাখলেন। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে একটু হাসলেন।
গোয়েন্দা বরদাচরণ
গোয়েন্দা বরদাচরণ একটা লাউ চুরির কেস নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। কে বা কারা পরশু দিন ন’পাড়ার মোক্ষদা দিদিমার ঘরের চাল থেকে একটি নধর লাউ চুরি করে নিয়ে গেছে। মোক্ষদা দিদিমার নাতি নাড়গোপাল বাইরে চাকরি করে, সে বড় লাউয়ের ডাল ভালবাসে। নাতির জন্য লাউটা খুব যত্নে রেখেছিলেন দিদিমা। আজকালের মধ্যে নাড়গোপালের আসার কথা। কিন্তু এর মধ্যেই পরশুদিন লাউটা চুরি গেছে। দিদিমা কেঁদে কেটে এসে পড়লেন বরদাচরণের কাছে, “ও বাবা বরদা, আমার লাউ উদ্ধার করে এনে দাও।”
সেই থেকে বরদাচরণের ঘুম নেই, খাওয়া নেই। সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট আর কুকুর নিয়ে সারাদিন আতসকাঁচ হাতে করে মোক্ষদা দিদিমার সারা বাড়ি, ঘরের চাল, পাড়া-প্রতিবেশীদের আনাচ-কানাচে তন্নতন্ন করে কু খুঁজেছেন। তারপর বাড়ি এসে সারাদিন বসে ভেবেছেন, কাগজ কলমে কী যেন লিখেছেন আর মাঝেমাঝে “হুঁ হুঁ বাবা! নাঃ, হচ্ছে না!” গোছের কথা বলেছেন আপনমনে।
বরদাচরণের বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। বাড়িতে বুড়ী মা আছেন, আর আছে তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাগ্নে চাক্কু, আর পোষা নেড়ী কুকুর ডঙ্কি। বরদাচরণ কিছু মোটাসোটা মানুষ, ডন-বৈঠক করা শরীর। ভাগ্নে চাক্কু রোগা হলেও জুডো জানে। ডঙ্কি খুবই ভাল ঘেউ-ঘেউ করতে পারে।
চাক্কু এসে বারবার খোঁজ করে যাচ্ছে, “মামা, কিছু ভেবে পেলে?”
বরদা খুবই অন্যমনস্কভাবে বলেন, “বোঁটা দেখে তো মনে হয় লাউটা বেশ বড়সড়ই ছিল।”
“তা ছিল।”
“লাউটা বোঁটা কেটে নেওয়া হয়নি, মুচড়ে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।”
“হুঁ, ঠিক ধরেছ।”
“টিনের চালের ওপর একটা বড় লাউকে মুচড়ে বোঁটা ছিঁড়ে নেওয়া হল, অথচ কোনো শব্দ হয়নি। মোক্ষদা দিদিমার ছেঁড়া মশারির মধ্যে প্রচুর মশা ঢুকে পড়েছিল বলে দিদিমার সে-রাতে ভাল ঘুম হয়নি, শব্দ হলে তার টের পাওয়ার কথা।”
চাক্কু চিন্তিতভাবে বলে, “সে ঠিক, তবে মোক্ষদা দিদিমা আবার কানে একটু খাটো কিনা।”
এই সময় বাইরে ডঙ্কি ঘেউ-ঘেউ করে উঠল, কে একজন চেঁচিয়ে বলল, “কুকুর সামলান!”
চাক্কু ছুটে বাইরে গেল। একটু বাদে একজন বেশ ভাল চেহারার লোক ঘরে ঢুকেই বললেন, “বরদাবাবু, একটা মার্ডার কেস।”
বরদাচরণ গম্ভীরভাবে তাকে বসতে বলে কেস ডায়েরির খাতাটা টেনে নিয়ে কলম বাগিয়ে বললেন, “ডিটেলস বলুন।”
